আমার বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। তিনি ছিলেন ঐ ধরনের মানুষ যার চেহারা দেখলে খাড়া গিরিখাতের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যেখানে কিনা কোন গাছপালা শেকড় বসাতে পারে না। তিনি তার দুই পুত্রের দিকে উপর থেকে এমনভাবে নিচের দিকে তাকাতেন যে আমার মনে হত স্বর্গীয় কিছুর দিকে তাকাচ্ছি। সবকিছুর ব্যাপারে তার ছিল কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি আর যা তার পছন্দ হত না তার পেছনে এক বিন্দু সময় খরচ করার ধৈর্য তার ছিল না। একবার তিনি যদি কোন কিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে জিনিসটা মূল্যহীন, তাহলে তিনি সেটার প্রতি পুরোপুরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। তার কাছে তখন সেটার মূল্য কোন কীটপতঙ্গের থেকে ভিন্ন কিছু মনে হত না।
বাবাকে না জানিয়ে আমি একটা ইলেক্ট্রনিক গেম কিনেছিলাম। ছোট সস্তা একটা জিনিস। এরকম খেলনা যে কোন ইলিমেন্টারির স্কুলে পড়া বাচ্চার কাছেই থাকে। জিনিসটা আমার হাতের তালুর সমান বড় ছিল খুব বেশি হলে। আমার বাবার কম্পিউটার গেমস সম্পর্কে উঁচু ধারণা ছিল না। এবং তিনি যখন জিনিসটার খোঁজ পাবেন, তখন অবশ্যই আমার উপর খুব অসন্তুষ্ট হবেন। আমি শুধু দৃশ্যটা কল্পনা করেই অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
আমার ছোট ভাই বাবার কথামত চলত। তার গেম খেলার প্রয়োজন হলে গেম সেন্টারে যেত। ওর যদি পড়াশুনা করার ইচ্ছা হত তাহলে এক বসাতে পেন্সিল ফুরিয়ে ফেলার মত পড়াশুনা করতে পারত। বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টি ঘটালে ও এভাবে তার মূল্য চুকাতে পারত। অবশ্য ওকে কখনো কোন অসন্তুষ্টির সামনে পড়তে হয়নি যদিও। কিন্তু আমি অমন ছিলাম না। আমি আমার বাবার থেকে মনোযোগ আর একটুখানি ভালবাসা পাওয়ার জন্য জানপ্রান দিয়ে পড়াশুনা করতাম। কার কাছে আপনি জানতে চাইছেন তার উপর নির্ভর করে, লোকজন আমাকে সাধারণত আমাকে দেখে হাসি খশি প্রাণবন্ত একটা বালক মনে করত। অবশ্যই সেটা বাইরের রূপ ছিল।
একদিন আমি আমার রুমে বসে গোপনে আমার গেম খেলছিলাম। কোন আওয়াজ না দিয়ে হঠাৎ করে বাবা দরজা খুলে রুমে ঢুকলেন। একদম কোন পুলিশ অফিসার যেভাবে দরজায় লাথি দিয়ে ক্রাইম সিনে প্রবেশ করে সেরকম। তিনি আমার হাত থেকে গেমটা কেড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন।
“আচ্ছা তাহলে তুমি এই কাজ করছিলে!” তিনি রাগী কণ্ঠে আমাকে বললেন।
কাজুয়া যদি গেমটা খেলত তাহলে বাবা কিছু বলতেন না। দ্বিতীয় সন্তান তার আদর্শে বড় হবে এরকম ধ্যান ধারণা আমার বাবার ছিল না। যে কারনে তার বড় সন্তানের প্রতি, আমার প্রতি তার প্রত্যাশা ছিল বেশি, সেই সাথে রাগটাও ছিল বেশি।
সাধারণত আমি হয়ত কেঁদে ফেলতাম আর তার কাছে মাফ চাইতাম। কিন্তু ঐ মুহূর্তে আমি হয়ত তার প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করেছিলাম, কিংবা হয়ত মনে হয়েছে আমি আক্রমণের মধ্যে পড়েছি। যেটাই হোক, আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম যে আমার সাথে অন্যায় করা হচ্ছে। আমার ভাই যা খুশি করতে পারে অথচ আমার ক্ষেত্রেই যত সব নিষেধাজ্ঞা। আমার মনে হচ্ছিল এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র আমি একটা গেম খেলতে চাইছিলাম সেজন্য। কোন কিছু চিন্তা না করেই আমি বাবার বাম হাত আঁকড়ে ধরলাম। মরিয়াভাবে আমি আমার গেমটা ফেরত পেতে চাইছিলাম। এমনিতে আমি হয়ত আমার আনুগত্যর মুখোশ পরে চুপ করে বসে থাকতাম, জীবনে এই প্রথম বার আমি বাবার বিরুদ্ধে লড়াই করলাম। তিনি বাম হাতে শক্ত করে গেমটা ধরে থাকলেন, ছাড়লেন না। আমি আমার কণ্ঠের শক্তি ব্যবহার করে বললাম : “ঐ আ-ঙু-ল-গুলো! খসে পড়বে!”
কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাদের মধ্যের দূরত্বটা আমার কণ্ঠের কম্পনে ভরে গিয়েছিল। আমার মাথার ভেতরে রক্তনালিগুলোর টানটান অবস্থা অনুভব করতে পারছিলাম। গেমটা ঠাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর এক এক করে আমার বাবার হাতের আঙুলগুলো মেঝেতে খসে পড়ে গড়িয়ে আমার পায়ের কাছে এসে থামল। পুরো পাঁচটাই, একদম নিখুঁতভাবে তার হাতের জয়েন্ট থেকে খুলে গিয়েছিল। আঙুলহীন হাতটা থেকে রক্ত ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরো মেঝে উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করেছিল। আমার নাক থেকেও রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।
বাবা চিৎকার করতে শুরু করলেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি তাকে নির্দেশ দিলাম যে যথেষ্ট হয়েছে, মুখ বন্ধ কর। এবং তিনি থামলেন। কণ্ঠ থেমে যাওয়ায় তার চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল, ব্যথায় এবং আতংকে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তিনি তার আঙুলহীন বাম হাতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
আমার বমি বমি লাগছিল। একগাদা রক্ত বের হল আমার নাক থেকে। মাথা ঘোরাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে যাব। বুঝতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত। আঙুলগুলোকে জায়গামত ফিরিয়ে আনার আর কোন উপায় ছিল না। একবার কথা বলে ফেললে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।
বাবাকে অজ্ঞান করে ফেলা ছাড়া আমার সামনে আর কোন উপায় ছিল না, যতক্ষণ না কিছু একটা ভেবে বের করতে পারছি। “ঘুমাও!” তাকে নির্দেশ দিলাম। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম যে আমার কণ্ঠের ক্ষমতা লোজন সংজ্ঞাহীন থাকলেও তার উপর কাজ করে। জেগে থাকা অবস্থায় আমার ক্ষমতা ব্যবহার করার ব্যাপারটা আমাকে আরো নার্ভাস করে তুলত, তাই তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়াটাই আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল।
