স্পষ্ট বোঝা গেলো প্রথম লোকটির দম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং দ্বিতীয় লোকটির সঙ্গে তার দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে। প্রথম লোকটি একটি আবর্জনা পূর্ণ সংকীর্ণ গলির মধ্যে অদৃশ্য হলো যার দুপাশে মাটির ইটে তৈরি বাড়ির সারি। ইতোমধ্যে সেলিমের চার জন দেহরক্ষী ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছে এবং লোক দুজনকে ধাওয়া করা শুরু করেছে-গলিটি ঘোড়া প্রবেশ করার মতো চওড়া নয়। কয়েক মিনিট পরে সেলিম আরো চিৎকারে চেঁচামেচি শুনতে পেলো। একটু পরে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী লোক দুজনকে গলির মুখে দেখা গেলো, তাদের পেছনে তলোয়ার হাতে সেলিমের দেহরক্ষীরা। যে লোকটি তলোয়ার হাতে ছুটছিলো তাকে নিরস্ত্র করা হয়েছে কিন্তু সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাচ্ছিলো। অন্যজনের বাম চোখের উপরের কাটা ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। বোঝাই যাচ্ছে রক্ষীরা সময় মতো আক্রমণকারীকে থামাতে পারেনি। তাদেরকে সেলিমের সামনে কয়েক গজ দূরে থামানো হলো। হাঁটুর পেছনে রক্ষীদের তলোয়ারের চ্যাপ্টা অংশের আঘাত পেয়ে তারা উভয়েই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসলো।
এখন সেলিম তাঁদের অবয়ব স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে। যে লোকটি বাদামি আলখাল্লা পড়ে আছে তাকে সে একজন জেসুইট পুরোহিত হিসেবে শনাক্ত করতে পারলো। তার চিকন কব্জিতে পেচানো সুতাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং তার আলখাল্লার নিচ দিয়ে বেরিয়ে থাকা বাদামি রঙের স্যাণ্ডেলটি মোটা তলি বিশিষ্ট, তার পিতার সঙ্গে দেখা করতে আসা জেসুইট পুরোহিতরা এধরনের জুতোই পড়ে। কিন্তু অন্য লোকটির চেহারা বা পোশাক সবকিছুই সেলিমের কাছে বেশ জটিল মনে হলো। সেলিম গাট্টগোট্টা চওড়া কাঁধের অধিকারী লোকটার দিকে তাকালো। সেও একজন বিদেশী সন্দেহ নেই কিন্তু এমন অদ্ভুত বিদেশী সেলিম আগে দেখেনি। তার লম্বা কোকড়া চুল গুলি উজ্জ্বল কমলা রঙের- জাফরানী এবং সোনালী এই দুই এর মাঝামাঝি কোনো রঙ। সে একটি সংক্ষিপ্ত আটসাট চামড়ার জ্যাকেট পড়ে আছে এবং সেটার নিচে ডোরা কাটা ফুলে থাকা পালুন পড়া যেটা মধ্য উরু পর্যন্ত লম্বা এবং বেগুনি রিবন লাগান। অদ্ভুত পালুনটির নিচের অংশ হলুদ রঙের পশমের মোজায় ঢাকা। তার এক পায়ে চোখা অগ্রভাগ বিশিষ্ট কালো চামড়ার জুতো পড়া রয়েছে। অন্য পাটিটি নিশ্চয়ই গলির ভিতর মারপিটের সময় খোয়া গেছে।
ওদেরকে দাঁড় করাও, সেলিম আদেশ দিলো। রক্ষীরা তাঁদের হুড়ো দিয়ে দুপায়ের উপর খাড়া করানোর পর সেলিম আরো ভালো মতো তাদের চেহারা দেখার জন্য সামনে ঝুঁকলো। জেসুইট পুরোহিতটি গোঁয়ার পর্তুগীজ বাণিজ্য উপনিবেশ থেকে আগত ছয়জন প্রতিনিধির একজন। আকবরের অনুরোধে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ ল্যাটিন ভাষা থেকে ফার্সীতে অনুবাদের কাজে আকবরের অনুবাদকদের সাহায্য করতে এসেছে। লম্বা লিকলিকে বেঢপ আকৃতির লোকটির মুখের এক পাশ দগদগে ব্রনে ভরা। যদিও সে সেলিমের কাছ থেকে প্রায় দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো তবুও তার গায়ের ঘামের তীব্র ঝাঝালো দুর্গন্ধ তার নাকে আসছিলো। সেলিমের কাছে এটা রহস্যময় মনে হলো যে এই বিদেশীরা হাম্মাম খানায় গোসল করে না কেনো? নিজেদের গায়ে খচ্চরের মতো দুর্গন্ধ তারা সহ্য করে কীভাবে?
অন্য বিদেশীটির ঠোঁটের উপরের অংশ নিখুঁত ভাবে কামান কিন্তু তার থুতনিতে ছাগলের মতো সরু দাড়ি রয়েছে। তার ফ্যাকাশে পাপড়ি বিশিষ্ট চোখগুলি উজ্জ্বল নীল এবং গায়ের চামড়া তার চুলের মতোই লাল এবং তার নাকের অগ্রভাগ আরো বেশি লাল। সে তার পোশাকের ধূলা ঝাড়তে শুরু করলো।
তোমাদের ঝগড়ার কারণ কি? সেলিম ফার্সীতে জেসুইটটিকে জিজ্ঞাসা করলো, তার মনে হয়েছে সে ফার্সী ভাষা বোঝে এবং বলতে পারে।
পুরোহিতটি সেলিমের দিকে তাকালো। জাহাপনা, এই লোকটি আমার ধর্মকে অপমান করেছে। সে আমার গুরু পোপকে ব্যাবিলনের লাল বর্ণের বেশ্যা বলে গাল দিয়েছে…সে আরো বলে
যথেষ্ট হয়েছে। সেলিম বুঝতে পারেনি পুরোহিতটি কি ব্যাপারে কথা বলছে শুধু এতোটুকু ছাড়া যে তাঁদের মধ্যে ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে ঝগড়া হয়েছে।
ঐ লোকটি কোনো দেশ থেকে এসেছে?
ইংল্যান্ড থেকে। সে একজন বণিক, বদমাশ কিছু সঙ্গী সহ ফতেহপুর শিক্রিতে নতুন এসেছে।
তুমি তাকে কি এমন বলেছে যাতে সে এতো ক্রুদ্ধ হয়ে তলোয়ার নিয়ে তোমাকে তাড়া করেছিলো?
আমি তাকে কেবল একটি সত্যি কথা বলেছি জাঁহাপনা। আমি বলেছি তার দেশের রানী একজন বেজন্মা বেশ্যা যে তার অনুসারীদের সহ নরকে পচবে।
বণিকটি মাথা নিচু করে তাঁদের কথা শুনছিলো কিন্তু স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো সে একটি বর্ণও বুঝতে পারছে না। সেলিম জানতো ইংল্যান্ড কোথায় অবস্থিত। আবিস্কৃত ভূখণ্ডের এক প্রান্তে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ যেখানে সব সময় বৃষ্টি হতে থাকে এবং দমকা হাওয়া অবিরাম আঘাত হানতে থাকে। দেশটির শাসক একজন রানী যার চুল এই লোকটির মতোই লাল। সেলিম সেই রানীর ছোট আকারের একটি প্রতিকৃতিও দেখেছে যেটি একজন তুর্কি বণিক দরবারে নিয়ে এসেছিলো। বণিকটি আকবরের দুর্লভ বস্তু প্রীতির কথা জানতো। সে অনেক চড়া দামে কাছিমের খোলের ডিম্বাকৃতির কাঠামোতে বাধাই করা এবং মুক্তার কাজ করা ছবিটি আকবরের কাছে বিক্রি করে। ছবিটিতে রানী একটি ঘিয়া রঙের মেঝে পর্যন্ত লম্বা পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে মহিলা মনে না হয়ে সেলিমের কাছে একটি পুতুলের মতো লেগেছে।
