আমার কণ্ঠের শক্তি ব্যবহার করার প্রথম স্মৃতি যেটা আমার মনে আছে, তখন আমি প্রথম গ্রেডে পড়ি। ক্লাসের শিক্ষা কার্যক্রম অনুযায়ী আমাদেরকে মর্নিং গ্লোরি চাষ করতে হচ্ছিল। আমাদের রোপণ করা চারাগুলো স্কুলের বাইরের দেয়ালের সাথে সারি করে রাখা থাকত। আমার মর্নিং গ্লোরিটা ছিল বেশ বড়-সেটার সবুজ লতা পাতাগুলো আলতো করে ঠেক দেয়া কাঠিটাকে জড়িয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছিল। এর চওড়া পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সকালের সূর্যের আলোকে আকর্ষণ করত। আর এর নরম, পাতলা, অর্ধস্বচ্ছ পাপড়িগুলোর রঙ ছিল লালচে বেগুনী বর্ণের।
কিন্তু আমার মর্নিং গ্লোরিটা ক্লাসের মধ্যে সেরা ছিল না। আরেকটা ছিল আমারটার চেয়েও বড় আর আরো বেশি সুন্দর। আমার তিন সিট সামনে একটা ছেলে বসততা যে ছিল একজন দ্রুত দৌড়বাজ। নাম ছিল ইয়ুচি। ও ছিল অনেক প্রাণবন্ত, সারাক্ষণ বকবক করেই যেত, থামত না। আমি মাঝে মাঝে ওর সাথে কথা বলতাম, তবে আমার আগ্রহ ওর কথার চেয়ে ওর অভিব্যক্তির কিভাবে পরিবর্তন হয় তার উপর বেশি ছিল। ও ক্লাসে বেশ জনপ্রিয় ছিল, আর আমার মনে হত সেটার কারন সুকানো ছিল ওর অভিব্যক্তির মধ্যে। যখনই আমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম, ভাল করে ওর চেহারা খেয়াল করতাম। আমিও ওর মত একই রকম প্রতি মুহূর্তে অভিব্যক্তি বদলাতে চাইতাম, যেটা মনে হত ওর ভেতর থেকে বুদবুদের মত ফুটত।’
যাইহোক, আমার মনে হয়েছিল ওর এই অভিব্যক্তির পরিবর্তন ইচ্ছাকৃত ছিল না। কিংবা আমার মত চমৎকার ছেলে হওয়ার মত কোন ইচ্ছা থেকেও ওগুলোর উৎপত্তি ছিল না। তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু মনের ভেতর আমি নিজেকে ইয়ুচির চেয়ে ছোট বোধ করতাম।
আমার ক্লাসমেটরা সবাই ইয়ুচি আর আমার কথায় মজা পেত। সে হয়ত বন্ধুত্বপূর্ণ কোন একটা বিষয় নিয়ে কথা শুরু করল আর আমি এর সাথে সরস কিছু একটা যোগ করলাম। ও আমাদের এই ছোট খেলাটা উপভোগ করত, আর প্রতিবার এক গাল হেসে “হেই হেই!” বলে উঠত। কিন্তু আমার কখনো মনে হয়নি ও আমার একজন সত্যিকারের বন্ধু। আমি শুধু নকল একটা হাসি মুখে ধরে রেখে ওর সম্ভাষণের সাথে তাল মিলিয়ে মজার কিছু একটা উত্তর দিতাম।
তো ইয়ুচির মর্নিং গ্লোরিটা ছিল ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দর। টিচার যখনই ওর ফুলের প্রশংসা করতেন, আমার খুবই খারাপ লাগত। আমার মনে হত যেন আমার ভেতর থেকে একটা নোংরা প্রাণী চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে এসে চিৎকার করতে চাইছে। বলাবাহুল্য ঐ নোংরা প্রাণীটা ছিল আমার আসল রূপ।
একদিন সকালে আমি অন্যদিনের চেয়ে একটু আগে স্কুলে পৌঁছেছিলাম। ক্লাস রুমে তখন কেউই ছিল না। চারদিক নিস্তব্ধ। নিজের মুখোশটা কিছুক্ষণের জন্য খুলে রেখে সহজ হলাম।
ইয়ুচির টব কোনটা তা সহজেই বুঝতে পারছিলাম। অন্য সব চারাগুলোর থেকে সেটা মাথা উঁচু করে ছিল। আমি টবটার দিকে উবু হয়ে ফুলটার দিকে তাকালাম, পাপড়িগুলো মাত্র মেলতে শুরু করেছে। আমি আমার পেটের নিম্নংশে জমে থাকা অন্ধকারের শক্তির উপর মনোনিবেশ করলাম।
“তুই খসে পড়বি…তুই মরে যাবি আর পঁ-চে…”
আমি দুহাত একসাথে করে শরীরের সমস্ত পেশির সব শক্তি আমার কণ্ঠের উপর নিবদ্ধ করলাম। মাথার ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল আর টের পেলাম আমার নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। রক্তের ফোঁটাগুলো কংক্রিটের মেঝের উপর রঙের মত লাল গোল গোল দাগ সৃষ্টি করছিল।
আর অমনি চারা গাছটার কান্ড আর মাথা ঝুলে পড়ল।যেন মাথাটা এক কোপে কেটে ফেলা হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা পর, ইয়ুচির মর্নিং গ্লোরি কুঁচকে গিয়ে নোংরা বাদামি বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু তাতেও ইয়ুচি গাছটা ফেলল না, ওখানেই রেখে দিয়েছিল। খুব শিগগিরি ফুলটা থেকে বিচ্ছিরি গন্ধ ছড়াতে লাগল। বাজে গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে আজবাজে পোকা এসে ওখানে হাজির হল। নোরা টবটার মধ্যে খুঁয়োপোকার মত কিলবিল করতে লাগল। টিচার ঠিক করলেন মরা গাছটা ছুঁড়ে ফেলে দেবেন, আর ইয়ুচি কাঁদতে শুরু করল। আর আমার মর্নিং গ্লোরি ক্লাসের মধ্যে সেরা স্থান দখল করল।
আমার ভাল মুডটা আধা ঘন্টার জন্য বজায় ছিল। এর পর আমি আর সেটা নিতে পারছিলাম না। কেউ আমার ফুল সম্পর্কে ভাল কিছু বললে আমার মনে হচ্ছিল কান চেপে বসে থাকি।
যে মুহূর্তে আমি ইয়ুচির ফুলের টবের জাদু করেছিলাম সে মুহূর্ত থেকে আমার নিজের মর্নিং গ্লোরিটা একটা আয়নার রূপ ধারন করেছিল। আমার ভেতরে থাকা নোংরা প্রানিটাকে প্রতিফলিত করছিল, যা দেখতে আমার সহ্য হচ্ছিল না।
***
আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না কেন ইয়ুচির ফুলটা আমার ইচ্ছা মেনে নিয়ে মৃত্যুবরণ করল। ঐ সময়ে আমি প্রথম গ্রেডে পড়তাম কিন্তু আমার কণ্ঠের ক্ষমতা আবছাভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। যদি বাচ্চাদের কেউ আমার উপর ভয়ানক রেগে যেত তাহলে তাদেরকে শান্ত করার ক্ষমতা আমার ছিল। মতের অমিল ধরণের কিছু ঘটলে, আমি তখন ছোট একটা বাচ্চা ছিলাম যদিও কিন্তু আমি অন্যদেরকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে পারতাম। এমনকি বড়রাও আমার সামনে মাথা নত করে বো করত।
ধরা যাক একটা ফড়িং, বেড়ার রেলিঙের উপর বিশ্রাম করছে, সাধারণত আপনি যদি হাত বাড়িয়ে ওটাকে ধরতে যান তাহলে সে দ্রুত পাতলা ডানাগুলো নেড়ে উড়াল দেবে। কিন্তু আমি যদি ওটাকে হুকুম করি
