কাজুয়া কখনো সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু আমার মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না যে ওর মুখের ঠাণ্ডা হাসিটা আমার নির্বুদ্ধিতাকে উৎসর্গ করে হাসা। ওইটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আতংকিত করে তুলত। ভুতের মত আমার পিছু পিছু অনুসরণ করত, আমাকে নির্যাতন করত। এরকম সময়ে আমি এমনকি স্কুলের সিঁড়িতে ওঠার সময়ও আশেপাশে তাকিয়ে দেখতাম কেউ নেই অথচ তারপরও আমার মনের ভেতর আমি নিজের চুল ছিড়তাম আর দেয়ালের একটার পর একটা লাথি মেরে যেতাম। আমার ভাইকে এতটা ঘৃণা করার পরও আমি আমার নিজের সামনে দাঁড়াতে পারতাম না।
এখন পর্যন্ত আমার মনে হয় কাজুয়াই আসলে আমার সমস্ত যন্ত্রণার মূল। এইসব অনুভূতিগুলো ওকে খুন করার ইচ্ছাটাকে প্রবল করে তুলছিল।
***
ক্যাসেট প্লেয়ারের স্টপ বাটন চেপে থামিয়ে আবার রিওয়াইন্ড করে শুরুতে নিলাম। এই গল্পটা বারবার শুনতে গিয়ে আমি আমার কাঁপুনি থামাতে পারি না। কান্নায় চোখ ঘোলা হয়ে আসে। শরীরের সব শক্তি ছেনিটার উপর একত্র করে ডেস্কের উপর আরেকটা আঁচড় কাটি।
আমি ঘামছিলাম, ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলাম। জানালার বাইরে অসীমে প্রসারিত হতে থাকা নিরব দুনিয়ার কথা কল্পনা করি। ঝড়ো হাওয়ার মাঝে পুতিময় গন্ধ নাকে এসে লাগে। ব্যাক্টেরিয়া মাংস পচাচ্ছে, বাতাসে ছড়াচ্ছে অশুভ গন্ধ।
নিজের ভেতরে গোল পাকাতে থাকা আবেগুগুলোকে দমাতে না পেরে বিছানার কিনারায় এসে বসি, ছেনিটাকে দুহাতে সজোরে আঁকড়ে ধরে বাহু দুটোর মধ্যে নিজের মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠি।
***
অবশেষে যখন মাথার ভেতরটা পরিস্কার হল, আমি দেখলাম তখনও বিছানার কিনারায় বসে আছি, ছেনিটা পড়ে আছে কোলের উপর। ঝটকা দিয়ে ওটা মেঝেতে ফেলে দিলাম, যেন কোন পুঁয়োপোকা আমার জিন্সে উঠেছিল। ডেস্কের দিকে তাকিয়ে দেখি আঁচড়ের দাগের সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বিশের কম হবে না।
আমার মনে হল ওগুলো সম্ভবত আমি নিজেই করেছি, কিন্তু আমার সেরকম কোন কিছু করার কথা মনে নেই।
আমার মনে হচ্ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা আমি ভুলে যাচ্ছি, আর সেকারনে অস্বস্তি লাগছিল। কেউ কি আমার স্মৃতি ওলটপালট করেছে? পড়ে থাকা ছেনিটার দিকে তাকালাম, ওটার তীক্ষ্ণ ফলাটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা মনে আসি আসি করার চেষ্টা করছিল, এমন কিছু যা কিনা লোকজনকে তাদের শেষ সীমায় নিয়ে যেতে পারে।
৪
ডিনারের ঠিক পরের কথা। লিভিং রুমের কার্পেটে শুয়ে কাজুয়া টিভিতে বেজবল খেলা দেখছিল। এক হাত মাথার পেছনে দিয়ে উঁচু করা, আরেক হাত দিয়ে স্ন্যাক্স নিয়ে খাচ্ছিল। পা দুটো বিভিন্ন দিকে ছড়ানো। কয়েক মিনিট পর পর সে ওগুলোকে ভাঁজ করে আবার সোজা করে, এরকম বার বার চলছে। নিশ্বাসে সাথে বুক উঠা নামা করছে।
ওকে খুন করতে হবে। এই চিন্তাটাই আমার মাথায় এসেছিল। আমি আমার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসলাম আর অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম। বরাবরের মত ডেস্কের থেকে বাজে গন্ধ। ভেসে আসছিল। আমার হাত দুটো ভয়াবহ কাঁপছিল। উত্তেজনা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছিলাম কিন্তু কাজ হচ্ছিল না।
নিজেকে বার বার বলছিলাম যে ওকে খুন করতে আমার এক সেকেন্ডের জন্যও ইতস্তত করা উচিত নয়। এটা যদি আমাকে দিয়ে না হয় তাহলে আমার কোন মূল্য নেই। ওর ইস্পাতের মত দৃষ্টি একদম আমার মাংস ভেদ করে ভেতরটা দেখতে পায়, আর আমি যতই চেষ্টা করি না কেন ওর ঐ উপহাসের হাসি আমার মন থেকে সরাতে পারি না। আমি আমার চোখগুলো টেনে বন্ধ করে হাত দিয়ে কান চেপে রাখলাম। কিন্তু ঐ যে ও আছেই, আঙুল উঁচিয়ে আমার কুৎসিত হৃদয়টাকে ঘাঁটছে।
শান্তি অর্জনের জন্য আমার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল নিজেকে এমন এক দুনিয়াতে সরিয়ে নেয়া যেখানে আর কারো অস্তিত্ব নেই। অথবা ওকে আমার দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া।
কয়েক ঘণ্টা অতিবাহিত হল। রুম থেকে বেরিয়ে কাঁচকোঁচ শব্দ করা হলওয়ে দিয়ে নিচে নামার সময় আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। ভাইয়ের রুমের দিকে যাচ্ছিলাম। ওর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হলের লাইট আমার সামনে আমার ছায়া ফেলছিল। ছায়াটা যে এখনো মানুষের মত দেখতে তা খেয়াল করে একটু অবাকই লাগল।
দরজায় কান লাগিয়ে নিশ্চিত হলাম যে ও ঘুমাচ্ছে। ঠাণ্ডা ভোর নবটা চেপে ধরে কোন শব্দ না করে দরজাটা খুললাম। দম চেপে ফাঁক দিয়ে পিছলে রুমের ভেতর ঢুকে পড়লাম, পেছনে দরজাটা খোলা থাকল। ভেতরটা অন্ধকার ছিল কিন্তু তাতে সমস্যা নেই। হল থেকে আসা আলো আমার দেখতে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
ও একদম মরার মত ঘুমাতে পারে। কম্বলগুলোকে সব একসাথে বড় একটা বলের মত লাগছিল দেখতে। আরো কাছে গিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম যে ওর চোখগুলো বন্ধ আছে আর ও ঘুমিয়ে আছে। রুমের মধ্যে আলো ঢুকলেও আমার শরীরে বাধা পেয়ে ওর মুখের উপর ছায়া ফেলছিল। আমি আমার মুখ ওর কানের কাছে নিয়ে মৃত্যু সম্পর্কিত কিছু কথা ফিসফিস করে বলতে যাচ্ছিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে ও নড়ে উঠল আর বিছানাটা কড়কড় শব্দ করল। আস্তে করে জেগে উঠে ও হালকা গোঙানির মত শব্দ করল আর চোখ জোড়া খুলল। প্রথমে খোলা দরজার দিকে তাকাল তারপর ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার উপর চোখ পড়ল।
