অবশ্যই আমি এর সাথে আরো কথা যোগ করেছিলাম যাতে আমি নিজেকে এর থেকে রক্ষা করতে পারি। আমি আরো কিছু কথা বললাম ওদের স্মৃতি বদলানোর জন্য। আমি তাদেরকে বললাম আমার কণ্ঠ যে শুনেছে তা ভুলে যেতে আর তাদেরকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করলাম।
ওদেরকে কথাগুলো বলার এক ঘণ্টা পরে আমি স্কুলে ছিলাম। হঠাৎ কাজুয়ার রুমে হৈচৈ শোনা গেল। কি হচ্ছে দেখার জন্য আমি সেখানে গেলাম আর দেখতে পেলাম আমার ভাইয়ের মাথা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, রক্তের ছোটখাট একটা পুকুর সৃষ্টি হয়েছে। সব শিক্ষার্থী আর টিচার সবাই ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।
জাদুর মাথাটার যা করার কথা, যারা যারা দৃশ্যটা দেখেছিল তারা সবাই এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে। চিৎকার করতে থাকা ছেলেপেলেদের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আমি আমার বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম, তাদের একই পরিণতি হয়েছে, যেখানেই থেকে থাকুক কেন তারা।
এক ঘণ্টা পর যারা কাজুয়ার মাখা মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখেছিল তারা সবাই একসাথে নিজেদের মাথা হারাল। ধুপ ধুপ করে পুলিশ আর আশেপাশের লোকজনের সামনে সেগুলো খসে পড়ল। এবার কোন চিৎকার হয়নি, শুধু কিছু ভারি জিনিস হাত থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। মাথা খসে পড়ার দৃশ্য আরো লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।
ভয় আর বিভ্রান্তি মহামারির মত ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে টিভি ক্যামেরা এসে মুন্ডুহীন দেহগুলোর ছবি দুনিয়া জুড়ে ব্রডকাস্ট করল। আর আমার কথাগুলো ইলেক্ট্রিক্যাল সাতের মাধ্যমে প্রায় পুরো মানব জাতির মাথা কেটে ফেলল।
সেই সন্ধ্যায় শহরটা একদম নীরব হয়ে ছিল। নীরবতার মধ্যে অস্ত যাওয়া সৰ্যটা লম্বা ছায়া ফেলছিল। আশেপাশের এলাকার মধ্যে দিয়ে আমি হাঁটছিলাম। সবকিছু থেকে লাল আর কাঁচা গন্ধ ভেসে আসছিল। অনেক মানুষ সোজা হয়ে চুপচাপ শুয়ে ছিল। অবাক ব্যাপার হল, পশুপাখি আর কীটপতঙ্গও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। মুন্ডুহীন অনেক কুকুর-বিড়াল, গুবরে পোকা আর মাছিও মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম।
শহরের মধ্যে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছিল, বিভিন্ন জায়গা থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছিল। টিভিতে প্রায় কিছুই দেখাচ্ছিল না। কয়েকটা দৃশ্য দেখেছিলাম যেখান সংবাদ পাঠকদের মাথা তাদের ডেস্কের উপর পড়েছিল।
এক পর্যায়ে সমস্ত শহরের সমস্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। পাওয়ার প্লান্টগুলো চালানোর মত লোকজন না থাকায় অতিরিক্ত লোড নিতে পারে ওগুলো সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি কল্পনায় দেখতে পেলাম সারা পৃথিবীতে একই অবস্থা চলছে।
শহরের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে পুরো দুনিয়াতে আমিই একমাত্র মানুষ যে বেঁচে আছে। চিন্তাটা আমাকে বিষণ্ণ করে তুলছিল। এমন কোন জায়গা ছিল না যেখানে কেউ না কেউ পা ছড়িয়ে পড়ে ছিল।
একজন নিথর ডাইভারকে দেখলাম যার শরীরে মাথা আছে, ক্রাশ করা একটা গাড়ির হুইলে উপর মাথা দেয়া। গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এই কেসে, আমি ভাবলাম, এক্সিডেন্টটা নিশ্চয়ই লোকটা কোন খসে পড়া মাথা দেখার আগে ঘটেছিল।
রাতের শান্তিপূর্ণ আকাশে তারা ফুটতে লাগল। একটা পথচারী ব্রিজের উপর বসে আমি উপরে তাকিয়ে ছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হল মেয়েটাকে দেখার আগ পর্যন্ত চিন্তায় এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম যে কোন কিছু টেরই পাইনি।
তারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছোট ছোট পায়ের শব্দ কানে আসছিল। আর সেই সাথে কোনখান থেকে কেউ একজন সাহায্য চাইছিল। ব্রিজের উপর থেকে একটা জ্বলন্ত গাড়ির আগুনের আলোতে আমি দেখলাম একটা বাচ্চা মেয়ে আগুনের বিপদজনক রকমের কাছে চলে গিয়েছে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে আমি ওকে ডাকলাম। সে যখন আমার দিকে তাকাল তখন ওর মুখে স্বস্তির অভিব্যক্তি দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছিল যেন অনেক দিন সে কোন মানুষের কণ্ঠ শুনতে পায়নি।
ঐ মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম কেন মেয়েটার ধরে এখনো মাথাটা ছিল। কারন সে অন্ধ ছিল।
আমার কাছে এই মেয়েটাকে মনে হচ্ছিল যেন কোন দুর্ভাগ্য। আমি উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। লজ্জা একটা সোত আমার পুরো হৃদয়টা ছেয়ে ফেলল। আর পুরো দুনিয়াটা আগের মত হল না।
অনেকদিন পর্যন্ত আমি ভুগেছিলাম। পুরো পৃথিবী মৃত আর পঁচতে থাকা লাশে ভরে ছিল। আমার তীব্র অনুভূতি হচ্ছিল যে আমি আর এই পৃথিবীটাকে সহ্য করতে পারছি না।
আমি ঠিক করলাম আমাকে সবকিছু ভুলে যেতে হবে। আমি ঠিক করলাম বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি আমাকে অন্ধ হয়ে যেতে হবে। আমাকে এমন একটা বিভ্রমের মধ্যে ঢুকে যেতে হবে যেখানে দুনিয়াটা স্বাভাবিকভাবে চলছে, ঠিক আগের মত। টেপের শেষে আমি এই কথাগুলো রেকর্ড করলাম।
“প্রতিবার তুমি ছেনি দিয়ে ডেস্কের উপর একটা আঁচড় কাটার পর সেই অবস্থায় ফিরে যাবে যেখানে তুমি স্বাভাবিক একটা পৃথিবীতে বাস করছিলে। তুমি তোমার মত খেয়ে যাবে, ঘুমাবে, বাঁচার জন্য যা যা করতে হয় করবে, কিন্তু এসব সম্পর্কে কিছুই মনে থাকবে না। তোমার মনে হবে যেন তোমার জীবন যেমন ছিল বরাবর সেরকমই চলছে।”
আমার রুমের ডেস্কটা শুধ এর বাইরে ছিল। “তোমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় ডেস্কের ব্যাপারটা ধরতে পারবে না।” অন্যভাবে বললে, আমি ভাবছি আমি একটা সাধারণ জীবন কাটাচ্ছি, কিন্তু বাস্তবের সাথে আমার একমাত্র সংযোগ থাকবে আমার ডেস্কটার মাধ্যমে।
