তার বয়স অল্প জাঁহাপনা, মাত্র এগারো। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
হয়তো।
সব পিতাই তাঁদের সন্তানদের নিয়ে দুর্ভাবনা করেন।
কিন্তু সকল পিতাই তো আর সম্রাট নয়। যদিও আমি এখনো যুবক, শক্তসবল এবং আত্মবিশ্বাসী এবং প্রার্থনা করি ঈশ্বর আমাকে আগামী অনেকগুলি বছর এমন রাখবেন, তবুও অমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনো পুত্রটিকে আমি আমার উত্তরাধিকারী নির্বাচন করবো। এটা সত্যি যে আমার পুত্ররা এখনো বালক, কিন্তু আমি তো ভুলতে পারি না যে আমার পিতামহ রাজা হয়েছিলেন মাত্র বারো বছর বয়সে। তাঁর শাসন আমলের প্রাথমিক বছর গুলিতে নিজ সাহস এবং ঐকান্তিকতার বলে তিনি পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ করেছিলেন-পরবর্তীকালে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি আততায়ীর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত করেছেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছেন। আমাদের পুত্রদের মধ্যে যে পরবর্তী মোগল সম্রাট হবে তার মাঝে একই নিয়তি অনুসরণ করার যোগ্যতা থাকতে হবে। আমার ইচ্ছা আমার প্রথম পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচন করা। কিন্তু সেলিম যদি আমার প্রতি বিরুদ্ধাচারণ শুরু করে অথবা তার মাঝে যদি নেতাসুলভ গুণাবলীর অভাব দেখা দেয়, তাহলে কি হবে?
এবারে আবুল ফজল কোনো কথা বললো না। তারা দুজন নিজেদের চিন্তার আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকলো যখন মোমবাতি গুলি একে একে নিঃশেষ হতে লাগলো। আকবর ইশারায় তার পরিচাকদের নতুন বাতি জ্বালতে নিষেধ করলেন। আজ রাতে আলোর পরিবর্তে অন্ধকারেই তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন।
*
তার শিক্ষকরা যদি জানতে পারেন সে কি করছে তাহলে নিঃসন্দেহে তার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন, কিন্তু সেলিম তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামালো না। মায়ের সঙ্গে আলাপের সেই অস্বাভাবিক সন্ধ্যাটির পর থেকে সে পূর্বের তুলনায় অধিক চঞ্চলতা এবং অনিশ্চয়তা অনুভব করছে। সে যতোদূর মনে করতে পারে তার মা হীরাবাঈ তার বাবাকে ভালোবাসেন না। ক্রমশ বড় হতে হতে সে বুঝতে শিখেছে যে বাবা এবং মায়ের মধ্যকার বিয়েটি ছিলো নিছক রাজনৈতিক মৈত্রী। কিন্তু আগে কখনোও তার মায়ের ঐ সুগভীর ঘৃণা সম্পর্কে তার ধারণা ছিলো না। বাবার প্রতি এবং মোগলদের প্রতি। দৌড়াতে থাকা সেলিমের আশে পাশে বাদুর পাখা ঝাঁপটে উড়ছে, তবে এই পথের প্রতিটি ইঞ্চি তার চেনা, এমনকি এই ঘোর সন্ধ্যাবেলায়ও তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
সেলিম কারো নজরে না পড়ে আগ্রাদ্বার দিয়ে প্রসাদ সীমানার বাইরে বেরিয়ে এলো। সে ব্যবসা করতে আসা বণিকদের দলের সঙ্গে মিশে গেছে যারা সূর্যাস্তের পর বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। বণিকের দল সমভূমির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, সেলিম তাঁদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যদিকের পহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগলো। আরো দশ মিনিট দ্রুত গতিতে ছোটার পর তার মনে হলো সে একটি নিচু বাড়ির আকৃতি দেখতে পেলো। সেলিম থামলো, সে তার কানের উপর হৃদস্পন্দনের আঘাত অনুভব করছে এবং এতো জোড়ে শ্বাস নিচ্ছে যে তার মনে হলো কিছুটা দূরে অবস্থিত বাড়িটির সামনে জ্বালা ছোট আগুনের সামনে বসে থাকা বৃদ্ধা এবং মেয়েটি যেনো তা শুনতে পাবে। কিন্তু তারা নিজেদের কাজ চালিয়ে গেলো। মেয়েটি একটি সমতল পাথরের উপর ময়দা বেলে রুটি বানিয়ে বৃদ্ধাটির হাতে দিচ্ছে এবং বৃদ্ধাটি সেগুলি ধাতব তাওয়ার উপর সেঁকছে।
সেলিম শুনতে পেলো বৃদ্ধাটি হতাশাসূচক আর্তনাদ করলো যখন একটি কাঁচা রুটি আগুনে পড়ে গেলো। সে যখন কাছে এগিয়ে গেলো তার নাকে পোড়া ময়দার গন্ধ এলো। দৃশ্যটির সরলতা তাকে সাহসী করে তুলল। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই সে আজ এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হেরেমের উঠানে পায়চারিরত অবস্থায় মুরাদ এবং দানিয়েল এর সঙ্গে বাবাকে আলাপ করতে এবং হাসতে দেখে তার ভীষণ রাগ হয়। হঠাৎ ওদের কাছে নিজেকে তার বহিরাগত বলে মনে হয়। তার বেঁচে থাকা কি আদৌ অর্থপূর্ণ? এমন প্রশ্ন তার মনে জাগ্রত হতে থাকে। একই সঙ্গে তার মনে এমন আশাও সৃষ্টি হয় যে, একমাত্র সুফি সাধক শেখ সেলিমই তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন। সেলিম জানতো তার জন্ম সম্পর্কে এই সুফি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন এবং তাঁর সম্মানেই ফতেহপুর শিক্রি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি এখন অত্যন্ত বুড়ো হয়ে গেছেন এবং সম্পূর্ণ অন্ধ। আকবর তাঁকে রাজপ্রাসাদে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু তিনি রাজি হননি।
সেলিম ইতস্তত পায়ে আগুনের আলোর সীমায় উপস্থিত হলো। মেয়েটি তাকে প্রথমে দেখতে পেলো এবং উঠে দাঁড়ালো। বৃদ্ধাটি ময়েটির দৃষ্টিকে অনুসরণ করে তাকে দেখতে পেলো। তুমি কি চাও?
আমি জনাব শেখ সেলিম চিশতির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
আমার ভাই অত্যন্ত দুর্বল- তিনি এতোই দুর্বল যে আগাম বার্তা না দিয়ে আসা দর্শনার্থীর সঙ্গে তিনি এই রাতের বেলা দেখা করতে পারবেন না।
আমি দুঃখিত। আমি বুঝতে পারিনি…. সেলিম আরেকটু এগিয়ে গেলো। তার গলায় পরিহিত মণিমাণিক্যের মালা এবং হাতের আংটি আগুনের আলোতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো। তার দেহের সোনারূপার কারুকাজ করা সবুজ রেশমের পোশাকটিও ঝলমল করছে। বৃদ্ধাটি তার পায়ে পড়া চামড়ার বুটজুতো থেকে গলার হার পর্যন্ত সবকিছু খুটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো- অবশেষে সে উঠে দাঁড়ালো।
