বাবা মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় আমি তার কানে ফিসফিস করে বললাম, “বাম হাতের ক্ষতগুলো ঠিক হয়ে যাবে,” আর “তুমি যখন জেগে উঠবে তখন আমার রুমে যা যা ঘটেছে সব কিছু ভুলে যাবে।” প্রায় সাথে সাথেই তার বাম হাতের ক্ষতের উপর যেখানে আঙুল ছিল, সেখানে পাতলা নতুন চামড়া গজাল। সাথে সাথে রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেল।
আমাকে আমার বাবাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার বাম হাতে আঙুল থাকার বিষয়টা পুরোপরি স্বাভাবিক। আমাকে এর চেয়ে বেশিই করতে হবে যাতে অন্য কেউ তার বাম হাত দেখে অস্বাভাবিক কিছু মনে না করে।
এটা কিভাবে করব তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। সামনে থাকা কাউকে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে পরিবর্তন আনতে পারি আমি, কিন্তু দুনিয়ার বাকি সবাইকে কি করে বোঝাব?
মাথায় একটা বুদ্ধি এল, আমি এই কথাগুলো বললাম:
“পরবর্তীবার যখন তুমি চোখ খুলবে, তুমি তোমার হাতের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করবে যে হাতটা আগে থেকে এরকমই ছিল। আর সবাইকে বোঝাৰে যে হাতের এই বিকলাঙ্গতা একদম স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।”
. এভাবে আমি বাবার হাতের প্রতি অন্য লোকজনের প্রতিক্রিয়া। সামলাতে পারব। আমি হাতটাকে নির্দেশ দিলাম, “স্বাভাবিক হাতের মত আচরণ কর।”
তারপর রুমের রক্ত পরিস্কার করলাম। খসে পড়া আঙুলগুলো টিস্যু পেপারে মুড়ে ডেস্কের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। আবার জামাকাপড়েও রক্ত লেগে ছিল। আমার পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ দিলাম যেন রক্ত খেয়াল না করে।
বাবাকে রুম থেকে বের হতে সাহায্য করলাম। হলওয়ে থেকে কাজুয়ার সাথে দেখা হল। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল ওর চোখে বিস্ময় দেখতে পেলাম। বাবাকে এভাবে সাহায্য করা আমার জন্য বিরল ঘটনা বটে। খোলা দরজা দিয়ে কাজুয়া আমার রুমের মধ্যে উঁকি দিল। গেমটা মেঝের উপর পড়ে ছিল। ও হাসি চেপে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।
ডিনারের সময় খেতে গিয়ে বাবার কিছু সমস্যা হচ্ছিল। আঙুলহীন বাম হাত দিয়ে তিনি ভাতের বাটি ঠিক মত ধরতে পারছিলেন না। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে তাকে কাজটা করার সময় একদম স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। আঙুল ছাড়া তার হাতটা একদম মসৃণ আর গোল দেখাচ্ছিল। বাজি ধরে বলতে পারি আমার পরিবারের আর কেউ বাবার এই বিকলাঙ্গতা সম্পর্কে জানতও না।
আমি খেয়াল করলাম আমার ভাই কাজুয়া ঘৃণার দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ্য করছিল। ও হচ্ছে ঐ ধরণের যারা মনে করে পৃথিবীটা বখে যাওয়া ছেলেপেলে দিয়ে ভর্তি। ও আর আমি একই হাই স্কুলে পড়তাম, আমি শুধু এক ক্লাস, উপরে ছিলাম। ওর জীবন যেরকম ছিল সেরকম জীবন আমার পক্ষে সম্ভবই ছিল না।’
স্কুলে আমার ভাই তার বন্ধুদের সাথে হাসি ঠাট্টা করতে করতে করিডোর দিয়ে হাঁটত। আসল বন্ধুরা এভাবে চলাফেরা করে। আর এসব দেখে আমার নিজেকে আরো একাকী মনে হত। আমার টিচাররা মনে করতেন যে আমি খুবই হাসিখুশি একজন মানুষ যে কিনা ক্লাসে যে কোন রকম মজা করতে পারে। কিন্তু সত্যি কথা হল, এমন কেউ ছিল না যাকে আমি সত্যিকারের বন্ধু বলতে পারতাম। অনেকেই আমাকে পছন্দ করত, হয়ত। কেউ কেউ হয়ত আমাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও মনে করত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় না, এরকম কেউ ছিল, যার কাছে আমি যা তা চাইতে পারতাম। আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে যারা দাবি করত, তারা আমাকে অনেক কাছ থেকে চেনে, তারাও আমার দিকে এমনভাবে তাকাত যেন কোন অদ্ভুত কিছু দেখছে।
আমার ভাই আসলেই একটা ভাল ছেলে ছিল। আমার মত না। মিথ্যা হাসি দিয়ে নিজেকে লুকানোর প্রয়োজন ছিল না ওর। নিজে যা তাতেই ও সন্তুষ্ট ছিল। বন্ধুদের সাথে সহজভাবে চলতে পারত। সহজভাবে বললে ও অনেক বেশি সুস্থ আর পূর্ণ মানুষ ছিল যা আমি কোনদিনই হতে পারতাম না।
অদ্ভুত ব্যাপার হল, সবাই কেন জানি আমাকে প্রতিভাবান একজন শিশু বলেই মনে করত। খুব সম্ভবত তাদের এই ধারণা হয়েছিল আমার এই ফালতু খোশামদি মুখোশটা সবসময় পরে থাকার জন্য। এর কারনে যদি আমার ভাই নিজেকে আমার থেকে নিম্নতর মনে করে তার মানে হল আমি ওকে বাজেভাবে নিয়েছিলাম। আমি ওর কাছে এজন্য ক্ষমা চাইতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওর আমার মধ্যকার সম্পর্কটা এমন ছিল না যে ভোলাখুলি মনের কথা বলা যাবে। স্কুলে যদি কোন কারনে আমাদের চোখাচোখি হত তাহলে আমরা দ্রুত নিজেদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে এমন ভান করতাম যেন কেউ কাউকে দেখিনি। ব্যাপারটা দুঃখজনক ছিল।
দোষটা আমার ছিল। আমার ধারণা ছিল, ও কোন না কোনভাবে আমার ভেতরের কুৎসিত চেহারাটা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। ও আমার সবকিছু জানত, আমি কতটা কুৎসিত, আমি আমার বাবা-মা আর টিচারদের কথামত চলতে কতটা আগ্রহী ছিলাম, আমার চারপাশের মানুষের কাছ থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করতে যাতে তারা আমাকে তাদের একজন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এ নিয়ে কোন কথা বলাটা বেশ জঘন্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। ও শুধু যা করতে পারত তা হল কোন কথা না বলে শুধু চোখে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতে।
নিজেকে কারো অনগ্রহভাজন করতে পারলে আমার মনে হত নিজের চারপাশে একটা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ জায়গা সৃষ্টি করতে পেরেছি। আর ঠিক ঐ মুহূর্তেই আমাকে ওর ঐ দৃষ্টির সামনে পড়তে হত। আমাকে ওর কাছে উপহাসাম্পদ মনে হত। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে আমার দুনিয়ায় একটা ফাটল দেখা দিয়েছে আর একটা ব্যান্ডএইড লাগিয়ে সেটা মেরামত করার চেষ্টা করছি।
