সেলিম তার চোখ বন্ধ করলো, তখনই একটি দৃশ্য তার কল্পনার পর্দায় রূপ নিতে আরম্ভ করলো: সে আলোক উজ্জ্বল সিংহাসনে বসে আছে, তার সভাসদ এবং সেনাপতিরা তাকে কুর্ণিশ করছে। সে এমন কিছুই আশা করে পরবর্তী মোগল সম্রাট হতে। তার মা তার মাথায় যে সব সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই মহিমান্বিত দৃশ্যের প্রভাবে সেগুলি উধাও হয়ে গেলো। সব কিছুর উর্ধ্বে সে একজন মোগল এবং নিজ বংশের গৌরব তাকে রক্ষা করতে হবে। এতোদিন যতো দুর্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তা তার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে সেগুলিকে ঠেলে সরিয়ে দিতে হবে। যদিও এখনো তার বয়স অল্প তবুও তাকে পৌরুষ অর্জন করতে হবে। সুফি ঠিকই বলেছেন। তার পিতার ভালোবাসা এবং আস্থা অর্জন করতে হলে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে রাজ্য শাসনের যোগ্যতা তার রয়েছে…
সুফির লম্বা শ্বাস ফেলার শব্দে সেলিমের চিন্তাগুলি থমকে গেলো। আমার খুব দুর্বল লাগছে। তুমি এখন যাও। আমার বিশ্বাস আমি তোমার মাঝে স্বস্তি এবং আশা সৃষ্টি করতে পেরেছি।
সেলিম সুফিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার জন্য কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু তার আবেগের তীব্রতা তার কণ্ঠরোধ করে রাখলো। আপনি সত্যিই মহান, অবশেষে কোনোক্রমে সে বলতে পারলো। আমি এখন বুঝতে পারছি আমার বাবা আপনাকে এতো সম্মান করেন কেনো।
আমি একজন তুচ্ছ সাধক যে ঈশ্বর এবং মানুষের কার্যক্রম উপলব্ধি করার অসম্ভব চেষ্টায় নিয়োজিত। নির্জনে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারার জন্য আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। কিন্তু তোমার নিয়তি অন্যরকম। তুমি একজন মহান শাসক হবে, কিন্তু তোমার জীবন অথবা গৌরবের প্রতি আমি কখনোই ঈর্ষাবোধ করবো না।
.
১৬. স্বর্গ এবং নরক
ফতেহপুর শিক্রির আগ্রা দ্বারের কাছে পৌঁছে সেলিম পরিতৃপ্তি অনুভব করলো। আজ সকালের বাজ পাখি উড়ানোর খেলা বেশ চমৎকার ভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং তার পাখিগুলি উত্তম দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। ভোরের ফ্যাকাশে আলোয় তারা শিকারের উপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঘুঘু বা ইঁদুরের উপর একই রকম নৈপুণ্যে। আরো যেটা তার জন্য সুখবর তা হলো কয়েক সপ্তাহ পর সে তার বাবার সঙ্গে একটি দীর্ঘ শিকার অভিযানে যাবে। আকবরের শিকারের চিতা বাঘ গুলিকে অভিযানের জন্য তৈরি করা হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে থাকবে শত শত খেদাড়ে।
সেলিম এই কারণে আরো আনন্দিত যে তার বাবা তার অন্য ভাইদের পরিবর্তে তাকে শিকারের সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। সেই রাতে শেখ সেলিম চিশতির সঙ্গে দেখা করার পর আট মাস পার হয়ে গেছে। সে সুফির উপদেশ পালনের যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। যখনই সুযোগ পায় সে পিতার দৈনিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে, আকবরের ভোরে বারান্দায় গিয়ে প্রজাদের দর্শন দান থেকে শুরু করে দৈনিক রাজসভার সাক্ষাৎকার পর্ব পর্যন্ত সব কিছু। রাজসভায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্ঠনীতে অবস্থিত আকবরের সম্মুখে বিভিন্ন অভিযোগ বা আর্জি পেশ করা হয় এবং তিনি সেগুলি বিচার বিবেচনা করে আদেশ বা সমাধান প্রদান করেন। সুফির নির্দেশনা গুলি তার মনে এমন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে যে, তার এখন মনে হয় যাই ঘটুক না কেনো একদিন এই সব কার্যক্রম সেই পরিচালনা করবে। তার পিতা তার সম্পর্কে কি ভাবতেন সেই বিষয়ে দুশ্চিন্তা না করে সে এখন জনগণের শাসক হিসেবে তার কি দায়িত্ব হতে পারে সে সব বিষয়ে চিন্তা করে। সুফি যেমন অনুমান করেছিলেন তা সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে, তার এই সব কর্মকাণ্ডের ফলে অল্প অল্প করে সে তার পিতার আস্থা অর্জন করতে শুরু করেছে।
তবে আবুল ফজল সর্বদা বাবার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে না থাকলে ভালো হতো। এক নাগারে সে তার খাতায় হিজিবিজি লিখতে থাকে এবং বাবার কানে কানে ফিসফিস করে। বাবার উপর তার প্রভাব অন্য যে কোনো সময়ের মতোই অত্যন্ত প্রবল। এই আবুল ফজল কখনো কখনো সভা শুরু হওয়ার সময় বাবাকে অনুরোধ করে যাতে সে সেখানে না থাকে। আবুল ফজল যুক্তি প্রদর্শন করে যে, বিষয় বস্তুর গুরুত্ব এমন যে এর সঙ্গে সরাসরি জড়িতদেরই কেবল উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। সেলিম আরো সন্দেহ করে আবুল ফজলের প্ররোচনাতেই বাবা তাকে যুদ্ধ বিষয়ক সভায় অংশ নিতে দেন না, এই নিষেধাজ্ঞা তাকে ভীষণ ভাবে হতাশ করে।
যুবরাজকে নিরাপত্তা প্রদান করো! ঐ লোক গুলিকে গ্রেপ্তার করো। আচমকা সেলিমের দেহরক্ষীদের দলপতির চিৎকারে তার চিন্তা বাধাগ্রস্ত হলো। একই সঙ্গে একটি অপরিচ্ছন্ন বাদামি আলখাল্লা পড়া লোক সেলিমের ঘোড়ার সামনে দিয়ে দ্রুত বেগে দৌড়ে গেলো এবং ঘোড়াটি আতঙ্কে লাফিয়ে একপাশে সরে গেলো। সেলিম ঘোড়াটিকে শান্ত করার জন্য একহাতে সবলে লাগাম টেনে ধরলো এবং অন্য হাতে খাপ থেকে তলোয়ার বের করার চেষ্টা করতে লাগলো। ঠিক তার পেছনে সে তার কোর্চির ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শুনতে পেলো, কোৰ্চিটি উত্তেজিত কণ্ঠে অভিশাপ দিতে দিতে নিজের ঘোড়াটিকে সামলানোর চেষ্টা করছে। পর মুহূর্তে আরেক জন লোক-অদ্ভুত পোশাক পরিহিত এবং তার এক হাতে তলোয়ার এবং অন্য হাতে একটি ছোরা-প্রথম জনকে তাড়া করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেলো, সে কোনো অপরিচিত ভাষায় গর্জন করছে যা সেলিম বুঝতে পারলো না।
