দিশেহারা সেলিম ভীষণ অস্থির বোধ করছে, উত্তেজনায় কখনো সে প্রচণ্ড জোরে তার জিভ কামড়ে ধরেছিলো বুঝতে পারেনি। জিভ কেটে রক্ত বেরিয়ে গেছে এবং সে এক দলা রক্তাক্ত থুতু ফেললো। সে অসহায় ভাবে তাকিয়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে কল্পনার চোখে সে দেখতে পাচ্ছে মুরাদ এবং দানিয়েল এর পাশে দাঁড়িয়ে সে পিতার শেষকৃত্যানুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করছে। সে হামিদা এবং গুলবদনের শোকসন্তপ্ত বিলাপ শুনতে পেলো এবং মায়ের মুখে বাঁকা হাসি দেখতে পেলো, যে তার জনগণের শত্রুর মৃত্যুতে আনন্দিত। আবুল ফজল আকবরের জোব্বার বোতাম গুলি খুলে দিচ্ছিলো, তার আঙ্গুল কাঁপছে। সকলে পিছনে সরে দাঁড়ান, জাহাপনাকে মুক্ত বাতাস পেতে দিন… সে বললো। সেই মুহূর্তে একজন দেহরক্ষী তার ঘোড়ার পিঠে করে একজন হেকিমকে নিয়ে সেখানে পৌঁছালো। উপস্থিত জনতার ভিড় দুভাগ হয়ে হেকিমের আসার পথ করে দিলো।
হেকিম আকবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলো এবং আকবরের হাতটি নিজের হাতে নিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করলো। আপনি! কোনো আনুষ্ঠানিক সম্বোধন ছাড়াই সে আবুল ফজলকে লক্ষ্য করে বললো, জাহাপনার পা দুটি স্থির করে ধরুন। এবং আপনি, সে আরেকজন সভাসদকে লক্ষ্য করে বললো, এক টুকরা কাপড় রুমাল যাই পাওয়া যায় ভাঁজ করে সম্রাটের মুখের ভিতর ভরে দিন তা না হলে ওনার জিভে কামড় লাগতে পারে।
হেকিম, আমি আমার বাবার জন্য কি করতে পারি? সেলিম জিজ্ঞাসা করলো। হেকিম তার দিকে তাকালো। কিছু না, হেকিম সংক্ষেপে বললো এবং আবার আকবরের দিকে ঘুরলো। সেলিম এক মুহূর্ত ইতস্তত করলো, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীদের ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগলো। যদি কোনো সাহায্য করতে না পারে তাহলে এখানে থাকার কোনো অর্থ নেই।
মাত্র আধ ঘন্টা আগে ভোরের যে সূর্য একটি ক্রীড়াপূর্ণ দিনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো বর্তমানে বনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া তার আলো নির্দয় এবং নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে। সেলিম নিচু হয়ে জন্মে থাকা ঝোঁপঝাড়ের মধ্য দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এগিয়ে চললো। একটি খালি জায়গায় এসে সে থামলো এবং তার ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করলো গাছের শাখার মধ্য দিয়ে একজোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সেটা ছিলো একটি কম বয়সী হরিণ, সেটার শিংগুলি ফ্যাকাশে বাদামি রঙের। ধীরে সেলিম তার পিঠে ঝুলে থাকা ধনুকের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে থেমে গেলো। কি লাভ? ইতোমধ্যে পৃথিবীর বুকে কারণে অকারণে বহু মৃত্যুই তো সংঘটিত হয়ে চলেছে।
এক মুহূর্ত পর হরিণটি অদৃশ্য হলো। সেলিম ঝোঁপ ঝাড় পেরিয়ে সেটির চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলো এবং ফিরতি পথ ধরলো। তার পিতার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেনো তাকে এর মুখোমুখী হতে হবে। সে একটি নির্বোধ জানোয়ারের মতো জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে পারবে না এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার অনুপস্থিতি সকলের নজর কাড়বে। কারণ যুবরাজদের আপন মনে নিরুদ্দেশ হওয়ার রেওয়াজ নেই। কিন্তু ফিরে গিয়ে কি দেখবে সে কথা ভেবে তার মনে কিছুটা ভীতি সৃষ্টি হলো। দূর থেকে সেলিম দেখলো হেকিম দাঁড়িয়ে কিছু বলছেন এবং তাকে ঘিরে থাকা আকবরের সভাসদ এবং শিকার সঙ্গীরা তার বক্তব্য শুনছেন। কিন্তু বাবা কোথায়? সেলিম সবেগে দৌড় দিলো।
সেলিম ওদের কাছে পৌঁছে আতঙ্কের সঙ্গে চারদিকে তাকাতে লাগলো এবং দেখলো তার বাবা একটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন, আবুল ফজল তার মুখে একটি পানির পাত্র ধরে রেখেছে। দেহরক্ষীরা তাকে ঘিরে রেখেছে, সেলিম তাঁদের ব্যুহ ভেদ করে বাবার কাছে ছুটে গেলো। বাবা…. পিতাকে জীবিত অবস্থায় দেখে সে স্বস্তিতে ফোঁপাচ্ছে। আকবরকে সামান্য ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে এবং তার লম্বা চুল এলোমেলো হয়ে আছে, এছাড়া আর কোনো পরির্তন বোঝা গেলো না।
দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। আমি দিব্যদৃষ্টিতে কিছু দেখেছি-আল্লাহ্র সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে। তখন আমার সারা দেহ আনন্দে কাঁপছিলো এবং আল্লাহ্ আমাকে জানিয়েছেন আমাকে কি করতে হবে। আমি শিকার স্থগিত করছি এবং এই মুহূর্তে ফতেহপুর শিক্রিতে ফিরে যাবো। সেখানে আমার জনগণের কাছে আমাকে একটি ঘোষণা দিতে হবে। এখন তুমি যাও, আমাকে বিশ্রাম নিতে দাও।
সেলিম সরে এলো, তার মনে হলো বাবা তাকে রুঢ়ভাবে উপেক্ষা করেছেন। তার বাবা যদি কোনো ঐশ্বরিক বাণী লাভ করেই থাকেন তাহলে সে বিষয়ে তাকে জানাচ্ছেন না কেনো? তিনি কি তাকে বিশ্বাস করছেন না? পিছন ফিরে সে দেখলো যে মানুষটিকে সে কিছুক্ষণ আগে মৃত্যুর নিকটবর্তী ভেবেছিলো তিনি আবুল ফজলের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছেন এবং অনুভব করলো এতোক্ষণ সে যে উদ্বেগ বোধ করেছে তা ঘৃণায় রূপান্তরিত হচ্ছে। তার নিজের উপর রাগ হচ্ছিলো কিন্তু আরো বেশি রাগ হচ্ছিলো আকবরের উপর।
*
ফতেহপুর শিক্রির এই মহান মসজিদে আমি আপনাদের সবাইকে তলব করেছি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করার জন্য।
আকবরের পরনে স্বর্ণের সুতায় বোনা পোশাক এবং মাথায় চুনি পাথরের নিচে আটা তিনটি সাদা সারসের পালক বিশিষ্ট পাগড়ি। তিনি উপস্থিত উলামাবৃন্দ, সভাসদ এবং সেনাপতিদের উপর নজর বুলালেন। তাঁদের মধ্যে সেলিমও দাঁড়িয়ে ছিলো, সে জালির আড়ালে অবস্থিত মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের দিকে এক পলক তাকালো। সেখানে হামিদা এবং গুলবদন বসে আছেন এবং আকবরের বক্তব্য শুনছেন। বাবা কি বলতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে কি তাদের কোনো ধারণা রয়েছে? তার নিজের নেই। আকবর শিকার থেকে ফেরার পর গত তিন দিন ধরে রাজপ্রাসাদ নানা গুজবে ছেয়ে গেছে। সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আকবর নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তিনি কেবল আবুল ফজলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং দুই বার শেখ মোবারকের সঙ্গে দেখা করেছেন। গুজব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেউ কেউ দাবি করছে আকবর নিজেকে খ্রিস্টান বলে ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন।
