হয়তো হীরাবাঈ ইচ্ছাকৃতভাবে আকবরের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে সেলিমের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে, ছেলেটি তার সঙ্গে তার মায়ের মতোই আচরণ করছে। সেলিম অনেক খোলামেলা এবং সহজ সরল ছিলো যেমনটা এখন আর নেই। বিষয়টি নিয়ে এখন যখন আকবর বলেন, তিনি উপলব্ধি করলেন কেবল আজই যে ছেলেটি তার উপস্থিতিতে বিব্রত এবং জড়তার ভাব প্রদর্শন করলো তা নয়। আকবরের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। হীরাবাঈ তার নিজের পছন্দ মতো জীবন যাপন করুক কিন্তু তাকে তার পুত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে দেয়া যাবে না। তবে তিনি হীরাবাঈ এর সঙ্গে সেলিমের দেখা সাক্ষাৎ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে চান না। কিন্তু তাদের সাক্ষাতের সময় তিনি সংক্ষিপ্ত করবেন এবং তারা দুজনে যাতে সম্পূর্ণ নিভৃতে সময় না কাটায় সে ব্যবস্থা করবেন।
.
১৪. নারী জগতের সূর্য
জীবন ভালোই কাটছে। সামনে পিছনে নড়তে থাকা রেশমের টানাপাখার নিচে অবস্থিত বিছানায় আকবর নগ্নদেহে শুয়ে আছেন, তার চোখ বন্ধ। কক্ষের মধ্যে অবস্থিত ছোট আকৃতির ফোয়ারা থেকে জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ তার কানে আসছে। জনালা দিয়ে বয়ে আসা উষ্ণ ও শুষ্ক মরু হাওয়াকে কিছুটা ঠাণ্ডা করার জন্য জানালা ঘিরে স্থাপন করা হয়েছে সুগন্ধযুক্ত কাশ ঘাস।
বিগত কয়েক ঘন্টা তিনি দিল্লী থেকে আগত এক সুন্দরী বাঈজীর কোমল স্পর্শে কাটিয়েছেন যার দীর্ঘ, জেসমিনের ঘ্রাণযুক্ত চুল নিতম্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। যদিও আকবরের বয়স এখন তিরিশ এবং চল্লিশের মাঝামাঝি তবুও তার যৌন ক্ষমতা এখনো যে কোনো তরুণ বয়সের পুরুষের তুলনায় কম নয়। এই জন্য তিনি তাঁর নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন। স্পষ্টতই তার জন্য হেকিমের কাম-উদ্দীপক দাওয়াই এর প্রয়োজন ছিলো না যার নাম অশ্ব বীর্য শক্তি- এটি বিভিন্ন উপদানের মিশ্রণে তৈরি গাঢ় সবুজ বর্ণের একটি দুর্গন্ধযুক্ত তরল, ধারণা করা হয় যা পান করলে একজন কাহিল মানুষ একটি স্ট্যালিয়ন ঘোড়ার মতো যৌন শক্তি লাভ করতে পারে। হেরেমে এমন গুজব প্রচলিত ছিলো যে, রাজসভার কিছু বয়স্ক সদস্য এই দাওয়াই এর প্রতি আসক্ত। তবে আকবর আনন্দ লাভের নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করতে পছন্দ করেন। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর রক্ষিতাঁদের আদেশ করেন শতাব্দী প্রাচীন হিন্দু কামসূত্রের গ্রন্থ থেকে তাঁকে পড়ে শোনাতে। এতে রতিকর্মের বহু বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে। অনেক বছর আগে বালক অবস্থায় মায়ালার সঙ্গে তাঁর যে সব অভিজ্ঞতা হয়েছিলো সেগুলি মনে পড়ে যাওয়ার তিনি হাসলেন। তিনি তখন কল্পনাও করেন নি যে একদিন তার হেরেম এতো বিশাল আকৃতি ধারণ করবে।
হঠাৎ একটি সভা সম্পর্কিত চিন্তার কারণে তাঁর যৌনকর্ম পরবর্তী তৃপ্তি ও অবসাদে ভাটা পড়লো। একটু পরেই তাকে দেওয়ান-ই-খাস এ যেতে হবে ওলামাবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। ওলামারা কি বলতে চায় সে সম্পর্কে জওহর তাঁকে আগেই সতর্ক করেছে। তারা তার আরো স্ত্রী গ্রহণ করার বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে চায়, কারণ কিছুদনি আগে দক্ষিণ দিকের এক জায়গিরদারের কন্যাকে বিয়ে করার পর তার স্ত্রীর সংখ্যা চারজন পূরণ হয়েছে, সুন্নী মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বেশি সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণ করা ধর্ম দ্বারা স্বীকৃত নয়। আকবর উঠে বসলেন। তিনি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ সহ্য করবেন না। সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং এর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার মূলনীতি হিসেবে তিনি এই রাজবংশীয় বিবাহের প্রথা অনুসরণ করছেন এবং এতে ফলও পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে তিনি একশ কিম্বা দুইশ স্ত্রী গ্রহণ করবেন, তারা রাজপুত রাজকন্যা হতে পারে, হতে পারে প্রাচীন মোগল গোত্রের কোনো নারী অথবা সম্ভ্রান্ত হিন্দুস্তানী মুসলমান সাদামাটা অথবা সুন্দরী।
অবশ্য তাঁর পিতার জীবন অন্যরকম ছিলো। হুমায়ূন তার হৃদয় ও মনের প্রতিফলন একটি মাত্র নারীর মাঝেই দেখতে পেয়েছিলেন- তিনি হলেন হামিদা। মাঝে মাঝে আকবরের মনে হয়েছে তিনিও একজন নারীর প্রতি অনুরূপ ভালোবাসা অনুভব করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তেমনটা এখনো ঘটেনি এবং ভবিষ্যতে ঘটবে বলেও মনে হয় না। তাঁর এই বিবাহ গুলিরে ফলে একদিকে যেমন কৌশলগত ভাবে মিত্ৰতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তিনি ব্যাপক বৈচিত্রময় যৌন অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া তাঁর হেরেমে বর্তমানে তিনশো এর বেশি রক্ষিতা রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই তাঁদের ঈর্ষা করবে। মনে মনে বাঈজীটির সুগন্ধী তেল মাখা নমনীয় দেহটির কথা আরেকবার কল্পনা করে তিনি গোমড়ামুখী ওলামাদের চিন্তা ঠেলে সরিয়ে দিলেন।
দুই ঘন্টা পড়ে রাজকীয় পোষাকে সুসজ্জিত আকবর তার দেওয়ান-ই-খাস এর সিংহাসনে আসন গ্রহণ করলেন। আবুল ফজল এবং তার ঝুঁকে পড়া দেহের অধিকারী বৃদ্ধ উজির জওহর সিংহাসনের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। অপর একটি বারান্দায় ওলামা দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছে। শেখ আহমেদ অন্যদের তুলনায় কিছুটা সামনে রয়েছে, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে তিনি আশা করছেন তাকে সেতু পথ ধরে আকবরের কাছে এগিয়ে আসতে বলা হবে। কিন্তু আকবর তাকে ইশারা করলেন যেখানে আছে সেখানেই থাকতে।
