এটা ওনার জন্য বলা খুব সহজ, সেলিম ভাবলো। কিন্তু মুখে সে বললো, আমি সব সময় দেওয়ান-ই-খাস এ যাই এবং বাবাকে সিংহাসনে বসে কথা বলতে দেখি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি না লোকেরা তার সামনে অগ্রসর হওয়ার সাহস পায় কীভাবে। তাকে তখন আমার মনে হয় অন্তঙ্গতাবর্জিত দূরবর্তী কোনো মানুষ অনেকটা ঈশ্বরের মতো…
একজন শাসকের দায়িত্ব হলো আস্থা সৃষ্টি করা, মানুষকে বোঝান যে তিনি শ্রবণ করতে প্রস্তুত, হামিদা বললেন। মানুষ তার কাছে যায় কারণ তারা তাকে বিশ্বাস করে, তোমারও একই আচরণ করা উচিত।
তোমার দাদী-আম্মা ঠিকই বলেছেন, গুলবদন বললেন। একজন শাসকের প্রজাদের প্রতি এমন ভাব প্রদর্শন করা দরকার যে তিনি তাদের নিয়ে চিন্তা করেন। এই জন্যই তোমার বাবা প্রতিদিন ভোরে ঝরোকা বারান্দায় হাজির হোন নিজেকে প্রজাদের সম্মুখে প্রদর্শন করার জন্য। এর দ্বারা শুধু এটাই প্রমাণ হয় না যে সম্রাট জীবিত আছেন বরং তাদের প্রতি তার বাৎসল্যও প্রকাশ পায়।
তিনি যদি সত্যিই তার পিতা হোন তাহলে তার সঙ্গে কথা বলতে তার এতো ভয় লাগে কেনো? সেলিম ভাবলো। যখনই সে তার পিতার মুখোমুখী হয় তখনই তার মনে হয় তিনি তাকে যাচাই করছেন, তার অন্ত রে কি রয়েছে তা উদঘাটনের চেষ্টা করছেন, তার বুদ্ধি এবং জ্ঞানের পরিধি মাপার চেষ্টা করছেন।
কি হয়েছে সেলিম? তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেনো?, হামিদা জিজ্ঞাসা করলেন। তুমি বলছো বাবার সঙ্গে কথা বলতে কিন্তু সেটা আমার জন্য খুব কঠিন…আমি বুঝতে পারি না তিনি আমার বক্তব্য সাদরে গ্রহণ করবেন কি না। তাকে আমার সর্বদাই ত্রুটিহীন এবং পরিপাটি মনে হয়- পেশাকে এবং আচরণে। তাছাড়া তিনি সর্বদাই ব্যস্ত থাকেন, সভাসদ এবং সেনাপতিরা তাকে সব সময় ঘিরে রাখে। মাঝে মাঝে তিনি আমার পড়াশোনার খোঁজখবর নিতে আসেন কিন্তু যখন তিনি প্রশ্ন করেন আমি বিভ্রান্ত বোধ করি…বোকা হয়ে যাই…মনে হয় আমি যা বলব তা ওনার পছন্দ হবে না, ফলে আমি কোনো উত্তরই দিতে পারি না। এর ফলে তিনি আরো বেশি বিরক্ত হোন।
শুধু এটাই কি তোমার সমস্যা? হামিদা হাসলেন। এতো বোকার মতো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ তোমার নেই। মনে রেখো, তোমার বাবা। আমার ছেলে। সে সর্বদাই এমন গুরুগম্ভীর ছিলো না। এক সময় সে তোমার মতোই ছোট্ট বালক ছিলো, সঙ্গীদের সাথে খেলতে গিয়ে হাঁটু ছিলে ফেলত, পোশাক নষ্ট করে ফেলতো। সত্যি কথা বলতে কি লেখা পড়ায় সে তোমার তুলনায় অর্ধেক পারদর্শীও ছিলো না এবং তুমি তোমার পরিবেশ সম্পর্কে যতোটা কৌতূহলী তার মাঝে ততোটা কৌতূহলও ছিলো না। কিন্তু আমি জানি সে তোমাকে নিয়ে কতোটা গর্বিত। তোমার নিজেকে তুচ্ছ ভাবার কোনোই কারণ নেই।
সেলিম মৃদু হাসলো কিন্তু কোনো কথা বললো না। ওনারা বুঝতে পারছেন না। আর কেউ বুঝবে কীভাবে যখন সে নিজেই নিজের অনুভূতি গুলি বুঝতে পারে না?
*
তোমাকে দেখে আমি খুশি হয়েছি সেলিম। আমার সঙ্গে ছাদের উপর চলো। আমি সেখানে প্রার্থনা করতে যাচ্ছিলাম। সেলিম তার মায়ের সঙ্গে বালুপাথর নির্মিত পেচানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো। হীরাবাঈ এর ডান হাতে ধরা মাটির প্রদীপটি থেকে যতোটা আলো আসছে তাতে সে কেবল মাত্র সিঁড়ির ধাপগুলি দেখতে পাচ্ছে, একটি বাঁক ঘুরার সময় সে হোঁচট খেলো। সে যখন সমতল ছাদে বেরিয়ে এলো দেখতে পেলো তার মা তার ছোট আকৃতির মন্দিরটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা আরম্ভ করে দিয়েছে। মায়ের মাথার চুলের বেনীতে জেসমিন ফুলের মালা জড়ানো। তখন সন্ধ্যাবেলা, পরিবেশ খানিটা উষ্ণ এবং বাতাস বইছিলো না। আকাশের দিকে তাকিয়ে সেলিম চাঁদের ফ্যাকাশে রূপালী আলো দেখতে পেলো।
হীরাবাঈ মেঝের কাছাকাছি নুয়ে প্রার্থনা করছিলো। যদিও তিনি কখনো কখনো নিজের হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলতেন, সেলিমের কাছে সে সব অদ্ভুত মনে হতো, সে মুসলমান হিসেবে এক ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে বড় হচ্ছিল এবং দেব-দেবীর মূর্তি বা অঙ্কিত চিত্রকে তার অস্বস্তিকর মনে হতো। এক সময় হীরাবাঈ এর প্রার্থনা শেষ হলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে সেলিমের দিকে ফিরলো। চাঁদটিকে দেখো। আমরা রাজপুতরা রাতের বেলা ওর সন্তান হয়ে যাই এবং দিনের বেলা আমরা সূর্যের সন্তান। চাঁদ অমাদের প্রদান করে সীমাহীন ধৈর্যশক্তি এবং সূর্য আমদের দান করে দুর্দমনীয় সাহস। হীরাবাঈ এর গাঢ় বর্ণের চোখের পাতা প্রকম্পিত হলো যখন সে সেলিমের দিকে চাইলো। সেলিম তার প্রতি তার মায়ের ভালোবাসার তীব্রতা অনুভব করতে পারলো এবং আশা করলে তিনি তাকে আলিঙ্গন করবেন, কিন্তু এটা তার স্বভাব নয় এবং তার বাহু দুটি তার দেহের দুপাশেই স্থির রইলো।
মা, তুমি সব সময় রাজপুতদের কথা বলো, কিন্তু আমি তো একজন মোগলও, তাই না? সেলিম তার মায়ের কাছে এসেছে এই জন্য যে সে আশা করছে তিনি হয়তো তার মনে সৃষ্টি হওয়া বিভ্রান্তি এবং অনিশ্চয়তার কিছুটা সুরাহা করতে পারবেন। এবং সে পরিচারকদের চোখে ফাঁকি দিয়ে একা এসেছে, তার ধারণা মায়ের সঙ্গে তার আলাপের বিবরণ বাবাকে জানানোর বিষয়ে তাদের উপর নির্দেশ রয়েছে।
একজন মোগল রাজপুত্র হিসেবে তুমি বড় হচ্ছ সে জন্য আমি অত্যন্ত ব্যথিত। তোমার শিক্ষকরা তোমার পিতামহ হুমায়ুন এবং প্রপিতামহ বাবরের বীরত্বের কাহিনী দিয়ে তোমার কান ভারী করছে- কীভাবে তারা ইন্দুস নদী অতিক্রম করলো এবং হিন্দুস্তান জয় করলো…
