হঠাৎ আকবর উপলব্ধি করলেন শেখ আহমেদের আস্ফালন থেমেছে এবং সকলে তার মতামত শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। আকবর তার এক হাত তুললেন। সভা এখানেই সমাপ্ত করছি। যা শুনলাম সে সম্পর্কে আমি চিন্তাভাবনা করবো। শেখ আহমেদ, আপনি আগামীকাল আমার সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। তবে সকলকে একটি বিষয় উপলব্ধি করতে হবে। আমি ম্রাট এবং এই মর্যাদা বলে আমি পৃথিবীতে ঈশ্বরের ছায়া স্বরূপ। আমার জীবন কীভাবে চলবে সে সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেবো। আমার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্য কোনো মানুষের মতামত বা হস্তক্ষেপ আমি সহ্য করবো না।
ওলামাবৃন্দ পিছন দিকে সরে প্রস্থান করলো। আকবর কিছুক্ষণ চিন্ত মিগ্নভাবে বসে রইলেন। অল্প সময় পর জওহর তাঁকে ফিস ফিস করে বললো, জাহাপনা, রাজ দরবারে একজন আগন্তুক এসেছে- দৈবক্রমে যে দেশ সম্পর্কে একটু আগে আলোচনা হচ্ছিলো সে সেই পারস্যের লোক। সে আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছে। আকবর বলতে যাচ্ছিলেন তাঁর আর ধৈর্য নেই তাই আজ আর কারো সঙ্গে দেখা করবেন না, কিন্তু জওহর আরো বললো, তার একটি আকর্ষণীয় কাহিনী আছে জাহাপনা এবং সে কোনো সাধারণ ভ্রমণকারী নয়।
আকবর এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন। তার ইচ্ছা করছিলো ঘোড়ায় চড়ে একটু বেড়াতে। মরুভূমির বুকে খানিক্ষণ ঘোড়া ছুটালে হয়তো তাঁর অবসাদ কিছুটা লাঘব হতো। কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার জন্য বাইরের আবহাওয়া তখনো বেশ উষ্ণ। ঠিক আছে, তাকে পাঠাও।
দশ মিনিট পর একজন লম্বা শীর্ণ গড়নের লোককে দরবার-ই-খাস এর বারান্দাগুলির একটিতে নিয়ে আসা হলো। সে যে জোব্বাটি পড়ে আছে সেটা তার দেহের তুলনায় ছোট এবং তার আঙ্গুলে কোনো আংটি নেই। কাছে এসো। কে তুমি?
আমার নাম গিয়াস বেগ। আমি পারস্যের একটি সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। আমার বাড়ি ছিলো খুরাসানে। আমার পিতা শাহ্ এর দরবারের একজন সভাসদ ছিলেন এবং বৈবাহিক সূত্রে রাজপরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে।
আমার দরবারে আসার উদ্দেশ্য কি?
এক মারাত্মক রোগের প্রদুর্ভাবে আমার ভূ-সম্পত্তির সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ি এবং আমার পরিবার দারিদ্রের মাঝে পতিত হয়। আমি বহু পারসিকের কথা জানি যারা আপনার দরবারে এসে অনেক উপকার লাভ করেছে। সেই জন্য আমি আমার পরিবার সহ হিন্দুস্ত নে এসে আপনার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেই। গিয়াস বেগ বিরতি নিলো এবং অল্প সময়ের জন্য তার কালশিরে পড়া চোখ ঘষলো। তার গলার স্বর গভীর এবং ছন্দময় এবং সে পারসিক রাজসভায় প্রচলিত শুদ্ধ ফার্সিতেই কথা বলছে। যদিও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে বর্তমানে সে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে তবুও তার অভিব্যক্তি থেকে মনে হচ্ছিলো মানুষকে আদেশ প্রদান করতেই সে বেশি অভ্যস্ত কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে। আকবর তার প্রতি অধিক আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
জাহাপনা, আপনার সম্মুখে আমাকে ভিক্ষুকের বেশে উপস্থিত হতে হয়েছে, কারণ যাত্রা পথে আমি ভয়ানক দুর্যোগের শিকার হয়েছিলাম। তবে ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত অবস্থায় আপনার সামনে উপস্থিত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছি কারণ- আপনার গ্রন্থাগারের একজন বিদ্বান ব্যক্তি আমার বন্ধু- সে আমাকে পরিষ্কার পোশাক প্রদান করেছে। আপনি হয়তো ভাবছেন এই দরিদ্র প্রাণীটি যতো তাড়াতাড়ি বিদায় হয় ততোই মঙ্গল, কিন্তু আমি আপনাকে সবিনয়ে অনুরোধ করবো আমার যাত্রা পথের কাহিনীটি শোনার জন্য।
ঠিক আছে, বলল তোমার কাহিনী।
আমার সঙ্গে আমার গর্ভবতী স্ত্রী এবং অল্প বয়সী পুত্র ছিলো- স্ত্রীর গর্ভাবস্থা শেষ দিকে পৌঁছেছিলো। আমরা নিরাপদে হেলমান্দ নদী অতিক্রম করে পারস্য ত্যাগ করি। এরপর থেকেই আমাদের দুর্যোগ আরম্ভ হয়। হিন্দুস্তানের পথে ক্রমশ জঙ্গল, পাহাড় এবং জনবসতিহীনতা আবির্ভূত হতে থাকে।
আমি জানি। ঐ পথে অগ্রসর হতে গিয়ে একবার আমার পিতার জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছিলো। তুমি কীভাবে টিকে গেলে?
আমার পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আমি একটি বড় কাফেলার সঙ্গে যোগ দেই। কিন্তু আমার স্ত্রীর দুর্বল দশা এবং আমাদের বহনকারী খচ্চর গুলির রুগ্ন অবস্থার জন্য আমরা পিছিয়ে পড়ি। একদিন রাতে একটি সংকীর্ণ গিরিপথ পেরুনোর সময় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একদল ডাকাত নেমে এসে আমাদের আক্রমণ করে। আমার স্ত্রী যে বুড়ো খচরটির পিঠে চড়েছিলো সেটি ছাড়া বাকি সবকিছু তারা লুট করে নেয়। পরদিন আমরা মরিয়া হয়ে অগ্রসর হতে থাকি আবার কাফেলাটির নাগাল পাওয়ার জন্য। কিন্তু আধার নেমে পড়ায় সেই রাতের জন্য একটি পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। তখন হেমন্ত কালের শেষ ভাগ চলছে, ইতোমধ্যে পাহাড়ের উপর থেকে হাড় বিদ্ধকারী শীতল বায়ুপ্রবাহ শুরু হয়েছে। ঐ দিন রাতে, হয়তো আক্রমণের অভিঘাতের কারণে আমার স্ত্রী একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে।
এতো দুর্যোগের মধ্যেও ঈশ্বর তোমাদের উপর করুণা বর্ষণ করলেন তাহলে…
গিয়াস বেগের হাড্ডিসার মুখটিতে অটুট গাম্ভীর্য বিরাজ করছে। আমরা বিপুল আনন্দের সঙ্গে তার নাম রাখলাম মেহেরুন্নিসা যার অর্থ নারীদের মধ্যস্থিত সূর্য, কারণ তার জন্মের পর পর আমাদের আধার জীবন যেনো আলোকিত হয়ে উঠলো। কিন্তু আমাদের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পরদিন সকালে শীতল ভোরের আলোতে আমি প্রতিকূল বাস্তবতার মুখোমুখী হলাম। আমাদের পেটে খাবার নেই এবং সাহায্য করার মতো আশেপাশে কোনো মানুষজনও নেই। নবজাত শিশুটিকে হয়তো বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আমি আমার প্রায় অচেতন স্ত্রীর কোল থেকে মেহেরুন্নিসাকে নিলাম এবং বিশাল একটি গাছের শিকড়ে সৃষ্ট ফাটলের মধ্যে তাকে রাখলাম। প্রার্থনা করলোম শিয়াল বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী তাকে আবিষ্কার করার আগেই যেনো সে ঠাণ্ডায় মারা যায়। আমি এও স্বীকার করছি, তখন একবার আমার মনে হয়েছিলো তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করি। কিন্তু সেটা মহাপাপ হবে। আমি ধীরে সেখান থেকে সরে আসলাম, আমার কন্যার অস্পষ্ট কান্নার শব্দ তখনো আমার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো।
