আকবর মাথা ঝাঁকালেন, যেনো তিনি তার মায়ের সকল উপদেশ মেনে নিয়েছেন, কিন্তু অন্তরে তিনি অত্যন্ত অসন্তোষ বোধ করলেন। কীভাবে সবকিছু পরিচালনা করতে হবে কিম্বা কেমন আচরণ করতে হবে সে বিষয়ে এতো উপদেশ তার প্রয়োজন ছিলো না। তাঁর সন্তানদের প্রতি কেমন আচরণ করতে হবে তার ফিরিস্তি আরো বেশি অপ্রয়োজনীয়।
*
জাহাপনা, আপনি যে খ্রিস্টান যাজকদের গোয়া থেকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তারা এসেছে।
ধন্যবাদ জওহর, আমি শীঘ্রই আসছি। আকবর আবুল ফজলের দিকে ফিরলেন, তিনি তাকে রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত তার নতুন সংস্কার সম্পর্কে অবগত করছিলেন। আমরা পরে আবার শুরু করবো। যা বললোম তার বিস্তারিত বর্ণনা ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করবে।
নিশ্চয়ই জাহাপনা। আপনার পরবর্তী প্রজন্ম আপনার প্রসারণশীল সাম্রাজ্যের চমৎকার প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলি থেকে অনেক মূল্যবান শিক্ষা লাভ করবে।
আকবর সংক্ষেপে হাসলেন। আবুল ফজলকে তার ঘটনাপঞ্জিকার হিসেবে নিয়োগদানের পর দীর্ঘ সময় ধরে মাঝে মাঝে তার অতিরঞ্জিত এবং বর্ণাঢ্য লেখনির প্রয়াস তাঁর কাছে গা সওয়া হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে এসো। আমি চাই তুমি এই অদ্ভুত প্রাণী গুলিকে দেখো। আমি শুনেছি তাঁদের কেউ কেউ মাথার তালুতে বৃত্তাকার সামান্য চুল রেখে বাকি অংশ কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে থাকে।
আমিও তাঁদের সম্পর্কে কৌতূহলী জাঁহাপনা। আমি শুনেছি তাঁদের স্বজাতীয়রা তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, এমনকি তাদেরকে সম্ভবত ভয়ও পায়। গোস্তাকি মাফ করবেন জাঁহাপনা, আমি কি জানতে পারি আপনি কেনো ওদেরকে আপনার সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন?
আমি ওদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আমার হিন্দু প্রজাদের ধর্ম সম্পর্কে আমি বর্তমানে সামান্য কিছু জানি। কিন্তু তাঁদের ঈশ্বর সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না, কেবল শুনেছি তারা বিশ্বাস করে তাঁদের ঈশ্বর এক সময় একজন মানুষ ছিলেন, যাকে হত্যা করার পর সে আবার জীবন ফিরে পেয়েছিলো।
তারা তাহলে আমাদের মতোই একজন ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে?
সেরকমই মনে হচ্ছে কেবল এমন বিশ্বাস ছাড়া যে তাঁদের এই ঈশ্বর তিনটি রূপে আবির্ভূত হয়েছেন-তারা তাদের ডাকে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা নামে। হয়তো তাদের এই বিশ্বাসের সঙ্গে হিন্দুদের ত্রিত্ববাদ- বিষ্ণু, শিব এবং ব্রহ্মার মিল রয়েছে।
বিশ মিনিট পর, হীরকশোভিত পাগড়ি পরিহিত আকবর তার দেওয়ান-ই খাস এর বেদীর মতো ঝুল বরান্দার সিংহাসনে আসন গ্রহণ করলেন। নিচে তাঁর রাজসভার সদস্যগণ জামায়েত হয়েছেন। আকবর খেয়াল করলেন তাঁদের পেছন দিকে সেলিম দাঁড়িয়ে আছে। ভালোই হলো ছেলেটি এখানে উপস্থিত রয়েছে। সে ইউরোপীয় কোনো লোক আগে দেখেনি।
অতিথিদের আমার সামনে হাজির করো, আকবর তার পাশে দাঁড়ানো কোর্চিকে আদেশ দিলেন। কয়েক মুহূর্ত পর বাদকদের গ্যালারিতে বেজে উঠা ঢাকের শব্দের সাথে তরুণ কোৰ্চিটি আকবরের দিকে প্রসারিত ঝুলন্ত সেতু দিয়ে অতিথি যাজকদের পথ দেখিয়ে অগ্রসর হলো। প্রায় মেঝে স্পর্শকরা জোব্বা পরিহিত যাজক দুজন আকবরের কাছ থেকে বারো গজ দূরে থাকতে পরিচারকটি তাদের থামতে ইশারা করলো। আকবর লক্ষ্য করলেন তাঁদের একজন বেটে আকারের তবে মজবুত গড়নের অধিকারী। অন্য জন বেশ লম্বা ও ফ্যাকাশে বর্ণের এবং তার ন্যাড়া মাথা রোদে পুড়ে গাঢ়বর্ণ ধারণ করেছে। আকবর তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দোভাষীকে কাছে ডাকলেন। তাদের বলল আমি তাদেরকে আমার রাজসভায় স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু দোভাষী কিছু বলতে পারার আগেই বেটে যাজকটি আকবরকে সরাসরি বিশুদ্ধ ফার্সী ভাষায় সম্বোধন করলো।
ফতেহপুর শিক্রিতে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আপনি সে সৌজন্য প্রদর্শন করেছেন সে জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা জেসুইট পুরোহিত। আমার নাম ফাদার ফ্রান্সিসকো হেনরিকস। আমি জন্মগতভাবে পারসিক এবং এক সময় ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলাম। কিন্তু এখন আমি খ্রিস্টান। আমার এই সঙ্গীটি হলেন ফাদার এ্যান্টোনিও মোনসেরেট।
আমার আমন্ত্রণ পত্রের উত্তরে আপনি জানিয়েছিলেন আপনি আমার কাছে কিছু সত্য উন্মোচন করতে চান। সেগুলি কি বলুন।
ফাদার ফ্রান্সিসকোকে গম্ভীর দেখালো। সেগুলি ব্যাখ্যা করতে বহু ঘন্টা সময় প্রয়োজন হবে জাঁহাপনা এবং আপনি হয়তো ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু আমরা আপনার জন্য একটি উপহার বয়ে এনেছি-ল্যাটিন ভাষায় লেখা আমাদের খ্রিস্টান গসপেল, ল্যাটিন আমাদের গির্জার ভাষা। আমরা জানি আপনার রাজসভায় অনেক বিদ্বান ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ এটি অনুবাদ করে দিলে আপনি নিজেই তা পড়তে পারবেন। আপনি যখন জানবেন আমাদের গসপেল গুলিতে কি লেখা রয়েছে তখন হয়তো আবার আমরা আপনার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পাব।
কিছু বিষয়ে তারা যথেষ্ট তথ্য রাখে, আকবর ভাবলেন। এটি সত্য যে তিনি কিছু বিদ্বান ব্যক্তিকে নিযুক্ত করছেন-তাঁদের মধ্যে কয়েকজন তৈমুর বংশীয় ঘটনাপঞ্জি তুর্কী ভাষা থেকে ফারসী ভাষায় অনুবাদ করছে, অন্যরা হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলি মূল সংস্কৃত ভাষা থেকে ফারসী ভাষায় অনুবাদ করছে। কিন্তু স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে অতিথি পুরোহিতরা জানে না যে তিনি নিজে পড়তে পারেন না। শাহ দাউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানের সময় দীর্ঘ নৌযাত্রার বর্ষণমুখর ঘন্টাগুলিতে আহমেদ খান তাঁকে পড়া শেখাতে চেষ্টা করেছেন এবং যুদ্ধ থেকে ফেরার পরের সময় থেকে তিনি নিজে পড়তে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শৈশবের মতোই লেখা গুলি তার চোখের সামনে নাচানাচি করেছে এবং তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এর থেকে সৃষ্ট হতাশা তাঁর পুস্তকের জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে জানার আকাঙ্ক্ষা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি সর্বদাই একজন বিদ্বান ব্যক্তিকে কাছে রাখছিলেন বিভিন্ন বই পড়ে শোনানোর জন্য এবং পুস্তকের একটি বিশাল সংগ্রশালা তৈরি করছিলেন যা তার পূর্বপুরুষ কর্তৃক সমরকন্দ ও হেরাতে তৈরি করা পাঠাগারের তুলনায় অধিক সমৃদ্ধ।
