লাঞ্চের সময় কাজারির ক্লাসরুমে গেলাম বইটা আনতে কিন্তু ও সেখানে ছিল না। আমাকে আমার বই ছাড়াই অংক ক্লাস করতে হল।
আমাদের অংকের টিচার চমৎকার একজন মানুষ ছিলেন। আমি যদিও খুব কমই তার সাথে কথা বলেছি, তবে প্রায়ই তাকে দেখেছি করিডোরে দাঁড়িয়ে কাজারির সাথে হাসতে হাসতে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কথা বলতে। তাই আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি যদি তাকে বুঝিয়ে বলি কেন আমার বই সাথে নেই তাহলে কোন সমস্যা হবে না।
ক্লাসের একদম শুরুতে তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, “কেন তোমার সাথে বই নেই?” তারপর আমাকে ডেস্কের পাশে দাঁড় করালেন।
“আ..আমি বইটা আমার বোনকে ধার দিয়েছিলাম।”
“আমি আমার কান দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছি না! নিজের সমস্যার জন্য আরেকজনের উপর দোষ চাপাচ্ছ। তুমি কি আসলেই ক্লাস ১-এর কাজারির জমজ বোন? আর তোমার কি মনে হয় না তোমার উচিত নিজের চেহারা-সুরত, পোশাক-আশাকের উপর একটু নজর দেয়া?”
টিচার যখন এসব বলছিলেন তখন ক্লাসের ভেতর থেকে চাপা হাসির শব্দ আসছিল। টের পেলাম আমার মুখ গরম হয়ে যাচ্ছে, আমার ইচ্ছা করছিল ছুটে পালিয়ে যাই। আমি জানি আমার চুলগুলো অগোছালো আর পোশাক-আসাক নোংরা। কিন্তু যে মানুষটা কিচেনে ঘুমায় তার পক্ষে এ ব্যাপারে কি করার ছিল?
সেদিন ক্লাস শেষে রুম থেকে বের হয়ে কাজারির সামনে পড়লাম।
“আমি দুঃখিত যে তোমার বই ফেরত দিতে দেরি হয়ে গেল। আমি সেটার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চাই। আমি আর আমার বন্ধুরা ম্যাকডোনাল্ডস-এ যাচ্ছি। তুমিও আমাদের সাথে চল? আমি তোমাকে হ্যামবার্গার খাওয়াবো।”
কাজারি সুন্দর একটা হাসি দিল। আগে কখনো ও আমাকে এরকম কোন কিছুতে ডাকেনি। শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম, আর অবশ্যই রাজি হয়েছিলাম। কাজারি আর ওর বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়া মানে আমার কাছে স্বপ্নের মত। ভুলে নিজের বাম পায়েই এত জোরে পাড়া দিয়ে বসলাম যে অনেক ব্যথা করছিল।
তো আমরা চার জন মিলে ম্যাকডোনাল্ডস-এ গেলাম : কাজারি, ওর দুই বন্ধু, আর আমি। কাজারি সবার জন্য একসাথে অর্ডার দিল। আমি ওর বন্ধুদেরকে চিনতাম না। তারা আমার সাথে তেমন একটা কথাও বলেনি। তবে ওরা কাজারির সাথে অনেক কথা বলল আর অনেক হাসল।
“এটা কি সত্যি যে তোমার কাছে কখনোই টাকা থাকে না? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কাজারি হাত খরচ পায় আর তুমি কিভাবে পাও না?” ক্যাশ রেজিস্টারের সামনে আমরা যখন লাইন ধরে দাঁড়িয়েছিলাম তখন কাজারির একজন বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করল। কাজারি আমার হয়ে উত্তর দিল।
“এটা আমাদের মায়ের সিদ্ধান্ত। তিনি আমার বোনকে কোন টাকা দিলে ও সাথে সাথে সব খরচ করে ফেলে।”
আমাদের অর্ডার রেডি হলে আমরা সেগুলো নিয়ে দোতালায় গিয়ে একটা টেবিলে বসলাম। কাজারি যথেষ্ট পরিমাণ জুস, ফ্রেঞ্চ ফাইজ আর হ্যামবার্গার নিয়ে এসেছিল, তবে সেটা তিনজনের জন্য। কাজারি আর ওর বন্ধুরা খেতে শুরু করল আর আমি শুধু ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সাহস করে প্রশ্ন করতে পারলাম না, “আমারটা কোথায়?” ব্যাপারটা চিন্তার বাইরে যে আমি কখনো সরাসরি মা কিংবা কাজারিকে নিজে থেকে কোন কথা বলব।
“আমার খাওয়া শেষ।”
কাজারির একজন বন্ধু তার আধ খাওয়া হ্যামবার্গারটা আমার সামনে ছুঁড়ে রাখল।
“ইয়োকো, আমি শুনেছি তুমি নাকি অন্যদের ফেলে দেয়া খাবার খাও? সত্যি নাকি?”
কাজারি আনন্দের সাথে ওর বন্ধুর প্রশ্নের উত্তর দিল।
“সত্যি কথা। ইয়োকো সবসময় আমার স্কুটো খাবার গপগপ করে খায়। কাজারি আমার দিকে ঘুরল। “তাই না ইয়োকো? এই দুইজন আমার কথা বিশ্বাসই করে না। চল ওদেরকে দেখিয়ে দাও। নাও, এটা খাও।”
কাজারি ওর আধ খাওয়া হ্যামবার্গারটা আমার দিকে ঠেলে দিল। ও আর ওর বন্ধুরা চোখে আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি লোভীর মত সব খাবার গপাগপ করে খেলাম, একটা শুকর যেভাবে করে। আমার খাওয়া শেষ হলে ওরা তিনজন হাততালি দিয়ে উঠল।
ওখান থেকে বের হয়ে ওরা তিনজন আমাকে বিদায় জানিয়ে কাছের ট্রেন স্টেশনের দিকে চলে গেল। একা হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে আমি চিৎকার করে উঠলাম, “হায় খোদা!”
মিসেস সুজুকির বাসায় পৌঁছানোর পর আমার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছিল। কিভাবে কাজারি পারল ওর বন্ধুদের একত্রিত করে আমার সাথে এরকম করতে? আসলে কাজারি সবসময়ই আমার সাথে এরকম করে এসেছে। পার্থক্যটা শুধু হল, আগে করত বাসার ভেতর, আর এখন করল বাইরে। আমি এটা ভেবে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছিল। হয়ত আমি স্কার্ফ বেশি পেঁচিয়ে ফেলেছিলাম।
মিসেস সুজুকি আমার জন্য এক কাপ কফি ঢালতে গিয়ে একটু কাশলেন।
“আমি মনে হয় একটু ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেলেছি,” আরেকটু কেশে তিনি বললেন। “কি হয়েছে ইয়োকো? তোমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। সবকিছু ঠিক আছে তো?”
“উম, আসলে, আমার মনে হয় একটু বেশি…”
“একটু বেশি?”
তিনি সরাসরি আমার চোখের ভেতর তাকালেন। বয়স্ক মানুষদের চোখ কেন এত স্পষ্ট হয়? আমি বুকে হাত রেখে মনে মনে ভাবছিলাম।
“আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ব্যথা হচ্ছে….এখানে।”
কোন রকমে শব্দগুলো মুখ থেকে বের করতে পারলাম। আমার মাথার ভেতর আবারও কাজারি আর ওর বন্ধুদের চিন্তা ঘুরছিল। মিসেস সুজুকি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, কিছু বললেন না।
