*
আমি কৌতূহল অনুভব করছি। গিয়াস বেগ লোকটি দেখতে কেমন ছিলো? হামিদা জিজ্ঞাসা করলেন।
সে লম্বা এবং রোগা এবং যে জোব্বাটি পড়ে ছিলো সেটা তার দেহের তুলনায় ছোট ছিলো। তার হাড়সর্বস্ব মোটা কব্জিগুলি হাতার ভেতর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত বেরিয়ে ছিলো, সেলিম উত্তর দিলো।
এবং সে একজন পারসিক?
হ্যাঁ।
সে আমাদের দরবারে কেনো এসেছে?
বাবার সাহায্য লাভের আশায়।
সে কি প্রার্থনা করলো?
যে কোনো একটি কাজ চাইলো।
সে যা যা বলেছে সব আমাকে বলো।
হামিদা মনযোগ সহকারে সেলিমের মুখে সব কিছু শুনতে লাগলেন। তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। জীবন খুবই বিস্ময়কর, অবশেষে তিনি বললেন। একাধিক মানুষের জীবনে একই রকম ঘটনা ঘটে- তোমার পিতামহ অর্থাৎ আমার স্বামীর জীবনেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিলো। তবে আমার মনে হচ্ছে কি জানো, এই গিয়াস বেগ একদিন আমাদের সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি হয়ে উঠবে। তার জীবনে যেমন ঘটনা ঘটেছে এর সঙ্গে আমাদের পরিবারে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সূক্ষ্ম মিল রয়েছে। তুমি বলছিলে সে পারস্য থেকে প্রায় খালি হাতে এসেছে এবং নিজ সদ্যোজাত কন্যাকে প্রায় ত্যাগ করার উপক্রম করেছিলো। প্রায় একই রকম দুর্দশার কারণে আমি এবং তোমার পিতামহ পারস্যে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম শাহ্ এর সাহায্য লাভের আশায়। আমাদেরও খাদ্য বস্ত্রের অভাব ঘটেছিলো। তবে তার থেকেও মারাত্মক যা ঘটেছিলো তা হলো তোমার পিতার ঘটনা- তখন সে একটি শিশু, আমাদের কাছ থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিলো।
সেই সময়ের কথা কল্পনা করো যখন আমরা দুর্বিসহ যাত্রা শেষে পারস্যে পৌঁছাই…কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা ঠিক মতো খেতে পাইনি এবং শাহ্ আমাদের আদৌ তার রাজ্যে থাকতে দিবেন কি না সেটাও অনিশ্চিত ছিলো। কিন্তু যখন তিনি আমাদের আগমনের কথা জানতে পারলেন তখন দশ হাজার অশ্বারোহীর বিশাল এক সৈন্য দল পাঠিয়েছিলেন আমাদেরকে তার গ্রীষ্মকালীন রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বেগুনী বর্ণের রেশমের পোশাক পরিহিত ভৃত্যরা আমাদের সম্মুখের রাস্তার উপর গোলাপ জল ছিটিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো যাতে ধূলা না উড়ে। নৈশ ভোজের সময় পরিচারকরা আমাদের প্রায় পাঁচশো প্রকার উপাদেয় খাবার পরিবেশন করে এবং সেই সঙ্গে মিষ্টান্ন ও বরফ যুক্ত অতুলনীয় স্বাদের শরবত। পরে রাজকীয় তাবুতে সুগন্ধিযুক্ত সাটিনের মসৃণ বিছানায় আমরা ঘুমিয়েছি। প্রতি বেলার আহার শেষে আমাদের নতুন নতুন উপহার প্রদান করা হতো। নিখাদ সোনার তৈরি খাঁচায় বন্দী গানের পাখি যার গলার ছিলো রত্নহার, হাতির দাঁতের পটে আঁকা তৈমুরের চিত্র যেটি এখনো আমার কাছে রয়েছে। তবে যদিও আমরা শাহ্ এর কাছে সাহায্যপ্রার্থী ছিলাম তবুও আমরা কখনোই তার সঙ্গে শরণার্থীর মতো আচরণ করিনি। তোমার পিতামহ তাকে একটি চমৎকার উপহার দিয়েছিলেন- যা তাকে কারো প্রদান করা শ্রেষ্ঠতম উপহার। সেটা ছিলো কোহিনূর হীরা যাকে আলোর পাহাড় নামে ডাকা হতো।
কিন্তু দাদা শাহকে ঐ চমৎকার হীরাটি দিয়েছিলেন কেনো?
হামিদা হাসলেন, একটু বিষণ্ণভাবে, অন্তত সেলিমের কাছে তাই মনে হলো। তোমাকে বুঝতে হবে তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিলো। বিষয়টি তোমার জন্য শিক্ষনীয়। ভেবে দেখো, অন্য একজন শাসকের দয়ার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা তোমার দাদার জন্য কতোটা মানহানিকর ছিলো। শাহকে কোহিনূর হীরাটি উপহার দেয়ার মাধ্যমে তিনি ঐ পরিস্থিতিতে কিছুটা ভারসাম্য আনার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। দেখাতে চেয়েছিলেন তার সম্মান শাহ্ এর তুলনায় কম নয় এবং এভাবেই সেই দুর্দিনে তিনি নিজের। মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। একটি রত্ন, সেটি যতোই দুপ্রাপ্য বা চমৎকার হোক না কেনো, আমাদের রাজবংশের মর্যাদার সাথে কি তার তুলনা চলে? হঠাৎ হামিদার চোখ দুটি অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
হামিদা যখন কথা বলছিলেন তখন সেখানে গুলবদন প্রবেশ করেছিলেন। সেলিমের দিকে তাকিয়ে তিনি উষ্ণ হাসি দিলেন, সেলিমও হেসে তার প্রত্যুত্তর দিলো। সে তার এই উভয় পিতামহীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করে। তাদের সান্নিধ্যে সে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাও অনুভব করে। তারা তার সমালোচনা করেন না এবং মজার মজার গল্প বলেন। তার পিতামহের পুনরায় হিন্দুস্তান জয় করার কাহিনী যখন তারা তাকে বলেন তখন সে কল্পনার চোখে দেখতে পায় মোগল অশ্বারোহীদের ইস্পাতের ফলা বিশিষ্ট বর্শার মাথায় পতপত করে পতাকা উড়ছে যখন তারা পাথুরে ভূমির উপর দিয়ে শত্রুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং মোগলদের কামানের মুখ থেকে গোলা বর্ষণের সময় সাদা ধোঁয়া উঠে আকাশকে গ্রাস করেছে। বন্দুকের বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ যেনো তার নাকে আসে এবং সে যুদ্ধহাতির গভীর চিৎকার শুনতে পায়।
তোমার এই দাদীকে ঐ পারসিকটি সম্পর্কে বলো যে রাজসভায় এসেছে। হামিদা সেলিমকে বললেন।
তোমার বাবা কি এই গিয়াস বেগকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে? সেলিমের গল্প শেষ হতে গুলবদন জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ। বাবা তাকে কাবুলে একটি কাজ দিয়েছেন।
তোমার বাবার মানুষের চরিত্র বিচার করার ক্ষমতা অনেক ভালো, গুলবদন বললেন, কিন্তু সে সবসময় এমনটা ছিলো না। সে যখন তরুণ ছিলো তখন সে কোনো বিষয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করতো না এবং খুব সহজেই অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে সতর্ক হতে শিখেছে। তাকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করবে সেলিম। তাকে তার সিদ্ধান্ত গুলির পেছনের কারণ জিজ্ঞাসা করবে…তার কাছ থেকে সবকিছু শেখার চেষ্টা করবে।
