যদিও বই ফেরত দেয়ার বিষয়টা তার সাথে আবার দেখা করার জন্য একটা অজুহাত ছিল কিন্তু অজুহাতটা না থাকলে নিজেকে আমার স্রেফ একজন আগন্তুক মনে হত, যার দেখা করতে যাওয়ার সত্যিকারের কোন কারন ছিল না। আমার জীবনে মিসেস সুজুকিই প্রথম মানুষ যার পাশে আমি নিজের মত থাকতে পারি। আমি চাইনি কোন কারন ছাড়া বার বার আসার কারনে তিনি আমাকে অপছন্দ করুন।
যতবারই আমি গিয়েছি, মিসেস সুজুকি প্রতিবারই আমার জন্য ডিনার বানিয়ে রেখে অপেক্ষা করতেন। প্রতিদিন আমি ধার নেয়া বই কিংবা মাঙ্গাটা পড়ে আমার মতামত তাকে শুনাতাম। তিনি, আসো আর আমি অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। যেদিন স্কুল তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত সেদিন আমি আসোকে নিয়ে হাঁটতে বের হতাম। আলু ছিলতে কিংবা পুড়ে যাওয়া বা বদলানোর মত টুকটাক কাজে আমি মিসেস সুজুকিকে সাহায্য করতাম।
“এরপর যেদিন তোমার স্কুল ছুটি থাকবে, সেদিন কি আমরা একটা মুভি দেখতে যেতে পারি?”
কথাটা শুনে আমি আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলাম।
“কিন্তু আমি ভাবছিলাম তোমার মা আবার এতে কিছু মনে করবেন না তো? ইদানিং মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আমার কাছে অনেক বেশি সময় আটকে রাখছি। পরেরবার, তোমার সাথে কাজারিকেও নিয়ে এসো কেমন?”
হুমম। আমি মাথা ঝাঁকালাম, কিন্তু মনে মনে বুঝতে পারছিলাম না কি করব। মিসেস সুজুকি আমার সমস্ত মিথ্যা কথা বিশ্বাস করে বসে আছেন।
মুভির পর মিসেস সুজুকি আর আমি ঐ কনভেয়ার বেল্ট সুশি রেস্টুরেন্টগুলোর একটায় গেলাম। আমি না যাওয়ার জন্য কিছু অজুহাত দাঁড় করাতে চাইছিলাম, কিন্তু উনি জোর করলেন। আমি আমার জীবনে সুশি খেয়েছি না খাওয়ার মতই। আমি এমনকি ঐ বিভিন্ন ধরনের মাছগুলোর নামটা পর্যন্ত জানতাম না। কনভেয়ার বেল্ট সুশি রেস্টুরেন্টগুলো কিভাবে কাজ করে সে ব্যাপারে কিছুটা ধারণা আমার ছিল, আর আমি বেছে বেছে কম দামি খাবারগুলো তুলে নিতে চাইছিলাম, কিন্তু সত্যি কথা হল আমি আসলে জানতাম না কোনটা দামী আর কোনটা কম দামী। খাবারের প্লেটগুলো আমাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, মিসেস সুজুকি তার পরিবার নিয়ে কথা বলছিলেন।
“জানো, প্রায় তোমার বয়সি আমার একটা নাতনি আছে।” তাকে হঠাৎ নিঃসঙ্গ দেখাল।
“তোমার চেয়ে এক বছরের ছোট হবে হয়ত। ও খুব বেশি দুরে থাকে না কিন্তু তিন বছর বা তারও বেশি হবে ওর সাথে আমার দেখা হয়নি।”
“আপনি কি আপনার পরিবারের সাথে একসাথে থাকতে পারেন না?”
মিসেস সুজুকি কোন উত্তর দিলেন না। নিশ্চয়ই কোন কারন ছিল।
“আপনি যদি ওকে চিঠি পাঠান? আমি তোমাকে দেখতে চাই। আমি তোমার জন্য রান্না করতে চাই। তুমি যা খেতে চাও তাই তৈরি করব। এরকম কিছু লিখলে আমি নিশ্চিত ও আপনাকে দেখতে অবশ্যই আসবে।”
এক পর্যায়ে আমি সিরিয়াসলি চিন্তা করতে শুরু করলাম যে কেউ যদি আমাকে বলে তুমি কি খেতে চাও তাই খাওয়াবো, তাহলে আমার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। মানে বলতে চাইছি ঐটা হয়ত ‘জীবনে একবারই আসে। ধরনের প্রশ্ন হতে পারে। যদি এরকম প্রশ্ন কখনো আসে তবে তার জন্য আমার এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত। এসব যখন ভাবছিলাম তখন সুশিগুলো আমার সামনে দিয়ে ঘুরে যাচ্ছিল।
“তুমি খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে, ঠিক কিনা,” মিসেস সুজুকি দম আটকে বললেন। “আসলে তোমাকে আমার একটা জিনিস বলবার আছে। আসোকে ফিরিয়ে আনার জন্য যে জিনিসটা তোমাকে দেব বলেছিলাম, সেটার ব্যাপারে। সত্যি কথা হল এরকম কোন জিনিস আসলে নেই। আমি বানিয়ে বলেছিলাম। আমি তোমাকে আবারও দেখতে চাইছিলাম, তাই একটা অজুহাত বানিয়েছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আর সেটার প্রতিদান হিসেবে তোমাকে এটা দিতে চাই।”
তিনি আমার হাতে একটা চাবি দিয়ে মুঠে বন্ধ করলেন।
“আমার ঘরের চাবি। আমাদের আর কোন অজুহাতের প্রয়োজন নেই। তোমার যখন ইচ্ছা হবে তখনই আসতে পারবে। কারন তোমার সঙ্গ আমি খুবই উপভোগ করি।”
আমি বার বার নড করলাম। সুন্দর একটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। জীবনে কতবার আমি আফসোস করেছি জন্ম নেয়ার জন্য, কতবার চিন্তা করেছি কোন উঁচু বিল্ডিঙের মাথায় গিয়ে ছাদের কোনার বেড়ায় উঠে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু যতবারই সেরকম মনে হোক না কেন আজকের মত একটা দিন আমি বারবার পেতে চাই।
সেদিন থেকে প্রতিদিন, যখনই আমার সাথে কষ্টদায়ক কিছু হয়েছে, মিসেস সুজুকির দেয়া চাবিটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরেছি। আর সেটা আমাকে মাটির উপর আমার পা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে, চাবিটা যেন ছিল কোন ‘ডাবল এ এলকালাইন ব্যাটারির মত, ঝাঁকুনি দিয়ে আমাকে শক্তি সরবরাহ করত আর দুনিয়াতে ফিরিয়ে আনত।
চাবিটা আমি যখন যে বইটা ধার করতাম, সেটার মধ্যে লুকিয়ে রাখতাম, একটা বুকমার্কের মত।
৩
মিসেস সুজুকি চাবিটা দেয়ার দুই সপ্তাহ পর এক শুক্রবার দিন স্কুলে একটা ঘটনা হল। বিরতির সময়ে কাজারি আমার ক্লাসরুমে এল। ও ওর অংকের বই আনতে ভুলে গিয়েছিল তাই আমারটা ধার নিতে এসেছিল।
“প্লিজ। আমি তোমার জন্য ভাল কিছু একটা করব।।”
অনেকদিন পর কাজারি আমার সাথে কথা বলল, তাই আমি আনন্দিত বোধ করছিলাম। ঐ দুপুরে আমারও অংকের ক্লাস ছিল, কিন্তু ও কথা দিয়েছিল আমার ক্লাসের আগেই এসে বইটা ফেরত দিয়ে যাবে, তাই আমিও ওর হাতে বইটা তুলে দিয়েছিলাম।
