মা এসে আমার পেছনে দাঁড়ালেন। হাতগুলো আমার কাঁধে রাখলেন। আমি শক্ত হয়ে বসে ছিলাম, কারন জানি একটু নড়লেই তিনি আবারও মারবেন।
“আমি কি কখনো তোর জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করেছি? হয়তো মাঝে মধ্যে দুই-একটা চড় থাপ্পড় দিয়েছি, কিন্তু সেটা তো তোর ভালোর জন্যই।”
তিনি আস্তে করে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে আমার গলার উপর উঠিয়ে আনলেন।
“থা-থামো!” আমি গুঙিয়ে উঠলাম।
“তুই যখন ওভাবে কথা বলিস তখন আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়। আমি তোকে বড় করছি। তোর কি মনে হয় না আমার খানিকটা সম্মান পাওনা আছে?”
আমি টের পাচ্ছিলাম তার হাতের চাপ বাড়ছে। আমি আর কোন শব্দ করতে পারছিলাম না। নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। বলতে পারছিলাম না, “থামো, মা, আমাকে মাফ করে দাও। তুমি যা বলবে তার সবকিছু করতে আমি রাজি আছি। আমি ক্ষমা চাইছি।”
আমার মনে হয় এক সেকেন্ডের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম মেঝেতে পড়ে আছি, মুখ থেকে লালা ঝরছে। মা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, প্রাচীন কোন মন্দিরের প্রহরীর মত আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
“তোর মরে যাওয়াই ভাল। একদিন আমি তোকে ঠিকই খুন করে ফেলব। আমি কোনভাবেই বুঝতে পারি না দুজন জমজের মধ্যে এত পার্থক্য কি করে হয়। তোর সবকিছু আমার মাথা গরম করে তোলে, তোর কথা বলা থেকে শুরু করে হাঁটা পর্যন্ত সবকিছু।”
মা বই তিনটা তুলে নিয়ে তার রুমে চলে গেলেন। আমার হৃদপিণ্ড তুমুল গতিতে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত আমার মাথার ভেতর পাঠাচ্ছিল।
মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই। এখানে থাকলে আমার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ছোট কোন জিনিসেও মা রাগে ফেটে পড়েন, আর আমি নিশ্চিত তিনি আমাকে খুন করে ফেলবেন।
আমি মিসেস সুজুকিকে দেখতে চাইছিলাম। আমি চাইছিলাম আমরা তিনজন মিসেস সুজুকি, আসো আর আমি, দূরে কোথাও চলে যেতে।
মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার আমার মনে পড়ল। মিসেস সুজুকির বাসায় ঢোকার যে চাবিটা তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, সেটা ঐ বইগুলোর একটায় লুকানো ছিল, যেগুলো মা তার রুমে নিয়ে গিয়েছেন।
৪
পরদিন ছিল শনিবার। স্কুল ছিল না। মা বাইরে গিয়েছিল, বলে গিয়েছিলেন তার কিছু কাজ আছে, ছয়টার আগে ফিরবেন না। দুপুরের দিকে কাজারি ওর বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হল। একা বাসায়, আমি মায়ের রুমে গেলাম।
মায়ের রুমে আমি প্রায় কখনোই যাইনি। এমনিতে ঐ রুমে পা দেয়ার মত সাহস নেই আমার। তিনি যদি টের পান তাহলে কঠিন মার খেতে হবে। সবচেয়ে খারাপ যেটা হতে পারে মৃত্যু। বিপদ জেনেও আমি সেখানে গিয়েছিলাম শুধু একটা কারনে, মিসেস সুজুকির বাসার চাবিটা উদ্ধারের জন্য। ঐ চাবিটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারন ওটা মিসেস সুজুকি আর আমার মধ্যের সম্পর্কের একটা চিহ্ন। বইগুলো না পাওয়া গেলে আমি জানি মিসেস সুজুকি আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু চাবিটা না পেলে আমি নিজেকে নিজে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।
মায়ের রুমটা একদম নিখুঁতভাবে গোছানো। কোথাও এক বিন্দু ধুলোও পড়ে নেই। ডেস্কের উপর ফুলদানিতে ফুল রাখা, পাশেই তার ল্যাপটপ। একটা বড় বিছানার, এক মিনিটের জন্য আমার অস্বাভাবিক একটা অনুভূতি হচ্ছিল যে তিনি ওখানেই আছেন, বিছানা থেকে উঠছেন মাত্র। বিছানার পাশে একটা পোর্টেবল সিডি/রেডিও ক্যাসেট প্লেয়ার আর বুককেসে একটা তাকে সিডির সারি। মিউজিক শোনার অভ্যাস আমার ছিল না, তবে মা আর কাজারি প্রায়ই মিউজিক নিয়ে কথা বলত যে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না।
মিসেস সুজুকির বইগুলো এক কোণায় অযত্নে ফেলে রাখা ছিল। আমি শুধু চাবিটা নিয়ে হাতের মুঠিতে আলতো করে চেপে ধরে রাখলাম। আমার শুধু এখন দরকার যত দ্রুত সম্ভব রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া। বইগুলো ওখানেই ফেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওগুলো নিলে মা বুঝে যাবেন যে আমি তার রুমে ঢুকেছিলাম।
দরজার নবটা মাত্র ঘুরিয়েছি এমন সময় আমি মূল দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম। একদম কাঠের মত শক্ত হয়ে গেলাম, শব্দ করতে ভয় পাচ্ছিলাম। রুম থেকে বের হতে গেলে ধরা পড়ে যাব। দরজায় কান লাগালাম। শুনতে পারছিলাম কেউ একজন এদিকে আসছে।
এদিক ওদিক তাকালাম কানোর জায়গার জন্য। বিছানাটা দেয়ালের সাথে লাগানো তবে একটা ফাঁক মতন আছে যেখানে আমার জায়গা হয়ে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফাঁকটার মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আমাকে এভাবে দেখলে মনে হবে যেন ঘুমের মধ্যে নিচে পড়ে গিয়েছি। কিন্তু ফাঁকটা আমার জন্য একদম ঠিক সাইজের ছিল, যেন কেউ আমার জন্যই ওখানে ওটুকু ফাঁক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিল।
দরজা খোলার শব্দে আমার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। আমার বুক এত জোরে ধকপক করছিল যে আমি চাইছিলাম ওটা থেমে যাক। আমি মাথাটা একটু বাঁকালাম যাতে বিছানার নিচ থেকে দেখতে পাই। রুমের অন্য পাশে একটা ফুল সাইজ আয়না ছিল। আয়নাতে কাজারির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। কাজারি এসেছে। আমার জানা নেই ও মায়ের রুমে কি করছে কিন্তু যেটার জন্যই এসে থাকুক না কেন, আমি চাইছিলাম ও যেন তাড়াতাড়ি সেটা করে বেরিয়ে যায়। কাজারি বুককেসের সামনে দাঁড়িয়ে সিডিগুলো দেখছিল। গুনগুন করতে করতে কয়েকটা সিঁড়ি বের করল। অবহেলার সাথে ওগুলো ডেস্কের উপর রাখছিল। আবারও বুক কেসের দিকে ঘুরে কয়েকটা সিডি বের করল, আবারও নিয়ে ডেস্কের উপর রাখল।
