যখন মুখ তুললাম দেখি একটা কুকুর আমার পাশে বসে আছে। গলায় একটা কলার ছিল। তাই প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এর মালিক হয়ত আশেপাশেই কোথাও আছে, কুকুরটাকে খুঁজছে।
পাঁচ মিনিটের মত পার হওয়ার পর আমি বুঝতে পারলাম কাহিনী ভিন্ন। কুকুরটা আমার জুতো কছিল। আর আমি সাবধানে ওটার পিঠ চুলকে দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। কুকুরটা আঁতকে উঠেনি, তার মানে বোঝা যাচ্ছিল লোকজনের সাথে থেকে অভ্যস্ত। তারপর আমি খেয়াল করলাম যে কুকুরটা একটা মেয়ে টেরিয়ার। আমার মনে হল এটাই হয়ত আসো, যেই কুকুরটার পোস্টার সকালে দেখেছিলাম।
আমি কুকুরটা নিয়ে পোস্টারে লেখা সুজুকির ঠিকানায় গেলাম। ছোট একটা বাড়ি। সূর্যাস্তের আলোয় আকাশ তখন লালচে হয়ে ছিল। আমি বেল চাপলাম, আর সাদা চুলের একজন ছোটখাট বুড়ি দরজা খুললেন।
“ওহ আসো! আমার আসো! এটা তো দেখি আসলেই আমার আসো!”
তিনি কুকুরটাকে জাপটে ধরলেন। আনন্দে বুড়ির চোখগুলো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছিল। আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে ইনিই সেই সুজুকি যিনি পোস্টারটা লিখেছেন।
“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি কুকুরটার জন্য অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে আসবে?”
আমি সায় জানিয়ে ভেতরে গেলাম। স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে কিন্তু আমি আশা করছিলাম কোন ধরনের পুরষ্কার হয়ত পাব। হয়ত খানিকটা মিষ্টি, অল্প কিছু টাকা, যে কোন কিছুতেই আমি খুশি। আমি সবসময়ই ক্ষুধার্ত, তাই কোন কিছুতেই সমস্যা নেই। কিছু একটা হলেই আমি খুশি।
আমরা দুজন লিভিং রুমে গিয়ে দুটো যাবুতোনে বসলাম।
“তো তোমার নাম ইয়োকো। আমি মিসেস সুজুকি। আমি মাত্র কালকেই পোস্টারগুলো লাগিয়েছি আর এখনই আসোকে ফেরত পেয়ে গেলাম। একদম বিশ্বাস হচ্ছে না।”
মিসেস সুজুকি আসোর গালের সাথে নিজের গাল ঘষলেন, তারপর উঠে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। দেখে মনে হচ্ছিল এই বাড়িতে তিনি একাই থাকেন।
ট্রেতে কিছু কুকিজ আর কফি নিয়ে ফিরে এলেন। আসো তার পায়ের সাথে লেগে ছিল। ট্রেটা নিচু টেবিলটায় রেখে আবার আমার পাশে এসে বসলেন। তিনি জানতে চাইছিলেন কুকুরটাকে ঠিক কোথায় পেয়েছি। বলার মত নাটকীয় কোন কাহিনী তো ছিল না, কিন্তু আমি যখন বলছিলাম তখন তিনি হাসি মুখে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন।
আমি কয়েকটা চিনির ছোট প্যাকেট আর দুধের কন্টেইনার খলে সব কফিতে ঢেলে ঢকঢক করে গিলে ফেললাম। দুই কামড়ে সব কুকিজ উধাও। কফি আর কুকিজ দুটোই খুব মজার ছিল। আমার খাবারের মধ্যে সাধারণত মিষ্টি কিছু পড়ে না, যদিনা স্কুলের লাঞ্চে মাঝেমধ্যে কোন ডেজার্ট দেয়। বাসায় আমি খুবই কম খাওয়ার মত কিছু পাই, যদি কাজারি না খায় শুধু তখনই। আমাকে যদি এমন কোন হাই স্কুলে যেতে হয় যেখানে কোন লাঞ্চ দেয় না, তাহলে জানি না কিভাবে বাঁচব। হ্যাঁ, আমার এখনই সেটা নিয়ে। দুশ্চিন্তা হয়।
মুখে দয়ালু একটা অভিব্যক্তি নিয়ে মিসেস সুজুকি আমাকে আরেক কাপ কফি ঢেলে দিলেন। এবার আমি কফি গেলার সময় একটু সময় নিলাম। “আমি খুশি হব যদি তুমি ডিনার পর্যন্ত থাক,” তিনি বললেন।
এক সেকেন্ড চিন্তা করে আমি রাজি হলাম। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও ছোট একটা কণ্ঠ গজগজ করে আমাকে বলল, এর আগে কখনো এই মহিলার সাথে আমার দেখা হয়নি, একে আমার এত চাপ দেয়া ঠিক হচ্ছে না।
“সত্যি বলতে কি ডিনার বানানোর জন্য আমি কিছুই এখনো করিনি। আসোকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম।”
তিনি কুকুরটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। কুকুরটার সুখে আমার রীতিমত হিংসা হচ্ছিল।
“ওহ, আমার তোমাকে পুরষ্কার ধরণের কিছু একটা দেয়া উচিত। কি দেয়া যেতে পারে। দাঁড়াও আমি একটু দেখে আসি। একটু অপেক্ষা কর।”
মিসেস সুজুকি কুকুরটাকে রেখে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার জন্য কি নিয়ে আসতে পারেন ভেবে আমার উত্তেজনা হচ্ছিল যার সাথে আমি অভ্যস্ত নই। আমি অনেক সময় ছটফট করি কিন্তু উত্তেজনা হয় না। আমার মনে হল আমাকে হয়ত আরো কয়েকটা কুকিজ দেয়া হবে যেগুলো চাবাতে চাবাতে আমি বাড়ি যেতে পারব। বাড়িতে নিয়ে গেলে ওগুলো আমার থেকে কেড়ে নেয়া হতে পারে।
আসো আমাকে শুকছিল। আমার মনে পড়ল আগের রাতে গোসল করা হয়নি, বাজি ধরে বলতে পারি আমার শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছিল। রুমের মধ্যে চোখ বোলালাম। একটা টিভি আছে, কিন্তু কোন ভিসিআর ছিল না। মিসেস সুজুকির মত একজন বয়স্ক মহিলা সম্ভবত জানেনও না ভিসিআর কি করে ব্যবহার করতে হয়। আমি শুনেছি ভিসিআর চালানো নাকি বেশ কঠিন। আমি নিজে কখনো কোন টিভি কিংবা ভিসিআর ছুঁয়ে দেখিনি।
লিভিং রুমে একটা পুরো দেয়াল জুড়ে বিশাল একটা বুক কেস ছিল। আমি বইগুলোর নাম দেখছিলাম এমন সময় সমস্যাগ্রস্থ চেহারা নিয়ে মিসেস সুজুকি ফিরে এলেন।
“আমি দুঃখিত। আমি তোমাকে আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোথায় রেখেছি ভুলে গিয়েছি। খুঁজতে হবে। তুমি কালকে আবার আসতে পারবে না? আমি তোমার জন্য ডিনার তৈরি করে রাখব।”
আসব কথা দিয়ে আমি বাসায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাইরে তখন অন্ধকার নেমে গিয়েছে। মিসেস সুজুকি আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমার মাথায় নতুন একটা চিন্তা এল: আহ এটাকেই কি তাহলে ‘সি অফ’ করা বলে? আগে কখনো আমার জীবনে কেউ কখনও আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়নি।
