এই টেপটা শোনার পর তোমার হয়ত প্রবল অনুতাপ হবে। তুমি হয়ত ভাবছ তুমি যদি সবকিছু ভুলে যেতে পারতে আর এই টেপ শোনার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারতে। যদি সেটাই মনে হয়ে থাকে তাহলে ছেনিটা দিয়ে ডেস্কের উপর আরেকটা আঁচড় কাটো, তাহলে হয়ত তোমার ভাল লাগতে পারে।
ডেস্কটা তোমার স্বপ্নের অংশ নয়। ডেস্কের উপরের আঁচড়ের সংখ্যার অর্থ তুমি এর আগে কতবার এই টেপটা শুনেছ আর তোমার স্মৃতি মুছে ফেলেছ।
***
এরপর ঐ জাদুর কথাগুলো চলল। যা বুঝলাম, তা হলো অতীতের আমি টেপটা ব্যবহার করে আমার নিজের স্মৃতি বদলে দিয়েছে। আমি ডেস্কের সামনে বসে মাথা নিচু করে ফোঁপাতে থাকলাম। ছেনির আঁচড়গুলো থেকে কিংবা হয়ত ড্রয়ারের ভেতর থেকে, যেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না, একটা অদ্ভুত ভ্যাপসা বাজে গন্ধ ভেসে আসছিল। বাইরের সত্যিকারের দুনিয়া থেকে শুধু এই গন্ধটাই আমার দুনিয়ায় এসে পৌঁছাতে পারছিল, ডেস্কের এই ড্রয়ার দিয়ে।
আমি বিছানার কিনারায় গিয়ে বসলাম আর অসংখ্য চিন্তার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এমন একটা পৃথিবী যার উপরিভাগ পঁচতে থাকা লাশে ভারি হয়ে আছে, সেখানে আমি একমাত্র মানুষ যে এখনো স্কুলে যাচ্ছে, আসছে, এখনো স্কুলের ইউনিফর্ম পরছে। রেল গেটে আমি এখনো আমার কমিউটার পাশ দেখাই, পুরো ট্রিপের ভাড়া দেয়ার প্রমাণ। অবাক হয়ে ভাবলাম স্কুলের দিকে হেঁটে যাওয়া, ট্রেনে চড়ার ভান করা, স্কুলের গেটের দিকে যাওয়া, সব জায়গায় নিশ্চয়ই আমাকে মাটির উপর পড়ে থাকা নরম দেহগুলো মাড়াতে হয়েছে। আমি নিশ্চয়ই সেই অপরিস্কার ক্লাসরুমে ঢুকেছি, মুখে নকল হাসি নিয়ে যা কিনা আমাকে অন্যদের ঘৃণা থেকে দূরে রাখত। আমি নিশ্চয়ই কল্পনা করছি টিচার এখনো আমার বখাটে ক্লাসমেটদের দিকে চিল্লিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে থামানোর জন্য। আসলে সত্য হল আমি আমার স্কুল ডেস্কে বসে ছিলাম যেখানে অন্য সবাই মরে গিয়েছে। আমার চুল বড় হয়ে গিয়েছে, চোখের দৃষ্টি শূন্য, মুখে তখনো নকল হাসি, আমাকে দেখতে মানুষের চেয়ে বেশি বন্য কোন জন্তুর মতই লাগছে।
দরজায় একটা টোকা পড়ল। আমি উত্তর দিলাম। মা দরজা খুললেন, হাতে একটা ক্যাক্টাস।
“তুমি এখনো জেগে আছ? তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পর,” তিনি বললেন, মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। তাকে দেখে জীবিত মনে হলেও আমি জানি যে তার লাশ অন্য কোথাও পড়ে আছে।
পুরো দুনিয়ায় আমিই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। এ কথা চিন্তা করতেই কিছু নাম না জানা অনুভূতি আমার ভেতরে বুদবুদের মত ফুটতে থাকল, থামাতে পারছিলাম না।
“তুমি কাপছ কেন? তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
আমি মাথা নাড়লাম, বিড়বিড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। আমি যদি কেঁদে থাকি তাহলে সেটা অসুস্থতার জন্য নয়। বরং আমার শান্তির জন্য। অবশেষে আমি এমন একটা দুনিয়ায় পৌঁছাতে পেরেছি যা আমি অনেকদিন থেকে চাইছিলাম। যেখানে আমি একদম একা। এটা উপলদ্ধি করতে পেরে আমার শান্তি লাগল।
কাজারি অ্যান্ড ইয়োকো
১
মা যদি আমাকে কখনো খুন করতে চায়, তাহলে সেটা কিভাবে করবেন? হয়তো কিছু একটা দিয়ে মাথায় সজোরে আঘাত করে, যেমনটা তিনি সবসময়ই করেন। কিংবা গলা চিপে ধরে যেটা তিনি মাঝে মাঝেই করেন। কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের বারান্দা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারেন, আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর জন্য।
শেষেরটাই ভাল হবে। তার জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি আমি আত্মহত্যা করেছি এরকম কিছু দেখানো যায়। কেউ যখন আমার ক্লাসমেট কিংবা টিচারদের কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চাইবে, তারা তখন বলবে :
“ইয়োকো এনদো কোন একটা সমস্যা নিয়ে সবসময় অন্যমনস্ক থাকত। ওর সমস্যা নিশ্চয়ই ওর মাথায় চড়ে বসেছিল। যে কারনে ও নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
কেউ সন্দেহ করবে না আমার আত্মহত্যা করা নিয়ে।
ইদানিং মা আমার উপর প্রত্যক্ষ নির্যাতন করা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর অনেক সময়ই শারীরিকভাবে আঘাত করেন। যখন ছোট ছিলাম তখন ব্যাপারটা ছিল পরোক্ষ ধরণের। আমার বোনের জন্য কেক রাখা হত, আমার জন্য রাখা হত না। আমার বোনের জন্য কাপড় কেনা হত, আমার জন্য কেনা হত না। মা যতভাবে সম্ভব আমার উপর মানসিক অত্যাচার চালিয়ে গিয়েছেন।
“ইয়োকো তুমি তো বড়, তাই না? মানিয়ে চলতে শিখো,” তার কথা ছিল এরকম।
কাজারি আর আমি জমজ। কাজারি দেখতে সুন্দর আর হাসিখুশি। ও হাসলে মনে হত ফুল ফুটলো। স্কুলের সব ছেলেমেয়েরা, সব টিচাররা ওকে পছন্দ করত। আমিও ওকে পছন্দ করতাম কারন মাঝে মাঝে ও ওর রাতের খাবার থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার আমাকে দিত।
মা কখনো আমার জন্য রাতের খাবার বানাতেন না, তাই আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকতাম। আমি যদি কখনো ভুলেও রেফ্রিজারেটরের দরজা খুলতাম তাহলে মা একটা অ্যাস্ট্রে হাতে ছুটে আসতেন। আমি তাকে এতটাই ভয় পেতাম যে এমনকি স্ন্যাক্সও খেতে পারতাম না। মাঝে মাঝে এত ক্ষুধার্ত লাগত যে মনে হত মরে যাব। আমি খাবি খেতে শুরু করতাম, কাজারি একটা প্লেটে করে ওর বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে আসত তখন। সত্যি বলতে কি, আমার কাছে ওকে তখন স্বর্গদূত মনে হত। এক প্লেট আধ খাওয়া ম্যাকারনি আর চিজ কিংবা কয়েক টুকরা গাজর হাতে ওকে মনে হত সাদা ডানা ওয়ালা স্বর্গদূত।
