তুর্কি দোভাষীটি জন নিউবেরীকে এসব কথা অনুবাদ করে শোনাচ্ছিলো এবং ইংরেজটির লাল মুখমণ্ডল আরো গাঢ় বর্ণ ধারণ করছিলো জেসুইটের বক্তব্য বুঝতে পেরে। কিন্তু সেলিম লক্ষ্য করলো আকবর এসব কথা শুনে ভিষণ বিরক্ত বোধ করছেন। তার বাবা দার্শনিক যুক্তিতর্ক আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন কিন্তু কারো নিন্দা বা কুৎসা নয়। তাই হঠাৎ আকবর যখন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সেলিম অবাক হলো না।
যথেষ্ট হয়েছে। আমরা অন্য কোনো দিন আবার আলোচনা করবো, আকবর বললেন এবং ইবাদত খানা ত্যাগ করলেন।
*
হেমন্তের এক ঝকঝকে দিন। সূর্যের আলো বনের ঘন বিন্যস্ত গাছ পালা, মধ্যে শোধিত হয়ে ভূমিতে সামান্যই পৌঁছাচ্ছে। এর মাঝেই খেদাড়ের তাঁদের ধাতুনির্মিত চাকতির ঘন্টা পিটিয়ে এবং তারস্বরে চিৎকার করে তাদের সম্মুখের পশু গুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। হাতির পিঠে চড়ে তার তিনজন পরিচারক সহ ছন্দোময় গতিতে এগেয়ে যেতে সেলিমের খুব ভালো লাগছিলো। তার কাছ থেকে প্রায় দশ গজ দূরে তার বাবার হাতিটি এগিয়ে চলেছে। হাতিটির নাম লংকা, সেটার পেছনের বাম পায়ে একটি ক্ষত রয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে একটি পুরুষ বাঘ ধারালো নখ দিয়ে সেখানে আঁচড়ে দিয়েছিলো। লংকা আকবরের প্রিয় শিকারের হাতি। আকবর নিজেই হাতিটিকে ধরেছিলেন সেটার জংলী সঙ্গীদের দল থেকে যখন সেটার বয়স অল্প ছিলো, তারপর সেটাকে পোষ মানান।
সেলিম তার পিতাকে নির্ভিক চিত্তে অন্য হাতিদেরও বশে আনতে দেখেছে। জংলী হাতিকে বশে আনা অত্যন্ত বিপদজনক কাজ, এর জন্য দুই জন লোক লাগে যারা বুনো হাতিটির দুপাশে দুটি পোষা হাতির পিঠে চড়ে অবস্থান করে। সঠিক অবস্থানে থেকে তারা একটি মজবুত দড়ির ফাঁস বুনো হাতিটির গলায় পড়ায় এবং দড়িটির প্রান্ত তাদের নিজেদের হাতির গলায়ও শক্ত করে বাঁধে। তারপর ফাঁসটিকে তারা ক্রমশ টেনে শক্ত করতে থাকে যার ফলে বুনো হাতিটি ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে এবং নিয়ন্ত্রণে আসে। এভাবে বুনো হাতি বশ মানাতে গিয়ে অনেক লোককে সেলিম মারা যেতে দেখেছে। কারণ বশকারীরা যে কোনো সময় মাটিতে পড়ে যেতে পারে এবং ক্ষিপ্ত হাতির পায়ের নিচে পড়লে কারো বাঁচার সম্ভাবনা থাকে না। প্রাথমিক বশীকরণের পরেও বহু মাসের প্রশিক্ষণ বাকি থেকে যায়, খাদ্যের প্রলোভন দেখিয়ে হাতিকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার হুকুম তামিল করা শেখাতে হয় এবং আরো অনেক কিছু। কিন্তু লংকা আকবরের সেবা ভালো ভাবেই করছে এবং এর প্রশিক্ষণের পিছনে তিনি যে সময় ব্যয় করেছেন তার প্রতিদান দিচ্ছে।
তাপমাত্রা বাড়ছে এবং সেলিমের মুখের কোণা দিয়ে এক ফোঁটা লোনা ঘাম প্রবেশ করলো। সে জিহ্বা দিয়ে তা সরিয়ে দিলো। শীঘ্রই খেদাড়েদের ঘর ছোট হয়ে আসবে যখন শিকার আরম্ভ হবে। কাঁধের উপর দিয়ে পিছন ফিরে সেলিম দেখতে পেলো তার কোৰ্চি একটি ঘোড়ার পিঠে কাছাকাছি রয়েছে এবং তার কালো স্ট্যালিয়ন ঘোড়াটিকে নিয়ে আসছে। প্রয়োজনে যাতে সে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। উত্তেজনায় সেলিমের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে, শিকারের সময় সর্বদাই তার এমন অনুভূতি হয়। সে একজন ভালো লক্ষ্যভেদকারী- বন্দুক এবং তীর ছোঁড়ায় সমান পারদর্শী-এবং সম্ভবত আজো সে তার পিতার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে। বাবার সঙ্গে লংকার পিঠে ভ্রমণ করতে তার ভালো লাগতো, কিন্তু চিরাচরিত নিয়মে নাদুসনুদুস গড়নের অধিকারী আবুল ফজল তার বাবাকে সঙ্গ দিচ্ছিলো।
সামান্য ঈর্ষার যে ছায়া সেলিমের মনের উপর পড়েছিলো তা শীঘ্রই অপসারিত হয়ে গেলো। সে দেখলো তার পিতার হাতিটি বনের অপেক্ষাকৃত ঘন গাছপলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শেখ সেলিম চিশতির নির্দেশনা মতো তাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে- ধৈর্য ধরে সবকিছু দেখতে হবে, শিখতে হবে এবং তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এবং এটি তার জন্য একটি শুভ ঘটনা যে তার বাবা তাকে শিকারে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হঠাৎ সম্মুখ থেকে আসা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে সেলিম চট করে হাত বুলিয়ে তার পিঠে থাকা তীর ধনুক ঠিক আছে কি না দেখে নিলো। এবং তারপর তার গাদাবন্দুকটির মসৃণ নলের উপর হাত বুলালো। হ্যাঁ, সে শিকারের জন্য প্রস্তুত।
কিন্তু পর মুহূর্তে সেলিম অনুভব করলো সম্মুখের হট্টগোল শিকারের প্রস্তুতির তুলনায় বেশি কিছু এবং তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই গোলযোগের মাঝে সে কিছু কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলো, সম্রাট অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন! হেকিমকে ডাক! হঠাৎ দ্রুধাবমান ঘোড়ার খুড়ের শব্দ পাওয়া গেলো এবং সেলিম দেখলো আকবরের দুজন দেহরক্ষী তার সামনে দিয়ে পিছন দিকে ছুটে গেলো যে দিকে ষাড়টানা গাড়িতে রাজ হেকিমরা রয়েছেন।
কি হয়েছে? আমার বাবার কি হয়েছে? সেলিম চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলো কিন্তু এই গোলযোগের মাঝে কেউ তার দিকে মনোযোগ দিলো না। উত্তেজিত সেলিম তার হাওদা টপকে হাতির দেহের পাশে বাঁধা চামড়ার ফালি ধরে কিছুটা নেমে মাটির কাছাকাছি পৌঁছে মাটিতে ঝাঁপ দিলো। তারপর কিছু অশ্বারোহী এবং খেদাড়ের পাশ কাটিয়ে দৌড়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। সে দেখতে পেলো তার পিতার হাতি লংকা হাঁটতে ভর দিয়ে বসে আছে এবং সেটার বিশাল অবয়বের পাশে কিছু লোক মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা একটি দেহকে ঘিরে জড়ো হয়ে আছে। বলপূর্বক ভিড় ঠেলে সে অগ্রসর হলো এবং দেখতে পেলো মাটিতে শুয়ে থাকা মানুষটি আকবর। তাঁর দেহ মাঝে মাঝে খিচুনির কারণে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। সেলিম বিস্ফোরিত চোখে দৃশ্যটি অবলোকন করতে লাগলো এবং নিজের অজান্তেই একটি কথা বার বার বলতে লাগলো, দয়া করো আল্লাহ, এখনই নয়। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত সংক্রান্ত ভীতির কোনো গুরুত্ব আর তার কাছে রইলো না।
