গিয়াস বেগ এক মুহূর্তের জন্য চুপ করলো। আকবর কল্পনায় সেই বিহ্বল দুর্ভাগ্য তাড়িত পিতাটিকে দেখতে পেলেন যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে সম্মুখে মৃত্যু এবং হতাশা ব্যতীত আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তিনি নিজে কি তাঁর কোনো পুত্রকে অনুরূপ পরিস্থিতিতে ত্যাগ করতে পারতেন? যেনো তার সন্তানদের বিষয়ে চিন্তার জাদুকরী প্রভাবে তাঁদের একজন সেখানে হাজির হলো, আকবর সেলিমে একটি থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। সে এতোক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে গিয়াস বেগের গল্প শুনছিলো।
তারপর কি হলো? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
এক অপ্রত্যাশিত হাসি পারসিকটির মুখমণ্ডল কোমর করে তুললো। মরণশীল মানুষ জানে না ঈশ্বর তাঁদের কোনো পথে ধাবিত করবেন। কোনো কারণে তিনি আমার উপর অসীম করুণা বর্ষণ করলেন। কাফেলার একজন পারসিক বণিকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিলো-সেও খুরাসানের লোক। কাফেলাটি যখন রাতের বিশ্রামের জন্য থামে তখন সে খেয়াল করে আমরা তাদের দলের মধ্যে অনুপস্থিত। সে আমার স্ত্রীর অবস্থা জানতে এবং অনুমান করে তার প্রসবের সময় হয়তো হয়ে এসেছে। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই সে তার দুজন ভৃত্যকে নিয়ে আমাদের খোঁজে ফিরে আসে। অলৌকিক ভাবে সে আমার সন্ধান পায় যখন আমি একটি অগভীর জলধারা পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
আমি যখন তাকে আমার কন্যার কথা বললোম, সঙ্গে সঙ্গে সে তার একজন ভৃত্যের ঘোড়া আমাদের দিয়ে দিলো। আমি দ্রুত ফিরতি পথ ধরলাম- বাস্তবে আমি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারিনি- প্রার্থনা করছি। মেহেরুন্নিসা যাতে তখনো বেঁচে থাকে। যখন আমি বাতাসে তার কান্নার শব্দ পেলাম উপলব্ধি করলোম আমার প্রার্থনা শ্রুত হয়েছে। সে অক্ষত ছিলো তবে ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিলো, তার ছোট্ট ঠোঁট জোড়া নীল বর্ণ ধারণ করেছে। আমি ঘোড়ার জিনের উপর বিছান ভেড়ার চামড়াটি তুলে নিয়ে তাকে ভালোমতো পেচিয়ে নিলাম। কয়েক মুহূর্ত পর লক্ষ্য করলোম তার মুখের স্বাভাবিক রং ফিরে আসছে এবং তখন আমি আবার নতুন আশায় উদ্বুদ্ধ হলাম।
বণিকটি আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, সে আমাদের খাদ্য প্রদান করলো এবং তারই একটি ষাঁড় টানা গাড়িতে চড়ে চারদিন আগে আমরা ফতেহপুর শিক্রির কাছে পৌঁছাই। দূর থেকে এই মহান শহরের উঁচু দেয়াল দেখতে পেয়ে আমাদের মন আনন্দে ভরে উঠে। আমি আপনার অনেক সময় নষ্ট করলোম জাহাপনা। আমার কাহিনী যদি আপনাকে সন্তুষ্ট করে থাকে তাহলে আপনার দরবারের যেকোনো একটি কাজ আমাকে দিন, আপনি আমাকে একজন কৃতজ্ঞ এবং নিবেদিত প্রাণ সেবক হিসেবে পাবেন।
আকবর গিয়াস বেগের লম্বা এবং দুর্যোগে বিধ্বস্ত অবয়বটি মনযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করলেন। পারসিকটির বিপদ এবং দুর্যোগ সংক্রান্ত গল্পটির বিষয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করছেন না। লোকটির অবস্থার সঙ্গে তার কাহিনীর সত্যিই সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু এই মার্জিত মিষ্টভাষী লোকটি নিজের যে পরিচয় দিয়েছে তা কি সম্পূর্ণ সত্যি? জেনেশুনে এমন বিপদসঙ্কুল যাত্রায় অল্পবয়সী পুত্র এবং গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে সে কেনো অগ্রসর হলো? দারিদ্র থেকে মুক্তি বা ভাগ্যান্বেষণের যে উদ্যোগের কথা সে সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করলে তা মিথ্যাও হতে পারে। হয়তো তার পারস্য ত্যাগের অন্য কোনো কারণ রয়েছে দুর্নীতি বা বিদ্রোহ বা অন্য কিছু তাকে নিজ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে…
যেনো আকবর তাকে সন্দেহ করছেন বুঝতে পেরেই গিয়াস বেগ হতাশায় কিছুটা নুয়ে পড়লো। তার এই ক্ষুদ্র নিরাশাসূচক ভঙ্গীমার উপর নির্ভর করেই আকবর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সামান্য অনিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি পারসিকটিকে একটি সুযোগ দিবেন, কারন একজন সম্রাটের অবশ্যই দয়ালু হওয়া উচিত। তিনি তাকে এমন জায়গায় পাঠাবেন যে, যদি সে তার দাবি অনুযায়ী সত্যিই পরিশ্রমী হয় তাহলে সে সেখানে ভালো উন্নতি করতে পারবে। কিন্তু সে যদি অসৎ অথবা প্রতারক হয় তাহলে তার অপরাধ দ্রুত উন্মোচিত হয়ে পড়বে।
গিয়াস বেগ তোমার কাহিনী আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে। আমি মনে করি তুমি একজন সাহসী এবং সৎ ব্যক্তি এবং আমার আনুকূল্য লাভের উপযুক্ত। জওহর…. আকবর তার বয়স্ক উজিরের দিকে তাকালেন। কিছু দিন আগে তুমি আমাকে বলেছিলে কাবুলে আমার একজন সহকারী হিসাবরক্ষক মৃত্যুবরণ করেছে, তাই না?
জ্বী জাহাপনা, সে গুটি বসন্তে মারা গেছে।
গিয়াস বেগ, তুমি কি এই পদটি গ্রহণ করবে? তুমি যদি এ পদে কাজ করে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারো তাহলে ভবিষ্যতে তুমি আরো মর্যাদাজনক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবে।
গিয়াস বেগের চেহারায় স্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো। আমি কাবুলে আমার সর্বোত্তম সামর্থ দিয়ে কাজ করবো জাহাপনা।
ঠিক আছে তাহলে।
পারসিকটি প্রস্থান করার পর আকবর ইশারায় জওহরকে কাছে ডাকলেন। কাবুলে আমার রাজ্যপালকে একটি চিঠি লিখো, তাকে বলবে গিয়াস বেগের উপর নজর রাখতে, যাতে কোনো অঘটন না ঘটে। এরপর তিনি তার পুত্রের খোঁজ করলেন। সেলিম নিঃশব্দে প্রস্থান করেছে বুঝতে পেরে তিনি অবাক হলেন না। জেসুইট পুরোহিতদের বিষয়ে প্রশ্ন করার দিন থেকেই ছেলেটি তাকে এড়িয়ে চলছে। যখনই তিনি তার পড়ার সময় অথবা তলোয়ার চালনা, কুস্তি বা তীর ছোঁড়ার প্রশিক্ষণের সময় তার কাছে গিয়েছেন- তখনই সে তার দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবর্তে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। সেলিমের স্পষ্ট অস্বস্তি আকবরের পক্ষ থেকে তাকে কিছু বলা বা তার জন্য কিছু করা অনেক কঠিন করে তুলেছে। অবশ্য তিনি নিজে অনেক অল্প বয়স থেকেই তার চারপাশের মানুষদের ভালোবাসা এবং প্রশংসাকে অনায়াস লব্ধ বলেই গণ্য করেছেন। তাঁর পুত্রের আচরণের বিপরীতে তাঁর প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? তাঁকে ধৈর্যধারণ করতে হবে। তিনি যদি অপেক্ষা করেন তাহলে একদিন সেলিম নিজ তাগিদেই তাঁর কাছে আসবে, তার মা তাকে যাই বলুক না কেনো…প্রতিটি ছেলেরই তাদের বাবাকে প্রয়োজন আছে।
