“নিশ্চয়ই তোমার সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে।” তিনি আমাকে বেডরুমের দিকে নিয়ে গেলেন এবং আয়নার সামনে বসালেন।
“আমার জন্য হাসো। তুমি কি জানো, তুমি আসলে খুবই সুন্দর দেখতে।” তিনি আমার গালে হাত বুলিয়ে আলতো করে চিমটি কাটলেন। আমাকে হাসানোর অনেক চেষ্টা করছিলেন।
“থামুন,” আমি বললাম। “প্লিজ, থামুন! আমি শুধু আয়নায় একটা ভাঁড়কে দেখতে পাচ্ছি। আমার বুকে একটু ভাল বোধ হচ্ছে অবশ্য, আপনি এখন আমার গাল টানা বন্ধ করতে পারেন।”
“একটু ভাল? তাহলে তো ভালই,” তিনি বললেন, আবার কাশতে লাগলেন। আর সেটা গলা পরিস্কার করার মত কাশি ছিল না। বাজে রকমের খসখসে কাশি যা আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।
“আপনি কি ঠিক আছেন?”
“আমি ঠিক আছি। হ্যাঁ, ঠিক আছি। আমি চিন্তা করছিলাম আমাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত। একটা টিপ। জানো তো, ইয়োকো, তুমি আমার কাছে পরিবারের একজনের মতই, অন্য যে কারো চেয়ে অনেক কাছের মানুষ তুমি।”
“আমরা কি এমন কোথাও যেতে পারি যেখান থেকে আর ফিরে আসতে হবে না?”
“নিশ্চয়ই। আমরা দুনিয়ার যে কোন জায়গায় গিয়ে থাকতে পারি। আমরা তোমাকে আমার নিজের নাতনি বলে চালাতে পারি।”
আমি জানতাম আমি যাতে ভাল বোধ করি সেজন্য শুধু মিসেস সুজুকি এই কথাগুলো বলছিলেন। কিন্তু তারপরেও আইডিয়াটা আমার কাছে খুব ভাল লাগল। আমি শুধু কল্পনা করছিলাম, তিনি যদি আমার আপন নানি হতেন তাহলে কতই না ভাল হত।
মিসেস সুজুকি আয়নার দিকে ইশারা করলেন। ওখানে আমার ছায়াটা হাসছিল। আমাকে দেখতে লাগছিল ঠিক কাজারির মত।
বাসায় ফেরার সময় আমি কাজারির মত করে হাঁটার চেষ্টা করলাম। মাথা উঁচু করে হাসিখুশি মুখ করে রাখলাম। উপলদ্ধি করলাম যে আমি এতদিন সবসময় মাথা নিচু করে হাঁটতাম।
***
কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম আর মিসেস সুজুকির বাড়িতে যা যা হল সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। মা ল্যাপটপ হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। অফিসের কাজের জন্য তার ল্যাপটপের প্রয়োজন হয়। তিনি সবসময় জিনিসটার ভাল যত্ন নিতেন। একবার তিনি ওটা কিচেনের টেবিলে রেখে গিয়েছিলেন আর আমি আঙুল দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দেখেছিলাম।
“তোর নোরা হাতগুলো ওটার থেকে দুরে রাখ!” তিনি চিৎকার করে পাতিল দিয়ে আমার মুখে বাড়ি মেরেছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার চেয়ে ল্যাপটপটার গুরুত্ব অনেক বেশি।
মাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় মুখ সরিয়ে নিলেন। লিভিং রুম থেকে কাজারি মাকে ডাক দিলে তার চেহারায় স্বস্তির ছাপ দেখা গেল। কাজারি আমার আগে বাড়িতে ফিরেছিল আর লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিল। আমার ঐ রুমে ঢোকা মানা আছে তাই আমাদের আর কোন কথা হয়নি। আমি যদি মায়ের নিষেধ ভেঙে লিভিং রুমে ঢুকে টিভি দেখি তাহলে তিনি আমাকে নিশ্চিতভাবে ন্যাংটো করে পুরো শহর ঘোরাতেন।
মা লিভিং রুমের দিকে গেলেন আর আমি আমার ব্লাউজের ভাঁজ ডলে সমান করতে করতে খুশি মনে ভাবলাম আজকে রাতে হয়ত মার খাওয়া থেকে বেঁচে যাব। লিভিং রুম থেকে মা আর কাজারির কথাবার্তা ভেসে আসছিল। আমি একটা অংকের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এক কান ওদিকে দিয়ে রেখেছিলাম।
“আচ্ছা মা, তুমি কি খেয়াল করেছ যে ইয়োকো আজকাল দেরি করে বাসায় ফেরে?” কাজারিকে কথাটা বলতে শুনে আমি পেন্সিল নামিয়ে রাখলাম। “মনে হচ্ছে ওর একটা বন্ধু হয়েছে। ওর ক্লজিটের মধ্যে ও অনেকগুলো বই লুকিয়ে রেখেছে। আমি ভাবছিলাম ওগুলো কেনার টাকা ও কোথায় পেল।”
আমার মনে হল নিমেষেই যেন শরীরের সব রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। লিভিং রুম থেকে মা কিচেনে রীতিমত উড়ে এলেন। আমাকে পেরিয়ে গিয়ে ক্লজিটের দরজা খুললেন। আমার দিকে তাকালেনও না, যেন আমার কোন অস্তিত্ব ছিল না। ক্লজিট থেকে আমার স্কুলের বইগুলো বের করে ছুঁড়ে ফেললেন, তারপর নিচে লুকানো তিনটা বই আবিষ্কার করলেন যেগুলো আমি মিসেস সুজুকির কাছ থেকে ধার এনেছিলাম।
“এই বইগুলো তুই কোথায় পেয়েছিস?” তিনি সরু গলায় উত্তর দাবি করলেন। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম, কিন্তু কোন রকমে কথা বলতে পেরেছিলাম। উত্তর না দিলে মার খেতে হত তাতে কোন সন্দেহ নেই।
“ওগুলো ধার করেছি…”
তিনি বইগুলো ছুঁড়ে নিচে ফেললেন।
“তোর কোন বন্ধু নেই যে তোকে এরকম বই ধার দিতে পারে। আমি জানি কি করেছিস তুই। তুই ওগুলো চুরি করেছিস, তাই না? প্রতিদিন আমি তোর জন্য কষ্ট করি, আর তুই আমার জন্য খালি শুধু সমস্যার উপর সমস্যা তৈরি করিস!” তিনি হিসহিস করে কথাগুলো বললেন আর চেয়ার দিয়ে আমাকে আঘাত করলেন। “তুই সবসময় এমন ছিলি। সবসময় অকাজের কাজী। কাজারি আর আমার জন্য সমস্যা তৈরি করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই তোর।”
কাজারি লিভিং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখে সমবেদনা টেনে বলল, “মা, মাফ করে দাও ওকে। আমার মনে হয় ও না বুঝে করে ফেলেছে।”
মা কাজারির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “তুমি একটা লক্ষ্মী মেয়ে কাজারি,” তারপর আমার দিকে ঘুরলেন। “আর অন্যদিকে এটা, ভেতর থেকে পঁচন ধরা। আমি জানি না আর কী বলব। কাজারি যাও তো, লিভিং রুমে ফিরে যাও।”
কাজারি আমার দিকে শব্দ না করে মুখ নাড়িয়ে বলল “ভাল থেকো,” তার পর বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে থাম্বস আপ দিল। রুমে ফিরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। আমি টিভির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
