বলুন শেখ আহমেদ, আপনি আমাকে কি বলতে চান?
শেখ আহমেদের হাত তার বুক স্পর্শ করলো কিন্তু আকবরের উপর নিবদ্ধ তার দৃষ্টিতে কোনো রকম বিনয় প্রকাশ পেলো না। জাহাপনা, সোজাভাবে কথা বলার সময় উপস্থিত হয়েছে, আপনার আরো স্ত্রী গ্রহণ কারার পরিকল্পনাটি ঈশ্বরের বিরোধীতার সমতুল্য।
আকবর সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। সাবধানে কথা বলুন।
কোরানে যা লেখা রয়েছে আপনি তা অমান্য করছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে বহুবার আলোচনা করেছি, কিন্তু আপনি কর্ণপাত করেননি। ফলে আমি সবার সামনে এ বিষয়ে বক্তব্য উত্থাপনে বাধ্য হয়েছি। এখনো যদি আপনি আমার বক্তব্যের প্রতি গুরুত্ব না দেন তাহলে আমি আগামী শুক্রবারের জুম্মার সময় মসজিদের বেদী থেকে আমার বক্তব্য প্রচার করবো। শেখের মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠেছে এবং আকবরের নীরবতা তাকে আরো উৎসাহী করে তুললো। হৃষ্টপুষ্ট দেহটিকে সবলে খাড়া করে তিনি তার সহকর্মীদের দিকে বিজয়ীর দৃষ্টিতে এক পলক চাইলেন। কোরানে উল্লেখ রয়েছে কোনো পুরুষ কেবল চারটি বিয়ে করতে পারে। কিন্তু আমি শুনেছি আপনি আরো অনেক স্ত্রী গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তাঁদের অনেকে মুসলমান নয়। আপনি যদি এই পরিকল্পনা থেকে বিরত না হোন, তাহলে ঈশ্বর আপনাকে এবং আমাদের সমগ্র সাম্রাজ্যকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
ইতোমধ্যেই আমার দুজন হিন্দু স্ত্রী রয়েছে, আপনি সেটা ভালো করেই জানেন। তারা আমাকে সন্তানও উপহার দিয়েছে। আপনি কি আমাকে তাঁদের পরিত্যাগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন?
শেখ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, তারা আপনার রক্ষিতার মর্যাদা পেতে পারে জাহাপনা। অবশ্য তাঁদের সন্তানেরা যুবরাজের মর্যাদাই উপভোগ করতে পারে। অতীতে বহু যুবরাজের জন্ম রক্ষিতাঁদের গর্ভে হয়েছে…যেমন আপনার নিজ পিতামহের ভাই…
আকবর মাওলানার দিকে তাকালেন, ভাবছেন তলোয়ারের এক কোপে তার মাংসল গলা থেকে মাথাটা আলাদা করে দিলে কেমন হয়? কিন্তু তার মনে হলো ধর থেকে মাথাটা আলাদা হওয়ার পরও হয়তো সেটা বকবক করতে থাকবে।
শেখ আহমেদ, আমি আপনার বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করেছি। এখন আমার মতামত শুনুন। আমি সম্রাট। আমার সাম্রাজ্য এবং প্রজাদের জন্য কি মঙ্গল জনক সে ব্যাপারে আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নেবো। এ বিষয়ে আপনার হস্তক্ষেপ আমি বরদাস্ত করবো না।
শেখ আহমেদ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকলো তবে কোনো মন্তব্য করলো না। আকবর ওলামাদের বিদায় করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেই মুহূর্তে আবুল ফজলের পিতা শেখ মোবারক কিছু বলার জন্য এগিয়ে এলেন। আকবর তাকে এর আগে লক্ষ্য করেননি।
জাহাপনা, দয়া করে আমাকে যদি কথা বলার অনুমতি দেন তাহলে আমি এই সমস্যা সমাধানের বিষয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করতে পারি।
খুব ভালো, বলুন কি বলতে চান।
শেখ আহমেদ এর মতো আমিও একজন সুন্নী মুসলমান, কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ আমি আমাদের শিয়া ভাইদের ধর্মীয় আচার আচরণ সম্পর্কে গবেষণা করেছি। এর ফলে আমি জানতে পেরেছি তারাও আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কে অনুসরণ করে এবং কিছু মতাদর্শগত পার্থক্যের জন্য তাদেরকে আমাদের শত্রু ভাবা উচিত নয়।
আপনার বক্তব্য যথেষ্ট বিচক্ষণতা সম্পন্ন কিন্তু এর সঙ্গে আজকের সভার আলোচ্য বিষয়ের সম্পর্ক কি?
সম্পর্ক আছে জাঁহাপনা। শিয়ারা বিশ্বাস করে কোরান আরেক ধরনের অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাপূর্ণ বিবাহ অনুমোদন করে। একে মুতা বলা হয়। এই নিয়মে কোনো পুরুষ যে কোনো সংখ্যক নারীকে মুতা করতে পারে তাদের ধর্ম যাই হোক না কেনো এবং এর জন্য কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না।
সেটা অধর্ম…কোনো ঈমাণদার ব্যক্তি এমন পন্থা অনুসরণ করতে পারে না, ক্রোধে মাথা নাড়তে নাড়তে শেখ আহমেদ মন্তব্য করলেন।
হয়তো এটা অধর্ম নয়। আমি এ বিষয়ে কোরানের একটি নির্দিষ্ট আয়াত দেখাতে পারি যাতে এই মুতা বিবাহের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পারস্যে বহু লোক এই প্রথা অনুসরণ করে।
হা পথভ্রষ্ট দেশের ধর্মদ্রোহিদাপূর্ণ প্রথা আমদের দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। আমি শুনেছি আমাদের সাম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত অবকাশযাপন কেন্দ্রের মালিকরা সওদাগরদের প্রলুব্ধ করতে এক রাতের জন্য তাদের মুতা স্ত্রী প্রদান করে। এটা পতিতাবৃত্তিকে জায়েজ করার একটা ঘৃণ্য কৌশল ছাড়া কিছু নয়!
শেখ আহমেদ তার ক্রোধান্বিত বক্তব্য অব্যাহত রাখলো কিন্তু আকবর তার কথা আর শুনছিলেন না। শেখ মোবারক এর প্রস্তাব বেশ আকর্ষণীয় এবং তিনি এ বিষয়ে আরো জানতে চান। কোরান যদি সত্যিই পুরুষের বহু বিবাহে স্বীকৃতি দেয় তাহলে তা ওলামাবৃন্দের গোড়া সদস্যদের মোকাবেলায় কাজে লাগবে। কিন্তু মোবারকের বক্তব্য আকবরের মনের একটি গভীর তারে ঝংঙ্কার তুললো। সাধুগণ, সুন্নী মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান- এরা সকলে কি একই মৌলিক সত্যের সন্ধান করছে না-এই অনিশ্চিত পৃথিবীতে কিছুটা নিশ্চয়তার ছায়া কি তারা সকলেই খুঁজছে না? যে সব আনুষ্ঠানিকতা তারা চালু করেছে, যে সব নীতি তারা অনুসরণ করে এর সবই তো মানুষের তৈরি। এই সব বিষয়কে অপসারণ করা হলে যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো মানুষের ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা এবং উত্তম ভাবে জীবন যাপন করার প্রয়াস।
