আমি আপনাদের এই উপহারটি অনুবাদের ব্যবস্থা করছি এবং যখনই এর প্রাথমিক পাতাগুলি অনুবাদ করা সম্পন্ন হবে তখন আপনাদের সঙ্গে আবার আলাপ করবো। আমি আশা করছি ততোদিন আমার অতিথি হিসেবে এখানে অবস্থান করতে আপনারা আপত্তি করবেন না, আকবর এক মুহূর্ত পর বললেন।
আপনার আতিথ্য গ্রহণ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক হবে জাহাপনা। আমাদের ত্রাণকর্তার মহিমান্বিত আলো আপনার উপর বর্ষিত হওয়ার পথে আমরা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাই না। ফাদার ফ্রান্সিসকো যখন কথাগুলি বললেন তখন তার গাঢ় চোখগুলি দীপ্তিময় হয়ে উঠলো এবং তার সমগ্র মুখমণ্ডল গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হলো। পুরোহিত দুজন যখন প্রস্থান করছিলো তখন আকবরের মনে হলো, যে ব্যক্তি একসময় ইসলামের অনুসারী ছিলো কিন্তু পড়ে সেই পথ থেকে সরে গেছে তার সঙ্গে ধর্ম বিষয়ক তর্ক নিশ্চয়ই খুব জমে উঠবে। আর তথাকথিত গসপেল এ লেখা বিষয়গুলিও নিশ্চয়ই অভিনব হবে তার জন্য। ফাদার ফ্রান্সিসকোর কথা থেকে মনে হয়েছে এর ভাষা বেশ জটিল এবং রহস্যময় হবে। এর থেকে কি সত্যিই নতুন কোনো সত্য উঘাটিত হবে? এবং কে ছিলেন তাঁদের এই ত্রাণকর্তা? কীভাবে তার মাঝে ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটেছিলো? এ সব বিষয় জানার জন্য তিনি অধৈর্য বোধ করলেন।
তিনি আরো উৎসুক হলেন জানার জন্য যে তাঁদের বিষয়ে সেলিম এর অনুভূতি কি। তিনি একজন পরিচারককে আদেশ দিলেন সেলিমকে তার ব্যক্তিগত কক্ষে নিয়ে আসার জন্য। আধ ঘন্টা পরের ঘটনা। আকবর তার সন্তানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি দেখলাম তুমি খ্রিস্টান পুরোহিতদের কথা শুনছিলে। তাদেরকে তোমার কেমন মনে হয়েছে?
তারা দেখতে অদ্ভূত।
সেটা কেমন? তাঁদের পোক?
হা, কিন্তু তারচেয়েও বেশি…তাদের চেহারার ভাব…মনে হচ্ছিলো তারা যেনো কিছুর জন্য তীব্র আকাক্ষা অনুভব করছে।
তোমার অনুমান সঠিক। তারা মনে করছে তারা আমাদেরকে খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলবে।
আমি শুনেছি আমাদের একজন মাওলানা তাদেরকে বিদেশী বিধর্মী বলেছে এবং এও বলেছে যে তোমার উচিত হয়নি ওদের আমন্ত্রণ জানানো।
তোমার নিজের কি মনে হয়েছে?
সেলিমকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হলো। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
তোমার কি মনে হয় না অন্য মানুষদের বিশ্বাস সম্পর্কে যতদূর সম্ভব জানার চেষ্টা করা উচিত? তাছাড়া তুমি কীভাবে প্রমাণ করবে যে তারা ভুল করছে, যদি তুমি না জানো তারা কি চিন্তা করে?
এবার সেলিম আর কিছু বললো না, বারং অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো।
একজন শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী সম্রাটের তাদের ভয় করার কোনো কারণ নেই যারা ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাস করে, আছে কি? এ বিষয়ে চিন্তা করো সেলিম। তোমার নিজের পড়াশোনা কি তোমাকে তোমার সীমাবদ্ধ গণ্ডির বাইরের বিষয়ের প্রতি কৌতূহলী করে তুলে না?
সেলিম দরজার দিকে তাকালো, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে চাইছে এই সাক্ষাতকার এখনই সমাপ্ত হোক এবং আকবর তার আচরণে কিছুটা অসহিষ্ণু বোধ করলেন। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের কাছে আরো বেশি কিছু আশা করেছিলেন। যদিও সেলিমের বয়স অল্প তবুও তার বয়সে তিনি অনেক বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন করতে পারতেন। তোমার নিজস্ব মতামত থাকা উচিত, আকবর চাপ দিলেন। তাছাড়া তুমি একাই কেনো পুরোহিতদের দেখতে এলে? আমি তো তোমার অন্য ভাইদের সেখানে দেখিনি।
আমি জানতে চেয়েছিলাম খ্রিস্টান পুরোহিতরা দেখতে কেমন…আমি তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প শুনেছি। আমার একজন শিক্ষককে এক লোক একটি চিঠি পাঠিয়েছে যার সাথে এই পুরোহিতদের দিল্লীতে দেখা হয়েছিলো। এই চিঠিতে লেখা আছে খ্রিস্টানরা কাঠের ক্রুশবিদ্ধ এক ব্যক্তির উপাসনা করে এবং চিঠিটা এখন আমার কাছে। সেলিম তার কমলা বর্ণের জোব্বার ভিতর হাত ঢুকিয়ে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে আনলো। এর মধ্যে কুশটির একটি চিত্র রয়েছে, কিন্তু দেখ চিঠিটিতে কি লেখা রয়েছে বাবা-বিশেষ করে শেষ লাইন গুলিতে, কীভাবে খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে।
আকবর তাঁর পুত্রের বাড়িয়ে দেয়া হাতে ধরা চিঠিটির দিকে তাকালেন। সেলিম অবশ্যই জানে যে তিনি পড়তে পারেন না…ধীরে তিনি চিঠিটা নিয়ে এর ভাঁজ খুললেন। কাগজটির শীর্ষে ক্রুশবিদ্ধ এক কঙ্কালসার ব্যক্তির চিত্র অঙ্কিত রয়েছে, তার চেহারা যন্ত্রণা কাতর এবং মাথা নিচের দিকে ঝুলে রয়েছে। চিত্রটির নিচে ঘন ভাবে কিছু লেখা রয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই যা তাঁর কাছে অর্থহীন। এটা আমার কাছে থাক পরে দেখবো, আকবর বললেন, কিন্তু তার কণ্ঠে প্রকাশিত হয়ে পড়া ক্রোধ দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলেন। তুমি এখন যেতে পারো।
তাঁর পুত্র কি তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রস্তুত করতে চেয়েছে? সেলিম প্রস্থান করার পর নিজ কক্ষে পায়চারি করতে করতে আকবর ভাবতে লাগলেন। নিশ্চয়ই না। সে এমনটা কেনো করবে? কিন্তু সেই মুহূর্তে হীরাবাঈ এর গর্বিত অনমনীয় মুখটি তাঁর মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। সে কি সেলিমকে তাঁকে ঘৃণা করার জন্য উৎসাহ প্রদান করছে, যেমনটা সে নিজে করে? তিনি সেলিমের শিক্ষককে প্রশ্ন করে জানতে পেরেছেন ইদানিং সে তার মায়ের সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে। হীরাবাঈ তার ভাই ভগবান দাশ বা ভাগ্নে মানসিং এর সঙ্গে দেখা করে না তারা যখন রাজপ্রসাদে বেড়াতে আসে। সে কোনো আনন্দ আয়োজন বা দাওয়াতেও অংশ গ্রহণ করে না নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে রাখে। অধিকাংশ সময় অধ্যয়ন করে বা গেলোই করে সময় কাটায় এবং তার হিন্দু দেবতাদের পূজা করে। প্রতি মাসে পূর্ণিমার সময় সে ছাদের চাতালে গিয়ে স্বর্গের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং প্রার্থনা করে।
