“টাবের মধ্যে ওটা তোর চুল ছিল। আমার শরীরে এসে লাগল, কি ঘেন্নার বিষয়! ছিঃ! তুই কেন তোর মাকে এত ঘৃণা করিস? কাজ করে বাসায় ফিরেছি, আমি একদমই ক্লান্ত। কেন আমার সাথে এমন করিস?”
আগেও এমন ঘটেছে। সমস্যার সমাধানের জন্য আমি মা গোসল করার আগে কখনো গোসল করি না। তাই আমি জানতাম মা যেই চুল নিয়ে অভিযোগ করছিল সেটা আমার না কাজারির ছিল। কিন্তু আমার আর কাজারির চুল একই সমান, আর আমি সেটা বোঝাতে গেলে মা আরো রেগে যাবে। তাই কিছুই বললাম না চুপ করে থাকলাম।
“দেখে মনে হচ্ছে না কোন হাড় ভেঙেছে, কিন্তু তোমার যদি এখনো ব্যথা থাকে তাহলে হাসপাতালে যাওয়া উচিত, নার্স বলল। “মিস এনদো, তুমি কি নিশ্চিত যে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলে? তুমি আগেও এসে বলেছ সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছ, বলনি?”
হাতের ক্ষতে ব্যান্ডেজ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে নার্স আমাকে এই প্রশ্নগুলো করল। আমি কিছুই বললাম না। মাথা নিচু করে বের হয়ে গেলাম। পরেরবার আসলে আমাকে অন্য কোন অজুহাত বানিয়ে তারপর আসতে হবে।
মায়ের নির্যাতনের কথা লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে আমি খুবই সিরিয়াস ছিলাম। মা আমাকে বলেছেন কেউ যেন এসব কথা না জানে। আমি যদি কাউকে কখনো বলি তাহলে মা আমাকে খুন করবেন।
“তুই কি বুঝতে পারছিস না? আমি তোকে মারি কারন তুই খারাপ। এখানে আমার কিছুই করার নেই। কিন্তু তুই কিন্তু কাউকে বলবি না। বুঝেছিস? কথাটা শুনলে আমি তোর একটা উপকার করব, আর সেটা হল এই ব্লেন্ডারের সুইচ অন করব না।”
আমি সে সময় ইলিমেন্টারি স্কুলে পড়তাম। চোখে পানি নিয়ে কোনরকমে শুধু মাথা ঝাঁকালাম। মা সুইচ থেকে আঙুল সরিয়ে আমার হাতটা ছেড়ে দিলেন। আমি তাড়াতাড়ি ব্লেন্ডারের ভেতর থেকে হাত বের করে নিলাম।
“ছোট্ট একটা চাপ দিলে আর তোর হাতটা জুস হয়ে যেত।”
মা হাসলেন, তার মুখ থেকে চকলেট আইসক্রিমের গন্ধ আসছিল। এত মিষ্টি গন্ধ যে আমার বমি পাচ্ছিল।
মা নিজে লোকজনের সাথে ভালভাবে মিশতে পারতেন না। কিন্তু আমার সামনে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ শয়তান। বাড়ির বাইরে বলার মত তার কিছু ছিল না। দুই সন্তানকে পালার জন্য তাকে কাজ করতে হত কিন্তু অন্য লোকজনের সামনে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারতেন না। ভেতরে ভেতরে আমি আর মা একই রকম ছিলাম। একটা ব্যাপারে আমাদের মধ্যে মিল ছিল, সেটা হল আমরা দুজনই সদা হাসিখুশি কাজারিকে ভালবাসতাম। কাজে যখন কোন কিছু ঠিকমত হত না তখন মা ভয়াবহ খারাপ মেজাজ নিয়ে বাসায় ফিরতেন। বাসায় ফিরে আমাকে খুঁজে বের করে লাখি ঘুষি মারতেন।
“আমি তোর জন্ম দিয়েছি। তোর জীবন, তোর মৃত্যু আমার হাতে। কেউ এর কিছুই বদলাতে পারবে না!”
অন্তত আমি তার সন্তান না বলার চেয়ে ভাল। মা যখন আমার চুল মুঠি করে ধরতেন তখন আমি এরকমটাই ভাবতাম।
২
ক্লাস রুম পরিস্কার করার সময় একজন ক্লাসমেট আমার সাথে কথা বলল। গত তিন দিন ছয় ঘন্টার মধ্যে এই প্রথম কোন ক্লাসমেট আমার সাথে কথা বলল। আসল কথা হল, তিন দিন আগের কথাবার্তা যেটা হয়েছিল সেটা ছিল এরকম: “অ্যাই এনদো, তোমার ইরেজারটা একটু ধার দাও,” “দুঃখিত, আমার কোন ইরেজার নেই।” “ধ্যাত।” ব্যাস ওইটুকুই। আজকের কথাবার্তা খানিকটা লম্বা ছিল।
“ইয়োকো এনদো, তুমি কি জানো তুমি ক্লাস ১ এর কাজারি এনদোর হুবহু কপি? তাই না? কিন্তু কোন কারনে তোমাদের দুজনকে দেখে দুই বোন মনে হয় না।”
ঝাড়ু হাতে আমার ক্লাসমেটটা বলল। আশেপাশের অন্য মেয়েরা হেসে উঠল। ওর কথাগুলো আমার কাছে নতুন কিছু না, তাই আমি তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। কিন্তু অন্য মেয়েদের হাসির ব্যাপারটায় আমার অদ্ভুত লাগছিল।
“এরকম কোরনা, তুমি ওর মনে আঘাত দেবে।”
“আমি দুঃখিত। আমি নিষ্ঠুর হতে চাইনি।”
“ঠিক আছে।”
অন্তত আমি এরকম বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অনেকদিন কোন কথা না বলায় আমার গলা কাজ করছিল না। আমি ঝাড়ু দিতে থাকলাম, আশা করছিলাম তারা চলে যাবে। ক্লাসরুম পরিস্কার করার কাজ সবার কিন্তু সত্যিকার অর্থে শুধু আমি একাই ফ্লোর ঝাড়ু দিচ্ছিলাম।
“আচ্ছা এনদো, তুমি তো আজকে নার্সের অফিসে গিয়েছিলে তাই না? আরেকটা কালশিটে পড়েছে নাকি? তোমার পুরো শরীরটাই কি একটা বড় কালশিটে না এখন? হু আমি সব জানি। জিমে, সাঁতার ক্লাসে তোমাকে বেদিং স্যট পরার সময় আমি সব দেখেছি। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে বিশ্বাস করছে না। তোমার পোশাক খুলে ওদেরকে দেখাও তো।”
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। এমন সময় দরজা খুলে টিচার ভেতর ঢুকলেন। যে মেয়েগুলো আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল, সরে গিয়ে ঝাড়ু দেয়ার ভান করতে লাগল। বাঁচা গেল, আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম।
স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় পার্কের একটা বেঞ্চে বসে ঐ মেয়েদের হাসাহাসি করার ব্যাপারটা চিন্তা করছিলাম। লোকজনের এমন কিছু বলা উচিত না যাতে করে অন্য কেউ কষ্ট পায়। চিন্তা করতে গিয়ে আমার বমি বমি লাগছিল। ওদের ব্যাপারটা আজব লাগছিল। সবাই কাজারির সাথে যেমন ব্যবহার করে, তেমন ব্যবহার আমার সাথে করানোর জন্য আমাকে কি করতে হবে? আমি অন্য সবার মত হতে চাই। আমি চাই পরিস্কারের কাজে ফাঁকি দিতে, কিছু কাগজ একসাথে দলামচা করে বল বানিয়ে ঝাড়ু দিয়ে হকি খেলতে।
