যখন আমার বাবা-মা আমাকে কুকুরটার মৃত্যুসংবাদ জানাল, আমি ঐ বাসাটায় গিয়েছিলাম যেখানে কুকুরটা থাকত। কুকুরটার মালিক আমাকে চিনতেন, ওর মৃতদেহটা আমাকে দেখিয়েছিলেন। একসময় যেটাকে বিশাল আর ভয়ংকর মনে হত সেটা তখন নিশ্চল হয়ে পেভমেন্টের উপর পড়ে ছিল। আমি কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। আমাকে কাঁদতে দেখে কুকুরের মালিক একা সময় কাটানোর জন্য কিছুক্ষণের জন্য ছেড়ে গিয়েছিলেন।– “ আমি আমার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে, আমার গভীর থেকে উঠে আসা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, কুকুরটাকে নির্দেশ দিলাম বেঁচে উঠতে। কিন্তু কুকুরটার জীবন ফিরে এল না। রাতের বাতাসে শুধু ওর পিঠের পশমগুলো এদিক ওদিক উড়ছিল। আর কিছুই হল না। যদিও আমার কথাগুলো কোন একটা সংকেতের আশায় আমার মনের গহীনের বাসনাকে সন্তুষ্ট করেছিল কিন্তু কুকুরটার জীবনটা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
আর শুধু সেটাই নয়। কুকুরটার জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টাটা আমার হৃদয় বিদারক কষ্ট থেকে সৃষ্ট ছিল তা নয়। আমার মনে হয়, অবচেতনভাবে আমি চাইছিলাম নিজের পাপের বোঝাটাকে হালকা করতে, সামান্য একটু হলেও।
***
এক রাতে আমি আমার বেডরুমের মাঝামাঝি একটা ছেনি হাতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। আমার পুরো শরীর ঘেমে গোসল হয়ে গিয়েছিল আর আমি ক্রমাগত বকে যাচ্ছিলাম, “আমি দুঃখিত। আমি দুঃখিত।” আমি হয়ত ছেনিটা দিয়ে কবজি কেটে ফেলতাম, কিন্তু শেষ সময়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার কাঠের ডেস্কটার উপর তাকিয়ে দেখি ছেনির খোঁচায় একটা আঁচড় পড়েছে। ডেস্কের একটা অংশ আমার চোখের পানি দিয়ে ভিজে ছিল। মুখ আরো নামিয়ে আনতেই একটা বাজে গন্ধ নাকে এল, পঁচন ধরা মাংসের মত গন্ধ।
ডেস্কের ডয়ার খুলে দেখি ভেতরে টিসুতে পেঁচিয়ে রাখা আঙুলগুলো। ওগুলোর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। অনেকদিন ফেলে রাখায় ওগুলোর রঙ কালচে হতে শুরু করেছিল। আঙুলগুলোর গিঁটগুলোতে গাঢ় লোম দেখে মনে পড়ল যে ওগুলো আমার বাবার আঙুল। আমার কণ্ঠের ক্ষমতা আমাকেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল যে আমি কি করেছি।
পঁচতে থাকা আঙুলগুলো বাইরে নিয়ে উঠোনে একটা গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেললাম। কিন্তু তারপরেও ডেস্ক থেকে বাজে গন্ধটা গেল না। বরং যত দিন যেতে লাগল গন্ধটা মনে হল বাড়তেই থাকল। মনে হচ্ছিল ভয়ারের ভেতরে কোথাও যেন অন্য জগতের সাথে কোন সংযোগ আছে, আর ঐ মাংস পঁচা গন্ধটা সেই অন্ধকার থেকে ক্রমাগত উদিারিত হচ্ছিল।
আমি খেয়াল না করলেও সময়ের সাথে ডেস্কের উপর আঁচড়ের চিহ্নও। বাড়তে থাকল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দশটারও বেশি ছেনি দিয়ে আঁচড় কাটার দাগ দেখা গেল। এসবের কোন স্মৃতি আমার জানা ছিল না।
***
সকাল। চোখ খুলে দৈনন্দিন যন্ত্রণায় ফিরে এলাম।
যে মানুষটা পরিবার আর ক্যাক্টাসের জন্য নাশতা বানাচ্ছে, যে মানুষটা আঙুলহীন হাত দিয়ে খবরের কাগজ চেপে ধরে আছে যাতে বাতাসে পাতাগুলো উড়ে না যায়, তাদেরকে আমার মানুষ মনে হত না। মনে হত কোন পুতুল যেগুলো নড়াচড়া করতে পারে। যে মানুষটা ট্রেনে করে স্কুলে যাওয়ার সময় আমার টিকেট চেক করে, যে মানুষটা আমার পাশের সিটে বসে থাকে, যে মানুষগুলো স্কুলের হলওয়েতে আমাকে পাশ কাটিয়ে যায়, তাদের কাউকেই আমার জীবিত প্রাণী মনে হয় না। তারা স্রেফ কোন বস্তু, চিন্তাশক্তিহীন, অনেকটা ধাক্কাধাক্কি করা বিলিয়ার্ড বলের মত। শুধু এদের তৃকগুলো যত্ন করে বানানো, আর ভেতরের বাকি সব কিছু বানানো যন্ত্রপাতির জঙ্গল।
কিন্তু তারপরেও, আমার একটাই কাজ ছিল আর তা হল ক্রমাগত হেসে যাওয়া আর আমার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া যাতে তারা আমাকে ছেড়ে না যায়। যে মানুষটা আমার নাশতা বানিয়েছে, তাকে তা করার জন্য কতটা ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সেটা যে আমি বুঝেছি তা পুরোটা খেয়ে। খাওয়ার সময় তার সাথে ব্যাখ্যা করতে হবে, বলতে হবে কতটা মজার ছিল খাবারটা, আর এমনভাবে বলতে হবে যেন কণ্ঠে সন্তুষ্টির ছোঁয়া থাকে। যখন ট্রেনে চড়ি, পুরো যাত্রাপথের টিকেট যেন অবশ্যই কাটা হয় তা ভুললে চলবে না আর কন্ডাক্টর যখন আমার কমিউটার পাশ দেখতে চাইবেন তখন একজন আদর্শ যাত্রির মত তা বের করে দেখাতে হবে। ক্লাসেও আমাকে পরিবর্তিত হতেই হবে, আমি যে ক্লাসেরই একজন সে বিষয়ে কোন অজুহাত চলবে না। তাই কেউ দয়া করে সবার শেষে আমাকে বাছাই কোর না, বরং আমি চাই ফুলদানিতে যত্ন করে রাখা ফুলের মত হতে। আর আমি ফুল দিয়ে এত চতুরভাবে সাজাব যে, সবাই ধরে নেবে এসব আমার ব্যক্তিত্বরই স্বাভাবিক অংশ। কেউ চিন্তাও করবে না, এসব কোন পরিকল্পনার অংশ।
আমার হৃদয় এতটাই শূন্য হয়ে গিয়েছিল যে মুখে সবসময় একটা উজ্জ্বল হাসি ধরে রাখা আমার জন্য বেশ সহজই ছিল। আর এই পুরোটা সময় আমার ভাইয়ের প্রতি আমার ভীতি শুধু বাড়ছিলই। এমন কি আমি যদি নাও কল্পনা করি যে সারা পৃথিবীর সব মানুষ এসে ঐ ছোট খুলিটার ভেতর বসে আছে আর দুনিয়ার সব চিন্তা করছে, তারপরও কাজুয়াকে ভয় লাগত আমার, শুধু ওকে। অন্য মানুষদের নিশ্বাসের শব্দ আর আমার কানে এসে পৌঁছাত না কিন্তু ওর ছায়া গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছিল।
