সেলিম এগুলো উঠানে ফেলে রেখেছিলো…সে এগুলো কখনো ব্যবহার করে না…যদি বৃষ্টি হতো তাহলে নষ্ট হয়ে যেতো। মুরাদের কণ্ঠে অভিযোগের সুর।
সেলিম থমথমে দৃষ্টিতে সামনে তাকালো। সে কীভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করবে যখন মুরাদের অভিযোগ সত্যি? আসলেই সে বাবার উপহারের প্রতি অবহেলা করেছে।
আকবর সেলিমের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁকে কিছুটা দ্বিধান্বিত মনে হলো। এগুলো তোমার পছন্দ না হওয়ায় আমার খারাপ লাগছে। আমার নিজের ব্যবহারের জন্য এগুলো এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে।
সেলিম বুঝতে পারছিলো তার বাবা তার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন, যে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা। সে কিছু বলার জন্য তীব্র আকাক্ষা অনুভব করলো কিন্তু তার মুখ ফুটে কোনো কথা বের হলো না। তার পক্ষে সামান্য কাঁধ ঝাঁকানো ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব হলো না এবং সে বুঝলো এতে করে অনুশোচনার পরিবর্তে তার স্পর্ধাই প্রকাশ পেলো।
*
এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। সেলিম ও মুরাদের মধ্যে ঝগড়া হওয়ার পর থেকে যে উদ্বেগ আকবরের মনে চেপে বসেছে তিনি কিছুতেই তা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না। দাবা খেলার শেষে পরাজিত পক্ষ বলে- শাহ মাত, রাজা পরাজিত হয়েছে- এই শব্দগুলি তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার এমনই অনুভূতি হচ্ছিলো যখন তিনি সেলিমের মুখোমুখী হয়েছিলেন এবং এই অনুভূতি তার কাছে অপরিচিত। যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি সর্বদাই বুঝতে পারেন তাকে কি করতে হবে। শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের নিশ্চয়তা অনুভব করেন। বর্তমানে তার রাজ্যের সীমান্তগুলি নিরাপদ রয়েছে, আইনের শাসন বলবৎ আছে এবং তিনি ধনী গরিব নির্বিশেষে সকল প্রজার সমর্থন ও আস্থা অর্জন করছিলেন। কিন্তু নিজের পারিবারিক বিষয়ে তিনি একই ধরনের নিশ্চয়তা কেনো অনুভব করতে পারছেন না?
এমন আশা করবেন না যে আপনার পুত্ররা প্রকৃতিগত ভাবেই আপনাকে ভালোবাসবে অথবা তারা এক ভাই অন্য ভাইকে স্বাভাবিক নিয়মে ভালোবাসবে… বহু বছর পূর্বে আকবরকে বলা এই কথা গুলিই ছিলো শেখ সেলিম চিশতির শেষ উপদেশ। তিনটি স্বাস্থ্যবান পুত্রের পিতা হওয়ার আনন্দে তিনি সুফির সতর্কবাণী মন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। কদাচিৎ মনে এলেও তিনি এর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেননি কারণ তাঁর মনে হয়েছে এই বিচক্ষণ উপদেশ যে কোনো পিতার জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে, শুধু তার জন্যই নয়। কিন্তু বর্তমানে সেই কথাগুলি মনে করে ক্রমশ তার অস্বস্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। তার এবং সেলিমের মধ্যকার ব্যবধান কি বেড়ে চলেছে? তাদের মধ্যকার বন্ধন যদি সত্যিই দুর্বল হতে থাকে, তাহলে সেলিম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কি পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, এবং এই অশুভ পরিণতি প্রতিরোধ করার জন্য তিনি কি করতে পারেন?
বহুবার তার ইচ্ছা হয়েছে এই দুর্ভাবনাগুলির বিষয়ে তাঁর মা এবং ফুফুর সঙ্গে আলাপ করতে। কিন্তু হেরেমের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের পর থেকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে নিরুৎসাহিত বোধ করেছেন, যেমন ভাবে সেলিম তার সঙ্গে কথা বলতে বাধাগ্রস্ত হয়। এর পরিবর্তে আবুল ফজলের সঙ্গে আলাপ করার চিন্তা তার মনে এসেছে। তার সহজাত উপলব্ধি থেকে আকবরের মনে হয়েছে আবুল ফজল তাকে বুঝতে পারবে, এমনকি কোনো উত্তম পরামর্শও হয়তো দিতে পারবে…
অবশেষে এক সন্ধ্যাবেলায় মোমর আলো জ্বালা নির্জন উঠানে আকবর আবুল ফজলকে ডেকে পাঠালেন আলোচনা করার জন্য।
আমি আমার কাগজ-কলম নিয়ে এসেছি জাঁহাপনা, আপনি কি আমাকে কিছু লেখার জন্য ডেকেছেন?
না…আমি তোমার সঙ্গে একটা বিষয়ে আলাপ করতে চাই। তোমার সন্তান আছে, তাই না?
জ্বী জাহাপনা, আমার দুটি পুত্র, একজনের বয়স দশ এবং অন্য জনের বয়স বারো। মনে হলো আবুল ফজল কিছুটা অবাক হয়েছে।
তুমি যখন তাদের কোনো উপহার দাও কিম্বা প্রশংসা করো তখন তাদের কি প্রতিক্রিয়া হয়?
আবুল ফজল কাঁধ ঝাঁকালো। তাদের প্রতিক্রিয়া অন্য যে কোনো বালকের মতোই হয় জাহাপনা। তারা খুশি হয় এবং উত্তেজনা প্রকাশ করে।
আমার ছোট দুই পুত্র মুরাদ এবং দানিয়েল এর মতোই…
আর যুবরাজ সেলিম জাহাপনা? সে কি একই আচরণ করে না? আবুল ফজল মোলায়েম কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো।
না, তার আচরণ সেরকম নয়। অন্তত আমার সঙ্গে…আমার বলতে কষ্ট হচ্ছে এবং বিষয়টি মেনে নেয়া আমার জন্য কষ্টকর- আমি অনুভব করছি সেলিম এবং আমার মাঝে একটি অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি হচ্ছে। আমার বাংলা অভিযানের আগে সেলিম আমার অন্য পুত্রদের মতোই ভোলামেলা এবং স্বাভাবিক ছিলো, বরং আমি বলবো তাদের তুলনায় একটু বেশিই উচ্ছ্বাস প্রবণ ছিলো। কিন্তু বর্তমানে সে একদম চুপচাপ…অসামাজিক এবং সে আমার সঙ্গ এড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে।
ওর শিক্ষক কি বলেন?
শিক্ষক বলে সেলিম সব কিছুতেই ভালো করছে। সে সাবলীল ভাবে ফার্সী এবং তুর্কী ভাষা পড়তে পারে। সে তলোয়ার চালনায়ও দক্ষ, গাদাবন্দুক ছুঁড়তে পারে এবং উদ্যাম বেগে টাটুঘোড়া ছুটিয়ে পোলো খেলে। এ সবই সত্যি কারণ আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু আমার অন্য পুত্ররা যখন নিজেদের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করতে উদগ্রীব হয়ে থাকে, সেলিম কদাচিৎ আমার মুখোমুখী হয়। দুই সপ্তাহ আগে আমি শুধু তাকে নিয়ে বাঘ শিকারে গিয়েছিলাম। আমরা যখন বিশাল জানোয়ারটাকে সেটার লুকানো অবস্থান থেকে তাড়িয়ে বের করে আনি, আমি সেলিমকে বন্দুক ছোঁড়ার সুযোগ দেই। তার ছোঁড়া গুলি বাঘটির গলায় আঘাত করলে সে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠে। কিন্তু পরে রাজধানীতে ফিরে আসার সময় সে প্রায় কোনো কথাই বলেনি।
