“কি করছ তুমি এখানে?” মুখে নিরীহ একটা হাসি নিয়ে সে প্রশ্ন করল। আমি আমার দু হাত দিয়ে ওর গলা চেপে ধরলাম। ওর কাঁধগুলো অনেকটা মেয়েদের মত সরু। ও অবাক হয়ে উঠে বসল। আমি আমার সমস্ত শক্তি আমার কণ্ঠে জমা করে বললাম, “তুমি ম-র-বে-এ-এ!”
ওর চোখগুলো ভয়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল, ওর সরু আঙুলগুলো সাহায্যর জন্য বাতাসে হাত নাড়াল কিন্তু কিছুই পেল না। এই আগে আমি যখনই আমার শক্তি ব্যবহার করেছি, সবসময় মাথার মধ্যে বিস্ফোরনের মত অনুভূতি হয়েছে। এইবার কিছুই হল না। এমনকি আমার নাক দিয়ে রক্তও গড়িয়ে পড়ল না।
ওর গলা থেকে আমার হাত দুটো সরিয়ে নিলাম। অদ্ভুত কোন কারনে ও কাশলও না, ঢোঁক গিলল না। ও আমার দিকে এগিয়েও এলো না। শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল, যেন সবকিছু কোন ধরনের স্বপ্ন ছিল। আমি ওর এই আচরণ কোন কিছুর সাথে মেলাতে পারলাম না। রুম থেকে বের হওয়ার সময় ফিরে দেখি ও গভীর, শান্তিময় ঘুম ডুবে আছে।
যে কোন মুহূর্তে আমার মাথাটা ফেটে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। আমি এমনভাবে ছুটে আমার রুমে ফিরে এলাম যেন আমার ভেতরে কোন সুইচ উলটে গিয়েছে। ডেস্কের উপর তাকিয়ে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার দেখতে পেলাম, যেটা আমি আগে ওখানে খেয়াল করিনি। ছোট আর সস্তা ধরনের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার। পাশে একগাদা ব্যাটারি রাখা। ক্যাসেট প্লেয়ারটা ঐ ধরনের ছিল যেগুলো কিনা শুধুই ব্যাটারিতে চলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন ওটা এখানে আগে দেখিনি, ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হচ্ছিল।
প্লেয়ারে একটা টেপ ভরে রাখা ছিল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল টেপে যাই রেকর্ড করা থাকুক না কেন, আমার সেটা শোনা ঠিক হবে না। অনেকটা যেন কোন গোপন নির্দেশ আমার ব্রেনের গভীরে ঢুকিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু আমার আঙুল সোজা প্লে বাটনে চাপ দিল। নিজেকে সামলাতে পারিনি।
প্লাস্টিকের স্বচ্ছ অংশটা দিয়ে টেপটাকে ঘুরতে দেখতে পাচ্ছিলাম। স্পিকারগুলো দিয়ে আমার নিজের কষ্ঠ ভেসে এল। উত্তেজিত আর কাঁপাকাপা কণ্ঠ।
***
ব্যাপারগুলো জটিল রূপ ধারন করেছে।
ঠিক কত বার আমি এই টেপ প্লে করে শুনেছি? এমনকি, এখন যখন আমি এই কথাগুলো রেকর্ড করছিলাম, তখনো অবাক হয়ে ভাবছিলাম।
তুমি নিশ্চয়ই কয়েকদিন পরের কিংবা কে জানে হয়ত কয়েক বছর পরের আমি, যে আমাকে শুনছ।
তাতে কিছু আসে যায় না। এই টেপ যখন শুনছ, তখন সম্ভবত তোমার কিছুই মনে নেই তোমার সাথে কি ঘটেছে। কারন হল আমি এই টেপে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখছি যাতে তুমি সবকিছু ভুলে যাও, আর আমি চাইছি এমন একটা জীবন শুরু করতে যেখানে আমি অনেক বিষয় এড়িয়ে যেতে চাই।
সে কারনে এই টেপটা প্রস্তুত করেছি। যাতে ভবিষ্যতের আমি, যে সবকিছু ভুলে একটা সাধারণ জীবন কাটাচ্ছে, জানতে পারে যে, সে অতীতে কী কী করেছে।
হঠাৎ করে এই টেপটা চালাতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছা কেন হল সেটার পেছনেও একটা কারন আছে। কারন আমি এই মেসেজের শেষে কথাগুলো রেকর্ড করে রেখেছিঃ “তোমার যদি কখনো কাউকে খুন করার ইচ্ছা হয়, অথবা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে, তাহলে তুমি তোমার ডেস্কের উপর ক্যাসেট প্লেয়ারটা দেখতে পাবে, আর এর ভেতরে রাখা টেপটা শুনতে চাইবে।”
তুমি যখন এই টেপটা শুনছ, তখন আমি জানি না তুমি কাকে খুন করতে চাইছিলে না নিজেকে নিজে খুন করতে চাইছিলে কিনা।
কিন্তু আসল কথা হল, তুমি যেহেতু এই টেপ শুনছ তারমানে এ দুটোর কোন একটা অবশ্যই ঘটেছে। আর এর দ্বারা প্রমানিত হয় যে তুমি একটা শান্তিপূর্ণ, সুখি জীবন কাটাতে পারছ না, যার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে।
কিন্তু কিছু কথা আছে যা তোমাকে আমার বলা দরকার। কাউকে খুন করতে হবে বা নিজেকে খুন করতে হবে এরকম মনে হওয়ার একদমই কোন প্রয়োজন তোমার নেই। কারনটা একদমই সরল, অনেক দিন আগেই, বস্তুত সবাই চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছে। তোমার বাবা, তোমার মা, তোমার ভাই, তোমার সব ক্লাসমেট আর টিচারেরা, যাদের সাথে তোমার কখনো দেখাই হয়নি তারাও, কেউই আর জীবিত নেই। পুরো পৃথিবীতে সব মিলিয়ে হয়ত হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ বেঁচে আছে।
তোমার কি মনে আছে, একবার চিন্তা করেছিলে কিভাবে দুনিয়ার সবার সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়? মনে আছে তাই না?
কুকুরটা যেদিন মারা গেল তার পরের দিন সকালে আমি আমার জঘন্য হাসিটা মখে টেনে নাশতা করতে নিচে গিয়েছিলাম। কাজুয়া, বরাবরের মত ওর চোখ ডলছিল, কিন্তু সেখানে ছিল। মা ওর সামনে এক প্লেট ডিম ভাজা এনে রেখেছিল। বাবা ভুরু কুঁচকে পত্রিকার পাতায় ডুবে ছিল। পাতা উল্টানোর সময় পত্রিকাটা আমার হাতের সাথে ঘষা খাচ্ছিল। টিভিতে একটা পরিস্কারকের বিজ্ঞাপন হচ্ছিল যেটা দিয়ে সবকিছু নাকি সহজেই পরিস্কার করা যায়। হঠাৎ করে আমি এর কোন কিছু আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি তাদের সবাইকে মেরে ফেলার সদ্ধান্ত নিলাম।
আমি এই কথাগুলো ব্যবহার করেছিলাম: “এক ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের ঘাড়ের উপরের সব কিছু খসে পড়বে।”
এর সাথে পরবর্তী নির্দেশটা যোগ করলাম : “যখন তোমাদের মাথাগুলো মাটিতে খসে পড়বে, সেটা সবার জন্য সংকেত হবে একই নির্দেশ মেনে নেয়ার।”
