***
পরদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে আবার মিসেস সুজুকির বাড়িতে গেলাম। বেল চাপার আগেই বাসার ভেতর থেকে খাবারের সুগন্ধ ভেসে এসে আমার নাকে লাগছিল। আমাকে দেখে মিসেস সুজুকি খুশি হলেন। আমিও যেতে পেরে খুশি ছিলাম। আগের দিনের মতই তিনি আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে গেলেন আর আমি যাবতনের উপর বসলাম। আসো আমাকে চিনতে পারল। সবকিছু আগের দিনের মতই লাগছিল।
“ইয়োকো, আমি দুঃখিত। যে মূল্যবান জিনিসটা আমি তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম তা এখনো খুঁজে পাইনি। সব জায়গায় খুঁজলাম, বুঝতে পারছি না কোথায় গেল। আশা করছি তুমি রাগ করবে না যদি এখনো একসাথে ডিনার করি? তুমি কি হ্যামবার্গার পছন্দ কর?”
উনি কি আমার সাথে মজা করছেন? আমি হ্যামবার্গারের জন্য পাগল ছিলাম। অন্য কিছু চিন্তা করার কোন সুযোগ নেই। হ্যামবার্গারের জন্য আমি আমার একটা কিডনি বেচতেও রাজি। আমি তাকে বললাম যে হ্যামবার্গার অনেক পছন্দ করি। তিনি এত জোরে হাসলেন যে তার ভাঁজ পড়া মুখটায় দয়াল অভিব্যক্তি ছড়িয়ে পড়ল।
খাওয়ার সময় আমি চিন্তা করছিলাম হ্যামবার্গার কেন? মিসেস সুজুকি কি হ্যামবার্গার অনেক পছন্দ করেন? আমার মনে হল না। হয়ত তিনি ধরে নিয়েছেন আমি পছন্দ করি। একটা বাচ্চাকে খুশি দেখার জন্য হ্যামবার্গার বানানোটা মানা যায়।
“তো ইয়োকো, তোমার সম্পর্কে কিছু বল,” আমরা খেতে খেতে তিনি বললেন।
উমম কি বলব উনাকে?
“তোমার পরিবার সম্পর্কে বল।”
“আমার পরিবারে মা আর একটা জমজ ছোট বোন আছে।”
“সত্যি? জমজ?”
তার চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলাম তিনি কাজারি সম্পর্কে আরো প্রশ্ন করতে চাইছিলেন কিন্তু সত্য এতটা নিষ্ঠুর আর অন্ধকারচ্ছন্ন যে আমি তার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না, এবং মিথ্যা বললাম।
আমি তাকে বললাম যে আমার বাবা না থাকলেও আমরা তিনজন সুখে শান্তিতে বসবাস করছি। আমি বললাম আমার মা খুবই চমৎকার একজন মহিলা। প্রতি বছর আমাদের জন্মদিনে তিনি আমার আর আমার বোনের জন্য নতুন কাপড় চোপড় কিনে আনেন। সবসময় একই রঙ। কটকটে রঙ না, সুন্দর হালকা রঙ, বড়রা যেরকম পড়ে। ছুটির দিনে আমরা তিনজন একসাথে চিড়িয়াখানায় যাই কাছ থেকে পেঙ্গুইন দেখার জন্য। আমি তাকে বললাম, আমি আর আমার বোন একই রুম শেয়ার করে থাকি, কিন্তু এখন আমি নিজের একটা রুম চাচ্ছি। আমি বললাম আমি আর কাজারি যখন ছোট ছিলাম তখন টিভিতে একটা ভয়ের শো দেখে রাতে ঘুমাতে পারিনি, মা আমাদের হাত ধরে ছিলেন। আমি নিজেকে থামাতে পারছিলাম না। তাকে অনেক কিছু বললাম যা কখনো হয়নি, হওয়া সম্ভব নয়।
“শুনে মনে হচ্ছে তোমার মা খুবই চমৎকার একজন মানুষ,” তিনি বললেন।
মিসেস সুজুকি খানিকটা বিড়বিড় করলেন, মনে হচ্ছে হচ্ছে, মুগ্ধ হয়েছেন। আমি উনার কথা শুনলাম আর ভাবলাম আমার সব মিথ্যাগুলো যদি সত্যি হত।
তিনি আমার স্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে, সুতরাং আমি আরো কিছু মিথ্যা কথা বললাম। তাকে বললাম যে আমার স্কুলের কিছু বন্ধুদের নিয়ে সাগর তীরে গিয়েছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে তার হাসি দেখে আমি নিজেকে মনে মনে বললাম উনি যেন কখনো সত্যিটা জানতে না পারেন। কিন্তু আমার ব্রেন এত সব মিথ্যা তৈরি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, আমার কণ্ঠ মাঝে মাঝে একটু চড়ে যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম টপিকটা বদলানো দরকার।
“আহ, আপনার তো দেখি প্রচুর বই!”
হ্যামবার্গারের যে টুকরাটা মুখের ভেতর চাবাচ্ছিলাম সেটা গিলে ফেলে দেয়ালের সাথে রাখা বুক কেসের দিকে তাকালাম। মিসেস সুজুকিকে খুব আনন্দিত দেখাল।
“আমি আসলেই বই অনেক পছন্দ করি। আমার সংগ্রহের অল্প কিছু এখানে। অন্য রুমগুলোতে আরো অনেক বই আছে। আমরা কমিকস পড়তেও ভাল লাগে। ইয়োকো, তুমি কি ধরনের মাঙ্গা (জাপানি কমি) পছন্দ কর?”
“আসলে, বলতে কি…আমি…আমি জানি না, আসলে…”
“ওহ?”
মিসেস সুজুকি দুঃখি চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, তাই আমার কিছু করা উচিত। জানি না কেন, কিন্তু এই বয়স্ক মহিলা আমাকে অপছন্দ করুক তা আমি চাইছিলাম না।
“আচ্ছা, আপনার কাছে যদি কোন ইন্টারেস্টিং বই থাকে, তাহলে সেটা সম্পর্কে আমাকে বলবেন?”
“নিশ্চয়ই, তোমার যা খুশি। তোমাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বই ধার দিতেও আমার ভাল লাগবে। সেটাই করা যাক। তুমি যখন আবার আসবে তখন ফেরত দিও।”
মিসেস সুজুকি আমার সামনে বসে ইন্টারেস্টিং দেখতে নভেল আর মাঙ্গার একটা স্তূপ বানালেন। আমি একটা কমিক বুক নিয়ে বেরিয়ে এলাম। একটা নিয়েছি যাতে আমি তাড়াতাড়ি সেটা শেষ করে কালকে আবার আসতে পারি। আমি যদি সেটা করি, তাহলে একজন লোভী রাজকন্যার মত হিসাব করলাম, যে তিনি হয়ত আমাকে আবারও মজার কিছু খেতে দিতে পারেন। আর আমিও মিসেস সুজুকি আর আসোকে আবার দেখতে পাব। অনেক কিছু আছে যা নিয়ে আমি তার সাথে আলাপ করতে চাই। কল্পনায় দেখতে পেলাম আমি আসো আর মিসেস সুজুকির সাথে এত বেশি সময় কাটাচ্ছি যে আমার পিঠ মেঝের যাবুতোনের সাথে পাকাপাকিভাবে জোড়া লেগে গিয়েছে।
***
এভাবে আমি বারবার মিসেস সুজুকির বাসায় যেতে থাকলাম, যদিও এর মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক অনেক কিছু ঘটেছিল। প্রতিবার, চলে আসার সময় আমি একটা বই ধার নিতাম, যাতে করে ফেরত দেয়ার অজুহাতে আবার ফিরে আসতে পারি। আর যতই খোঁজাখুঁজি চলুক না কেন, মিসেস সুজুকি মনে হচ্ছিল না তার সেই মূল্যবান সম্পদটা আমাকে দেয়ার জন্য আর খুঁজে পাবেন।
