মা যদি দেখতেন কাজারি আমাকে খাবার দিচ্ছে তাহলে কিছু বলতেন, রাগতেনও না। তিনি কখনো কাজারিকে বকতেন না। সবসময় কাজারির যত্ন নিতেন।
কাজারির ঝুটো খেয়ে আমি ওকে ধন্যবাদ দিতাম আর ভাবতাম আমার বোন আমার কাছে কতটা মূল্যবান ছিল। ওকে রক্ষা করার জন্য কাউকে খুন করতে হলে আমি সেটাও করতে এক পায়ে খাড়া ছিলাম।
***
আমাদের পরিবারে কোন বাবা ছিল না। যতদিনে আমি এটা বুঝতে সক্ষম হয়েছি ততদিনে শুধু আমরা তিনজন ছিলাম-মা, কাজারি আর আমি। এভাবেই আমরা চলেছি, আমি জুনিয়র হাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষে উঠা পর্যন্ত।
বাবা না থাকার কারনে আমার জীবনে কি কি প্রভাব পড়েছে তা আমার জানা ছিল না। যদি বাবা থাকতেন তাহলে মা হয়ত আমার দাঁত ভাংতেন না কিংবা সিগারেট দিয়ে ছ্যাকা দিতে না। কিংবা হয়ত তখনো করতেন। কে জানে। হয়তো আমিও কাজারির মত হাসিখুশি কেউ হতাম। সকাল বেলা মাকে যখন এক প্লেট টোস্ট আর ডিম ভাজা হাতে নিয়ে হাসতে দেখতাম, তখন এসব চিন্তা আমার মাথায় আসত। তিনি প্লেটটা অবশ্যই কাজারির সামনে নিয়ে রাখতেন। আমার জন্য কিছু থাকত না। আমি জানতাম যে আমার তাকানো ঠিক নয়। কিন্তু আমি জেগে আছি, কিচেনে দাঁড়িয়ে আছি, কিভাবে না তাকিয়ে থাকা যায়?
মা আর কাজারির আলাদা আলাদা রুম ছিল। আমার ছিল না। আমার জিনিসপত্রগুলো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আর অনেক হাবিজাবি জিনিসপত্রের সাথে একই সাথে ক্লজিটে রাখা হত। কপাল ভাল যে আমার এমনিতেও বলার মত কিছু ছিল না। থাকার জন্য আমার খুব বেশি জায়গার প্রয়োজনও ছিল না। স্কুলের বই আর স্কুল ড্রেস ছাড়া কিছু ছিলই না বলা যায়। আমার অন্য কাপড়গুলো ছিল কাজারির দেয়া পুরোনো কাপড়। কখনো যদি আমি পড়ার জন্য কোন বই বা ম্যাগাজিন হাতে নিতাম তাহলে মা এসে ছোঁ মেরে কেড়ে নিতেন। নিজের বলতে একমাত্র যা ছিল সেটা হল একটা যাবতোন বালিশ (চেয়ারে রাখার বালিশ)। কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে বালিশটা বিছিয়ে তার উপর বসে আমি পড়াশুনা করতাম, কিংবা চিন্তা করতাম, অথবা গুনগুন করে কোন গান গাইতাম। মা কিংবা কাজারির দিকে যেন চোখ না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার চেষ্টা করতাম। মায়ের সাথে চোখাচোখি হলে তিনি হয়ত আমার দিকে ছুরি ছুঁড়ে মারতে পারেন। আমার যাবুতোনটা আমার ফুটোন (জাপানি বিছানা) হিসেবেও কাজ করত। আমি বিড়ালের মত গুটিসুটি মেরে ওটার উপর ঘুমাতাম আর সব কষ্ট ভুলে যেতাম।
প্রতিদিন সকালে নাশতা না করে বের হতাম। বাসা থেকে কখনোই দ্রুত না বের হয়ে পারতাম না কারন আমাকে দেখলেই মা চোখ গরম করে বলতেন, “এই মেয়ে এখনো কি করছে এখানে?” দরজা দিয়ে বের হতে কয়েক সেকেন্ড এদিক ওদিক হলেই শরীরে নতুন একটা কালশিটে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। আমি কিছু না করলেও মা কোন একটা ছুতো বের করে আমাকে পেটাতে যেতেন।
হেঁটে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে কাজারি আমার পাশ কাটিয়ে যেত আর আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ও যখন হাঁটত ওর চুল সামনে পেছনে দুলত। আমি, মা, কাজারি যখন একসাথে থাকতাম তখন আমাদের মধ্যে প্রায় কোন কথাই হত না। এমনকি মা আমাদের সাথে না থাকলেও দুই বোনের মধ্যে যেরকম কথা হওয়ার কথা তাও হত না।
স্কুলে কাজারি খুব জনপ্রিয় ছিল। ওর অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল। তারা একত্রে অনেক ভাল সময় কাটাত। আমার হিংসা হত, কিন্তু কখনো ঐ সার্কেলে ঢোকার মত সাহস আমার হয়নি।
কোন টিভি প্রোগ্রাম বা কোন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী সম্পর্কে আমার কিছু জানা ছিল না। টিভি দেখতে গেলে মা আমার উপর ক্ষেপে যেত, যে কারনে টিভির জীবন সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। আর তাই সবাই যে বিষয়ে আগ্রহ নিয়ে কথা বলত, সে সম্পর্কে আলাপ করার মত কোন প্রত্যয় আমার মধ্যে ছিল না। আমার কোন বন্ধু ছিল না। বিরতির সময় আমি ডেস্কের উপর মাথা নামিয়ে ঘুমানোর ভান করতাম।
কাজারির উপস্থিতি আমার কাছে বিশাল স্বস্তির বিষয় ছিল। সবাই কাজারিকে ভালবাসত, ওর বোন হতে পেরে, একই রক্ত বহন করতে পেরে আমার গর্ববোধ হত।
আমার সাথে কাজারির চেহারার অনেকটাই মিল ছিল। কেউ হয়ত শুনলে বলবে যে তোমরা তো জমজ, মিল তো থাকবেই। কিন্তু কেউ আমাদেরকে চিনতে ভুল করত না। কাজারি ছিল প্রাণখোলা, হাসিখুশি। আমি গোমড়ামুখি, চুপচাপ। এমনকি আমাদের স্কুলের ইউনিফর্ম এক হলেও আমারটা ছিল নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত।
একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে টেলিফোনের খাম্বায় একটা হারানো কুকুরের বিজ্ঞাপন দেখলাম। একটা মেয়ে টেরিয়ার, নাম আসো। সাধারণ একটা হাতে আঁকা ছবি, সাথে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা ছিল, “কুকুরটা পেয়ে থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করুন, সুজুকি।”
আমি পোস্টারটা পড়লেও সেটা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামালাম না। সত্যি কথা হল আমার হাত আগেরদিনের মারের কারনে ভয়াবহ রকমের ব্যথা করছিল। ঐদিন ক্লাসে এতটা ব্যথা করছিল যে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। বাধ্য হয়ে স্কুল নার্সের সাথে দেখা করতে গেলাম। সে আমার হাতের কালশিটে দেখে চমকে গেল।
“কিভাবে হল এসব?” সে জানতে চাইল।
“সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।”
ডাহা মিথ্যা কথা যদিও। সত্যি হল, মা দেরি করে বাসায় ফিরেছিলেন। গোসল করতে গিয়ে টাবে একটা বড় চুল পান আর ক্ষেপে গিয়ে আমাকে মারেন। সেভাবে হাতে দাগটা পড়েছিল। আমি ছিটকে পড়ে টেবিলের এক কোণায় গুঁতো খাই। মনে মনে নিজেকে লাথি মারছিলাম এরকম কপালের জন্য।
