একবার স্কুলের ভেন্ডিং মেশিনগুলোর কাছে শিক্ষার্থীদের একটা দল জড়ো হয়ে হাউকাউ করছিল। ওদের কারোরই কোন ড্রিঙ্ক কেনার ইচ্ছা ছিল না। আমি মেশিন থেকে কিছু একটা কিনতে চাইছিলাম, কিন্তু ভিড় ঠেলে যেতে ইচ্ছা করছিল না। তাই কাছেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন একটু খালি হবে। আমার মনে হয় আমি তাদেরকে একটু সরে জায়গা দিতে বললেই পারতাম, কিন্তু আমার মাথার ভেতর কিছু একটা ভয় পাচ্ছিল যা তারা না বলবে আর অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাবে। তাই আমি শুধু ভেন্ডিং মেশিনের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিছু পোস্টার দেখার ভান করছিলাম যেগুলোতে আসলে আমার কোন আগ্রহ ছিল না।
এমন সময় কাজুয়া হাজির হল। বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে ও ভিড় ঠেলে পথ করে মেশিনের কাছে গিয়ে কয়েন ঢালল। সোডার ক্যান হাতে নেয়ার পর ও খেয়াল করল যে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ওর হাসি দেখে মনে হল ও চোখের পলকে পুরো পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছে, কেন আমি পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
কাজুয়া জানত। ও জানত যে ওর বড় ভাই, যাকে সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ আর জনপ্রিয় বলে জানে, পড়াশুনায় মনোযোগী বলে জানে, সেটা আসলে সাজানো বিভ্রম মাত্র। কাজুয়া আমার সম্পর্কে সবকিছু জানত, আমার ক্ষুদ্র হৃদয় আর এর মিথ্যে হাসি, যার একটাই উদ্দেশ্য ছিল-আর তা হল সবাই যাতে আমাকে পছন্দ করে। আর ও আমার সব বিকারগ্রস্থ কাপুরুষতার কথা জানত, যে আমার এইটুকু সাহসও নেই যে কিছু ছেলেমেয়েকে “এক্সকিউজ মি বলে ভেন্ডিং মেশিন পর্যন্ত যাব।
এক সময় এমন হল যে বাসায় হোক বা স্কুলে, আমার ছোট ভাইয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি ঘামতে থাকতাম। আমি কাজুয়াকে নিয়ে প্রচন্ড আতংকে ভুগতাম কারন ও আমার আসল রূপ জেনে বসে আছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ওর চোখে আমি ওর বড় ভাই ছিলাম না, বরং মাটির তৈরি কোন নোংরা মূর্তির মত কিছু একটা,ছিলাম যার উপর খালি থুথু ছিটানো যায় আর ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকানো যায়।
কাজুয়ার সাথে কথা বলার কিছু সুযোগ এসেছিল, কিন্তু যখনই আমরা একসাথে টেবিলে বসে নাশতা করতে বসতাম তখনই আমার পাকস্থলীর ভেতর মোচড় দিয়ে উঠত। আমার মনে হত ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পুড়ে যাচ্ছি, আমার হাতগুলো ঘামতে থাকত, চপস্টিক হাত থেকে পিছলে যেতে চাইত। এরপরেও কমেডি সিনেমার কোন অভিনেতার মত আমি হেসে আমার বাবা-মাকে সম্ভাষণ জানাতাম, প্রবল উদ্যমে নিজের নাশতা শেষ করতাম। অনেক দিন ধরে এরকম.চলছে তবুও এখনো আমি প্রায় যা খাই সবই বমি করে উগড়ে দেই।
আমার রাতগুলো নিঘুম কাটে, খিচুনি হয়। শান্তি হয় এরকম কোন স্বপ্ন আমি দেখি না। চোখের পাতা বন্ধ করলে অনেক মানুষের চেহারা দেখতে পাই। আমার ভাইয়ের মত তারা সবাই আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমি কান্নাকাটি করি, বুদ্ধিস্ট মন্ত্র জপ করি, আমার পাপ মোচনের জন্য। মাঝে মাঝে যখন আমি চোখ খুলে দিবাস্বপ্ন দেখি তখন হাজার হাজার চোখ আমার রুমের মধ্যে ভেসে ভেসে আমাকে অভিযুক্ত করে। তখন আমার ইচ্ছা হয় মরে যেতে।
কিংবা আরো ভালো হত যদি সারা পৃথিবীতে একা আমি বেঁচে থাকি, তাহলে এই যন্ত্রণা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে না। প্রত্যেকটা মানুষ আমার কাছে ভীতিকর। যে কারনে আমাকে এইসব নোংরা কাজ করতে হয়েছে, মানুষ যাতে আমাকে পছন্দ করে। আমার প্রতি লোকজনের ঘৃণা, আমার দিকে নিচু দৃষ্টিতে তাকানো এসবই অনেক কষ্টদায়ক ছিল, আর এর থেকে পালানোর জন্য আমি আমার এই কুৎসিত ক্ষুদ্র পশুটাকে হৃদয়ের মাঝে বন্দি করে রেখেছিলাম। পৃথিবীতে যদি কোন মানুষ না থাকত, শুধু যদি আমিই থাকতাম, তাহলে জীবন আমার জন্য অনেক সহজ হত।
আমার উচিত কাউকে আমাকে দেখতে না দেয়া। কেউ যেন আমার দিকে কষ্টদায়ক হাসি না হাসে বা অসম্ভষ্টি নিয়ে তাকায়। তাই আমি চিন্তা করছিলাম কি করে আমি পৃথিবীর সবার মন থেকে আমার চেহারা মুছে ফেলতে পারি।
এই আইডিয়াটা কেমন?
“এখন থেকে এক মিনিট পর, তোমার চোখে আমার কোন প্রতিফলন হবে না!’ আমি এই কথাটা প্রথমে কাউকে একজনকে বলব। তারপর এই কথাটা বলব : “তোমার চোখগুলো, যেগুলো আমাকে আর দেখতে পায় না, অন্য কারো সাথে যখন চোখাচোখি করবে তখন এই কথাগুলো তাকে হস্তান্তর করবে।”
সহজ ভাষায় বললে, যে লোক আমার কণ্ঠ শুনে প্রথম আমাকে দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলবে, সে যখন অন্য কারো সাথে দৃষ্টি বিনিময় করবে তখন সেই দ্বিতীয় ব্যক্তিটিও আর আমাকে দেখতে পাবে না। ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তিটি যখন অন্য আরেকজনের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করবে তখন তৃতীয় ব্যক্তিটিও আমাকে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এরকম চলতে চলতে একসময় পুরো দুনিয়ার সামনে আমি অদৃশ্য হয়ে যাব। কেউ আমাকে দেখতে পাবে না। আর তখন আমি চিরকালের জন্য শান্তি অর্জন করতে সক্ষম হব।
এই পরিকল্পনাটা শুরু করার আগে আমাকে অবশ্য নিজেকে এর থেকে বাইরে রাখার জন্য কোন একটা উপায় বের করতে হবে। নাহলে আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে পাবো না।
যখন আমি অনুভব করলাম কিসব জিনিস আমাকে সুখি করে তুলছে, তখন নিজের উপর ঘৃণা হতে লাগল।
৩
তারপর এক রাতে কুকুরটা মারা গেল। মানে বলতে চাইছি, ঐ কুকুরটা, যেটার উপর ইলিমেন্টারি স্কুলে থাকতে বন্ধুদের সামনে জাহির করার জন্য আমার কণ্ঠের জাদু দেখিয়েছিলাম। কুকুরটার কথা আমি কখনো ভুলতে পারিনি, আমাকে দেখলেই ওটার চোখে যাবতীয় ভীতি এসে ভর করত।
