আমার বাবা যেহেতু হিন্দুস্তানের সম্রাট, আমাকে তো এই ভূখণ্ডের ইতিহাস জানতেই হবে, তাই না?
নিশ্চয়ই। কিন্তু তোমাকে সত্যও জানতে হবে। তোমার শিক্ষকরা মোগল গোত্র গুলির বীরত্ব ও সাহস সম্পর্কে বহু প্রশংনীয় গল্প তোমাকে বলে কিন্তু তারা তো এ কথা বলে না যে, যা এক সময় রাজপুতদের ন্যায্য অধিকার ছিলো মোগলরা তা চুরি করেছে।
তুমি কি বোঝাতে চাইছো মা?
তোমার বাবা তোমাকে এই ধারণা দিয়ে বড় করছে যে এই ভূখণ্ড তোমাদের। সে তোমাকে ভ্রান্ত ধারণা প্রদান করছে, তার উদ্ধত স্বভাব এবং অতিগর্ব দ্বারা সে নিজেও অনুরূপ বিভ্রান্ত। বাস্তবতা হলো মোগলরা গরুচোরদের সমতুল্য যারা রাতের অন্ধকারে দলবদ্ধভাবে অনুপ্রবেশ করে অন্যের সম্পদ লুট করে নেয়। তারা হিন্দুস্তানের এক দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়েছে হামলা করার জন্য। মোগলরা দাবি করে তৈমুরের হিন্দুস্তান জয় তাদের এই ভূখণ্ড শাসন করার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু তৈমুরের পরিচয় কি? সে উত্তর থেকে আগত আর একজন অসভ্য বর্বর ছাড়া অন্য কিছু তো নয়!
হিন্দুস্তানের প্রকৃত শাসক আমার জনগণ রাজপুতরা- তারা তোমারও স্বজাতীয় সেলিম। বাবর এবং তার যাযাবর উপজতির দল আমাদের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানোর ঠিক আগমুহূর্তে রাজপুত রাজারা চিত্তরগড়ের রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে একটি মিত্রজোট গঠন করছিলেন দুর্বল, আরামপ্রিয় লোদি শাসকদের সিংহাসন চ্যুত করে হিন্দুস্তানকে পুনরায় আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। হয়তো কোনো কারণে আমরা দেবতাদের বিরাগভাজন হয়েছিলাম এবং মোগল আগ্রাসন আমাদের উপর বর্ষিত দেবতাদের শাস্তি।
মোগলরা লোদি রাজবংশকে পরাজিত করার পরেও আমাদের জনগণ লড়াই এর দুর্ধর্ষ পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বাবর তাঁদের বিধর্মী বলে বিদ্রূপ করেছে কিন্তু তারা তাকে দেখিয়ে দিয়েছে হিন্দু যোদ্ধাশ্রেণী কতোটা বিক্রমের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। তারা তাকে খানুয়াতে আক্রমণ করে এবং প্রায় পরাজিত করার উপক্রম করে। হীরাবাঈ এর চোখ জোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে যেনো সে নিজেও সেই রাজপুত যোদ্ধাদের সঙ্গে রক্ত ঝড়িয়েছে।
তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে তুমি একজন মোগল কি না, তাই না? হা তুমি মোগল, কিন্তু আংশিক। কখনও ভুলে যেও না তুমি যেমন আকবরের সন্তান তেমনি আমার সন্তান। এবং রাজকীয় রাজপুত রক্ত যা মোগল রক্তের তুলনায় হাজার গুণে পবিত্র- তা তোমার শিরায় প্রবাহিত। তুমি যে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়ার আশা করছে তা তোমার নাও হতে পারে…কারণ তোমার বাবা তোমার ভাইদের মধ্যে যে কাউকে সিংহাসনের জন্য নির্বাচন করতে পারে। তবে তোমারও পছন্দ করার সুযোগ রয়েছে…
সেলিম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো, তার কি ভাবা উচিত সে বিষয়ে সে আরো বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। নিজের রাজপুত স্বজাতীয়দের সম্পর্কে তার মায়ের বিলাপ এবং মোগলদের বীরত্বগাথা সম্পর্কে তার শিক্ষকদের প্রদত্ত জ্ঞানের মধ্যে কোথায় সত্যের অবস্থান? এবং এই দুই ভিন্ন মতের মাঝে তার অবস্থানই বা কোথায়? মা কি তাকে এমন ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, তার পিতার বড় ছেলে হওয়া সত্ত্বেও তাকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন এবং তার জীবনে এমন মুহূর্ত আসতে পারে যখন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মোগল ও রাজপুত উত্তরাধীকারের মধ্যে কোনটা সে বেছে নেবে? দ্বিতীয় ইঙ্গিতটি অর্থহীন কারণ এ বিষয়ে তার বাবার ঘোষণাটি তার মনে পড়লো। তিনি বলেছেন তার রাজ্যে সকলের অধিকার সমান এবং অবশ্যই তাদেরও সমান অধিকার রয়েছে যে সব রাজপুত মোগলদের মিত্র হিসেবে তাঁদের সঙ্গে জোটবদ্ধ।
কিন্তু মা, তোমার নিজের পরিবারের সদস্যরা অর্থাৎ অম্বরের রাজপরিবারও তো মোগলদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ- যেমন তোমার ভাই ভগবান দাশ এবং ভ্রাতুস্পুত্র মান সিং। মোগলদের সঙ্গে মিত্রতা করা যদি অসম্মানজনক হতো তাহলে কি তারা আমার বাবার সঙ্গে যোগ দিত?
আনেক মানুষকেই ক্রয় করা যায়…এমনকি রাজপুত মর্যাদাও। আমি আমার ভাই এবং ভাতিজার আচরণের জন্য লজ্জিত। হীরাবাঈ এর কণ্ঠস্বর ঠাণ্ডা শোনাল এবং সেলিম অনুভব করলো সে বোকার মতো তার মায়ের অহমিকায় আঘাত করেছে। তুমি এখন যেতে পার, কিন্তু আমি যে কথাগুলি বললোম সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করবে।
হীরাবাঈ সেলিমের দিক থেকে পিছন ফিরে পুনরায় পূজা করার জন্য তার মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলো। সেলিম এক মুহূর্ত ইতস্তত করলো, তারপর ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিচের উঠানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। তার পিতা এবং মোগলদের সম্পর্কে মায়ের ঘৃণাপূর্ণ কথাগুলি তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে তার কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য মায়ের কাছে এসেছিলো কিন্তু উল্টো নিজের পরিচয় সম্পর্কে নতুন কিছু প্রশ্ন তার মনে যোগ হলো। প্রকৃতপক্ষে সে কোনো রাজবংশের উত্তরাধিকারী? ভবিষ্যতে সে কোনো ধরনের শাসকে পরিণত হবে?
৪.১ আল্লাহ আকবর
চতুর্থ খণ্ড – আল্লাহ আকবর
১৫. ‘তুমি সম্রাট হবে
তুমি ওগুলো কোথায় পেলে? সেলিম মুরাদকে ক্রুদ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করলো। দুটি কবুতর মুরাদের কোমরবন্ধনী থেকে ঝুলছিলো, সেগুলির গলা রক্তাক্ত। তবে সেলিমের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো মুরাদের হাতে ধরা দ্বিবক্র ধনুক এবং তীর ভরা তূণীরটির দিকে।
