নড়ার জন্য, তাহলে ফড়িংটা একদম শক্ত হয়ে জমে যাবে-এমনকি আমি যদি ওর পা কিংবা ডানা টেনে ছিঁড়ে ফেলি তবুও।
ঐ সময়ে, প্রথম গ্রেডে থাকতে, আমার মনে আছে যে, আমি প্রায়ই আমার কণ্ঠের ক্ষমতা ব্যবহার করতাম। তখন থেকে আমি আমার এই ক্ষমতা অনেক মানুষের উপর বহুবার ব্যবহার করেছি, এমন অনেকের উপর যাদেরকে আমি কিনা চিনতামও না।
ইলিমেন্টারি স্কুলের শেষ বর্ষে একটা বিশাল আকারের কুকুর আমাদের এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। কুকুরটা তার বাড়ির গেটের পেছনে লুকিয়ে থাকত আর সামনে দিয়ে কোন পথচারী গেলেই ঘেউ ঘেউ করে উঠত। সে লাফ দিয়ে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করত যতক্ষণ না গলার সাথে লাগানো ভারি চেইনটা তাকে টেনে ধরত। চেইনের টানে কলারটা গভীরভাবে গলার উপর বসে পড়ত। জন্তুটা নিজের শ্বদন্তগুলো বেচারা পথচারীদের উপর বসানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছিল। কুকুরটার সম্ভবত কোন ধরনের চর্মরোগ ছিল, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লোম উঠে চামড়া বের হয়ে থাকত। আর এর চোখগুলো ক্রোধে আগুনের মত জ্বলতে থাকত। কুকুরটা এলাকার মধ্যে বেশ পরিচিত ছিল, আর আমরা একজন আরেকজনের সাহস পরীক্ষা করতাম ওর কত কাছে যেতে পারে সেটার বাজি দিয়ে।
একদিন আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমাকে দেখে সে এমনভাবে গর্জন ছাড়ল মনে হল যেন ভুমিকম্প হচ্ছে। ঐদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করার।
“তুই আমার উপর চিল্লা-বি না…”
বিস্ময়ে কুকুরটার কানগুলো কেঁপে উঠল, চোখগুলো বড় বড় করে সে চুপ করে গেল।
“তুই আমার হুকুম মান্য করবি। তুই আ-মা-র কথামত চলবি…আ-নু-গ-ত্য…”
আমার মনে হচ্ছিল মাথার ভেতর যেন আতশবাজি ফুটছিল। একই সাথে নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ফুটপাথের উপর পড়তে লাগল। স্বীকার করছি আমি আমার বন্ধুদের কাছে নিজেকে জাহির করতে চাইছিলাম। আমি দেখাতে চাইছিলাম যে আমি এই ভীতিকর কুকুরটাকে একটা নিরীহ খেলার সামগ্রীতে পরিণত করতে পারি।
ছেলেমানুষি ব্যাপার হলেও পরিকল্পনাটা ঠিকমতই কাজ করেছিল। আমি যা চাইছিলাম, কুকুরটা তাই করছিল। থাবা তুলে আমার হাতের উপর দেয়া, ডিগবাজি দেয়া, ইত্যাদি। আর ক্লাসমেটদের মধ্যে আমি দলের নেতা বনে গেলাম।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমাকে আনন্দিত করেছিল। আস্তে আস্তে আমার অনুশোচনা হতে লাগল। এসব কি করছি আমি? একজন সুপারহিরো সাজার চেষ্টা করছি? বাস্তবে তো আমি একটা গোল্ডফিস শান্ত করার সাহসও রাখিনা। অন্য লোককে ঘোল খাওয়ানোর জন্য আমার অপরাধবোধ হচ্ছিল।
সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার ছিল কুকুরটার চোখগুলো। আমার ক্ষমতা ব্যবহারের আগে কুকুরটার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলত। এখন ওকে নিরীহ দেখায়। কুকুরটার লড়াকু আত্মাটা আমি ছিঁড়ে ফেলেছি। ওর চোখের দিকে তাকালে, যেগুলো, একসময় ছিল হিংস্র আর এখন কাঁদোকাঁদো কোন ছোট কুকুর শাবকের মত, দেখার পর আমার নিজেকে নিজেই গালি দিতে ইচ্ছা হয়।
এমনিতে আমার কণ্ঠের ক্ষমতা মনে হয় অসীম, কিন্তু কিছু ব্যাপার আমি খেয়াল করলাম। প্রথমত, শুধুমাত্র জীবিত বস্তুর উপর আমার কণ্ঠ কাজ করে। গাছ আর পোকাও ঠিক আছে। কিন্তু পাথর কিংবা প্লাস্টিকের কোন কিছু আমি চিৎকার করে বাঁকাতে চাইলেও কাজ হয় না।
দ্বিতীয়ত, একবার আমি আমার কণ্ঠ ব্যবহার করে কোন নির্দেশ দিলে তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না। একদিন আমার মায়ের সাথে আমার খানিকটা মতের অমিল হয়েছিল। কোন কিছু না ভাবেই আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি আর বিড়াল আর ক্যা-ক্টা-সের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারবে না!”
আবাগের বসে কথাটা বলা, এর ফলাফল কি হতে পারে তা আমি তখন বুঝতে পারিনি। মা আমার অনুমতি না নিয়ে আমার রুমে ঢুকেছিলেন, আর সবকিছু গোছগাছ করার সময় ধাক্কা মেরে আমার প্রিয় ক্যাক্টাসটা ফেলে দিয়েছিলেন। কথাটা বলে আমি তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে তার কাছে তার বিড়াল যতটা পছন্দের, আমার কাছে আমার ক্যাক্টাসটাও ততখানি মূল্যবান।
পরে যখন মাকে তার বিড়ালটাকে ক্যাক্টাসের মত মাটিতে পুঁততে দেখলাম তখন অনুশোচনা হতে শুরু করল। একি করেছি আমি! আমার ব্যাপারটা আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমার পছন্দ মত কিছু না হলে আমার কষ্ঠ ব্যবহার করে মানুষের মাথা আউলিয়ে দেয়া অবশ্যই অপরাধের মধ্যে পড়ে।
তাই আমি মায়ের উপর আবার আমার ক্ষমতা ব্যবহার করার চেষ্টা করলাম যাতে তিনি বিড়াল আর ক্যাক্টাসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন। কিন্তু তিনি আর কখনোই তা পারলেন না।
২
আমার কণ্ঠ শুধু যে মানুষের মনে পরিবর্তন আনতে পারত তাই নয়, তাদের শরীরের উপরও প্রভাব ফেলতে পারত। আমি পশুপাখির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতাম, যেভাবে অনেক বছর আগে মর্নিং গ্লোরির উপর ফেলেছিলাম।
হাই স্কুলে ওঠার পরেও আমি আমার বড়দের মাথা খাওয়ার স্বভাব গেল না। আমি আমার এই বদঅভ্যাসটা কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। আর আমার কাছে এটা ছিল আমার কাপরুষতার প্রমাণ। আমি সবসময় মানুষের সাথের মিথস্ক্রিয়াকে ভয় পেতাম, যেন ডিমের খোসার উপর হাঁটছিলাম, ভয় পেতাম যে আমার কোন কাজ তাদের চোখে আমার মূল্য ধূলিসাৎ করে দিবে। কখনো কারো সাথে কথা হলে মনে হত লোকটা মনে হয় আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আমার মনে হত তারা বোধহয় অন্য কোথাও গিয়ে অন্যদের সাথে আমার খুঁত নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমি দুনিয়ার ব্যাপারে এতটা ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম যে এর সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এ কারনে মনের সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে ঢাকার জন্য আমি মুখের উপর নকল হাসির মুখোশ পরে থাকতাম। এর পেছনে যে শ্রম খরচ হত সেটাও আমাকে বিপর্যস্ত করে তুলত।
