বর্তমান পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে সেলিমের মন গর্বে ভরে উঠেছে। যদিও তার বাবা কেনো এই ইবাদত খানা নির্মাণ করছেন সে বিষয়ে তাকে তেমন কিছু বলেননি, সে প্রায়ই এর নির্মাণ কাজ দেখার জন্য আসতো। এখন তার বাবার বক্তব্য শুনে সে নির্মাণের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে-তিনি ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ক্রমবর্ধমান কৌতূহল পরিতৃপ্ত করতে চান। মোগলদের অসভ্য বলে অবজ্ঞা করে তার মা ভুল করেছেন, সেলিম ভাবলো। জীবনের তাৎপর্য সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা এবং মনের অজানা প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টার তুলনায় উচ্চতর আর কি একজন মানুষ অনুসন্ধান করতে পারে? এই মুহূর্তে উজ্জ্বল পোষাক এবং ঈগলাকৃতির হাতল বিশিষ্ট তলোয়ারে তার পিতাকে কেবল জাগতিক শক্তির মূর্ত প্রকাশ বলেই মনে হচ্ছে না বরং তার মাঝে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বও ফুটে উঠেছে। সেলিম নিজে কি কখনোও তার পিতার মতো এমন মহিমান্বিতভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারবে?
আমি জানতে পেরেছি বহু দূরবর্তী ভূখণ্ডে ধর্মমতের ভিন্নতার কারণে খ্রিস্টানরা পরস্পরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে, আকবর বললেন। আমি ফাদার ফ্রান্সিসকো এবং ফাদার এ্যান্টোনিওর কাছে বিষয়টির ব্যাখ্যা জানতে চাইছি। আপনারা বলুন যাতে উপস্থিত সকলে এ সম্পর্কে জানতে পারে।
জেসুইট দুজন পরস্পরের সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কিছু বাক্য বিনিময় করলো, তারপর তার লম্বা সঙ্গীর সম্মতি পেয়ে ফাদার ফ্রান্সিসকো বক্তব্য প্রদান করা শুরু করলো। আপনি যা শুনেছেন তা সত্যি জাঁহাপনা, ইউরোপে মানুষের আত্মার মুক্তির যুদ্ধ চলছে। আমরা যারা ক্যাথলিক মতের অনুসারী তাদের বিশ্বাসের উপর এক অশুভ আগ্রাসন শুরু হয়েছে। আমরা একে প্রোটেস্টানিজম নামে ডাকি। এই মতের অনুসারীরা সত্য থেকে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা রোমে অবস্থিত আমাদের ধর্মীয় নেতা পোপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। পোপ হলেন সেই ব্যক্তি যার অবস্থান আমাদের মতো নিকৃষ্ট পাপী এবং ঈশ্বরের মধ্যবর্তী স্থানে এবং তিনি পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি। প্রোটেস্টেন্টরা আমাদের পবিত্রতম বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এর বিরুদ্ধে অশোভন গালাগাল দেয়। তারা পবিত্র বাইবেল এর সম্পূর্ণ বিরোধী নব্য ধর্মতত্ত্ব চর্চা করে এবং দাবি করে ঈশ্বর এবং তাঁদের মাঝখানে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। উত্তম ক্যাথলিক দেশগুলিতে কিছু পবিত্র মানুষ রয়েছে। আমরা তাদের বিচ্যুতি দমনকারী নামে ডাকি- তারা এইসব পথভ্রষ্টদের অনুসন্ধান করে খুঁজে বের করার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে এবং তারা যখন পথভ্রষ্টদের খুঁজে পায় তখন তাদের ভুল স্বীকার করে ভ্রান্ত মতো পরিত্যাগ করার জন্য বলপূর্বক বাধ্য করে। যারা ভুল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায় তাদেরকে জীবন্ত অবস্থায় আগুনের মধ্যে প্রেরণ করা হয় অনন্ত নরকদণ্ডের প্রাথমিক স্বাদ প্রদানের জন্য।
তাদের কি পরিণতি হয় যারা আপনাদের সত্য পথে ফিরে যেতে রাজি হয়? আকবর জিজ্ঞাসা করলো। তিনি একাগ্রচিত্তে জেসুইটদের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
যদি তারা তাদের ভুল স্বীকারও করে তবুও তাদের পার্থিব দেহ আগুনের মাঝে প্রেরণ করা হয় যাতে তাদের আত্মা পাপমুক্ত হতে পারে এবং তারা স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের উপযুক্ত হয়।
আপনারা মানুষকে তাদের বিশ্বাস পরিবর্তনে কীভাবে প্ররোচিত করেন? যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে, যেমনটা আমরা এখানে করছি?
পাদরীদ্বয় পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলো। নিশ্চয়ই আমরা যুক্তির শক্তি ব্যবহার করি দলছুট ভেড়াদের দলে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু পরিতাপের সঙ্গে জানাচ্ছি মাঝে মাঝে আমাদেরকে দৈহিক নির্যাতনও প্রয়োগ করতে হয়।
আমার অনুবাদকগণ সেই সব নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ আমাকে শুনিয়েছে- এমন যন্ত্র ব্যবহার করা হয় যা মানুষের দেহ দুদিক থেকে টেনে হাড়ের সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, লোহার ডাণ্ডার আঘাতে মানুষের হাড়ের মজ্জা বের করে ফেলা হয় এবং চোখের উপর চাপ প্রয়োগ করে অক্ষিগোলক ফাটিয়ে দেয়া হয়…
কখনো কখনো এমন নির্যাতনের প্রয়োজন হয় জাহাপনা। কয়েক ঘন্টার যন্ত্রণা নরকের অনন্ত উত্তপ্ত অগ্নির তুলনায় কিছুই নয়।
আপনারা পুরুষদের মতো নারী ও শিশুদেরও নির্যাতন করেন?
শয়তানের ফেলা জাল অনেক বিস্তৃত জাঁহাপনা। মহিলারা বিশেষত দুর্বল বাহন এবং অল্পবয়সে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না।
নির্যাতিতরা সত্যিই অনুতপ্ত হয়েছে সে বিষয়ে আপনারা নিশ্চিত হোন কীভাবে? অত্যাচার বন্ধের জন্য তারা তো ভানও করতে পারে।
বিচ্যুতি দমনকারীরা এ সব বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ জাঁহাপনা, আপনার অনুসন্ধানকারীদের মতোই। মাত্র গত সপ্তাহেই আমি দেখেছি দুজন সন্দেহভাজন চোরকে হাতের গোড়া পর্যন্ত গরম বালুর মধ্যে পুঁতে তাদের অপকর্মের স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করতে। এই পদ্ধতি এবং আমাদের বিচ্যুতি দমনকারীদের প্রয়োগ করা কৌশলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
সেখানেই পার্থক্য সূচিত হয় যখন আদৌ কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না তা বিবেচনায় আসে। চোরদের ক্ষেত্রে সন্দেহাতিত ভাবে জানা গেছে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং কি ঘটেছিলো তা বিচারকরা উদঘাটনের চেষ্টা করছিলো। কিন্তু কোনো ধর্মের কি নিজ বিশ্বাস জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার অধিকার আছে? এই প্রশ্নটি নিয়ে আমাদের কি ভাবা উচিত নয়? আমার সাম্রাজ্যে আমি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষে মানুষে পার্থক্য করি না। আমার উপদেষ্টাগণ, আমার সেনাপতিগণ এমনকি আমার স্ত্রীগণও সকলে আমার ধর্মের অনুসারী নয়।
