এই বণিকটি কি ফার্সী ভাষা বলতে পারে?
না জাঁহাপনা। এই ইংরেজরা স্কুল এবং অশিক্ষিত লোক। তারা নিজেদের সহজ ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে পারে না এবং বাণিজ্য ও অর্থ উপার্জন ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করে না।
ঠিক আছে থামো। আমি তাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আমার মনে হচ্ছে ওর ভাষা সম্পর্কে তোমার কিছুটা ধারণা রয়েছে, তুমি আমার দোভাষীর ভূমিকা পালন করো। আমি যা বলবো অবিকল তাই বলবে, কোনো রকম পরিবর্তনের চেষ্টা করবে না। জেসুইটটি বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লো।
ওকে জিজ্ঞেস করো সে কেনো সম্রাটের রাস্তার উপর লড়াই করেছে।
পুরোহিতটি ইংরেজটিকে সংক্ষেপে কিছু বললো যা সেলিমের কাছে লাগসই মনে হলো, তবে সেই ভাষার মাঝে সেলিম ফার্সী ভাষার ছন্দময়তা খুঁজে পেলো না। পুরোহিতটি তার প্রতিপক্ষের উত্তর শুনলো এবং সেলিমকে বললো, সে দাবি করছে সে তার রানী, দেশ এবং ধর্মের অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলো।
তাকে বলো আমাদের রাস্তায় কোনো ধরনের ঝগড়া বা লড়াই করা চলবে না এবং সে সৌভাগ্যবান এ কারণে যে তার উশৃঙ্খল আচরণের জন্য আমি তাকে গারদে নিক্ষেপ করছি না বা চাবুক পেটা করছি না। আমি তার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করছি কারণ আমি বুঝতে পারছি উভয় পক্ষেরই দোষ হয়েছে। তাকে আরো বলো সে যেনো রাজসভায় আসে। আমি নিশ্চিত আমার পিতা তাকে তার দেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইবেন। আর তোমাকে বলছি, আমাদের দেশের মাটিতে কাউকে ভবিষ্যতে অপমান করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ এই ইংরেজ লোকটির মতো তুমি নিজেও একজন বিদেশী ভ্রমণকারী।
*
আমি আপনাদেরকে আমার ইবাদত খানায় স্বাগত জানাচ্ছি। একজন সম্রাটের প্রধান দায়িত্ব হলো তার রাজ্যের সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং সম্ভব হলে তা সম্প্রসারণ করা যেমনটা আমি করেছি এবং ভবিষ্যতেও করবো। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একজন মহান শাসকের উচিত মানবীয় জ্ঞান এবং উপলব্ধিরও সম্প্রসারণ করা। আজীবন তার কৌতূহলী থাকা উচিত, প্রশ্ন করা উচিত এবং তার অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রজাদের উন্নয়নের চেষ্টা করা উচিত। এ কারণেই আমি কেবলমাত্র উলামাবৃন্দ এবং মুসলিম বিদ্বান ব্যক্তিদেরকেই আমন্ত্রণ জানাইনি বরং অন্য ধর্মের প্রতিনিধিদেরও ডেকেছি। সম্মিলিতভাবে আমরা ধর্ম বিষয়ক প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক করবো, সত্য কি এবং মিথ্যা কি তা উদঘাটনের চেষ্টা করবো এবং যে বিষয়গুলি আমাদের সকলের জন্য একই রকম তার তাৎপর্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো।
সেলিম বিশাল সভা কক্ষের পিছন দিকে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার পিতাকে কদাচিৎ এমন জৌলুসপূর্ণ রূপে দেখেছে। আকবর উজ্জ্বল সবুজ রঙের সোনা রূপার কারুকাজ খচিত জোব্বা এবং পালুন পড়ে আছেন, গলায় পান্নার মালা এবং মাথায় সোনা দিয়ে বোনা কাপড়ের পাগড়িতে হীরা ঝিকমিক করছে। এক মানুষ উঁচু সোনার ঝাড়বাতিদান স্থাপিত রয়েছে তার সিংহাসনের দুপাশে মার্বেল পাথরের বেদীর উপর।
উলামাবৃন্দ কালো পোষাক পরিধান করেছেন- শেখ আহমেদ সকলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন এবং আবুল ফজলের বাবা শেখ মোবারক দলের এক পাশে অবস্থান করছেন। জেসুইট পুরোহিতরা তাঁদের চিরাচরিত মোটা বাদামি কাপড়ের আলখাল্লা পড়ে আছে, কোমরে দড়ির কোমরবন্ধনী বাঁধা, গলায় কাঠের ক্রুশ ঝুলছে। সেলিম তাদের মাঝে ফাদার ফ্রান্সিসকো হেনরিকস এবং তার সঙ্গী ফাদার এ্যান্টোনিও মনসেরেটকে দেখতে পাচ্ছে যারা পাঁচ বছর আগে এই রাজসভায় প্রথম এসেছিলো এবং তার দেখা প্রথম খ্রিস্টান।
সেখানে পাঁচ জন হিন্দু পুরোহিতও উপস্থিত রয়েছে। তাদের চেহারায় শান্ত ভাব বিরাজ করছে, পরনে সাদা রঙের নেংটি এবং বাম কাধ তেকে শুরু করে ডান হাতের নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে বাঁধা সুতার পৈতা। এদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে জৈনরা যাদের সেলিম পবিত্র মানুষ বলে জানে। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিউপাসক জোরাস্ট্রিয়ানরা, তারা বহু আগে পারস্য থেকে হিন্দুস্তানে এসেছিলো। এই ধর্মের অনুসারীদের কারো মৃত্যু হলে মৃত দেহটিকে নিঃশব্দ মিনার নামক পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসা হয় পাখিদের ঠুকরে খাওয়ার জন্য। সেলিম পাতলা গড়নের লম্বা বুড়ো লোকটিকে চিনতে পারলো যে জোরাস্ট্রিয়ানদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে একজন ইহুদী পণ্ডিত যে পারস্যের কাসান থেকে অল্প কিছুদিন আগে আকবরের দরবারে এসেছে এবং পাঠাগারে কাজ পেয়েছে। যেহেতু সে কোনো ধর্মযাজক বা পুরোহিত নয় তাই এদের কাছ থেকে বেশ খানিটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো লাল চুল বিশিষ্ট ইংরেজ বণিকটি, তিন মাস আগে শহরের রাস্তায় সেলিম যার মুখোমুখী হয়েছিলো। তার নামটি সেলিমের কাছে ভীষণ অদ্ভুত লেগেছে জন নিউবেরী। তার ঠিক পাশেই তারই মতো বেখাপ্পা পোশাক পরিহিত তার দুজন সঙ্গী দাঁড়িয়ে আছে। এই তিনজন ইংরেজ শহরে একটি বাসস্থান ভাড়া করে অবস্থান করছিলো এবং তারা তাদের রানীর অনুমোদন বিশিষ্ট একটি বাণিজ্যের আবেদন পত্র আকবরের কাছে পেশ করে এর উত্তর লাভের জন্য অপেক্ষায় ছিলো। সেলিম যেমন অনুমান করেছিলো, আকবর তাঁদের বহুদূরবর্তী দেশ সম্পর্কে এবং তাঁদের ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যদিও তারাও খ্রিস্টান তবে তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে পর্তুগীজ জেসুইটদের বিশ্বাসের অনেক পার্থক্য রয়েছে।
