হ্যাঁ, গুলবদন মুখ খুললেন, তোমার চাচারা যখন তোমাকে বন্দী করেছিলো তখন দুই বার আমি যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা অতিক্রম করে তদের সঙ্গে আপোষ আলোচনা করতে গিয়েছিলাম…কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকা যে কোনো মোগল যোদ্ধার মতোই আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি এবং সেজন্য পরিতৃপ্তিও অনুভব করেছি।
তোমাদের এ কারণে খুশি হওয়া উচিত যে সেই সব দুঃসময় অতিক্রান্ত হয়েছে…আমরা আর পূর্বের মতো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডহীন যাযাবর নই। বর্তমানে আমি একজন শক্তিশালী শাসক-একজন সম্রাট। তোমাদের মর্যাদা এবং লিঙ্গ অনুযায়ী যাবতীয় রাজনৈতিক দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত রেখে আমি যদি তোমাদের বিলাসী জীবনের স্বাদ দিতে না পারি তাহলে সেটা আমার জন্য অসম্মানজনক হবে।
আমাদের মর্যাদা? আমি একজন খানিম, চিবুক উঁচিয়ে গুলবদন বললেন, আমি চেঙ্গিস খানের বংশধর যাকে সবাই বলতো সমুদ্রযোদ্ধা কারণ তার অধিকৃত ভূখণ্ড এক সময় এক সাগর থেকে অন্য সাগরে বিস্তৃত ছিলো। তার এবং তৈমুরের রক্ত আমার শিরায় প্রবাহিত যার দ্বারা আমি সবল। আমার মনে হচ্ছে তুমি এই বাস্তবতা ভুলে গেছো আকবর। গুলবদনের কণ্ঠস্বর শান্ত শোনালো।
তোমরা যেসব প্রতিকূলতা সহ্য করেছে সে সম্পর্কে আমি জানি, কারণ তোমরা সেসব গল্প বিভিন্ন সময় আমাকে শুনিয়েছে-কীভাবে তোমরা বরফ ঢাকা পার্বত্য এলাকা এবং উষ্ণ মরুভূমি পেরিয়েছে, খাদ্যের অভাবে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে। আমি তোমাদের সাহসকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমার মনে হয়েছে তোমরা আর সেরকম ঝুঁকিপূর্ণ জীবন চাওনা।
আমাদের জন্য কি ভালো বা আমরা কি চাই সে সম্পর্কে অনুমান করার পরিবর্তে তুমি আমাদের সরাসরি জিজ্ঞাসা করোনা কেনো? আমরা আশা করি তুমি আমাদের প্রতি তেমন ব্যবহার করো যা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য- তোমার কাছ থেকে আমরা শিশুর মতো প্রশ্রয় বা খেলনার উপকরণ আশা করি না আমাদের আনন্দের জন্য। সবাই তোমার রক্ষিতাঁদের মতো আমোদ আহ্লাদ আর দামী উপহার পেয়ে সন্তুষ্ট এবং প্রশ্নহীন থাকবে এমনটা কেনো তুমি মনে করছ। আমাদের জীবন যাপনের নিজস্ব রীতি রয়েছে, হামিদা উত্তর দিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আকবরের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তার কাঁধে হাত রাখলেন। গতকাল আমি আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম- সে তোমার এক সেনাপতির স্ত্রী যে পশ্চিম দিকের প্রবেশ দ্বারের কাছে থাকে। এই জন্য আমি বেশ কিছু সংখ্যক পরিচারিকাকে নিয়ে আমার প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হেরেমের দ্বারে উপস্থিত হই, কিন্তু দায়িত্ব পালনরত রক্ষীরা আমাকে জানায় যে কারো বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই…একমাত্র খাজানসারার অনুমতি ব্যতীত তারা দরজা খুলতে পারবে না। তুমি যদি মনে করো এ ধরনের অচরণ আমাদের উপকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, তাহলে তুমি ভুল করছে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। যদিও তুমি সম্রাট আকবর, কিন্তু তুমি আমার পুত্রও এবং আমি তোমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে এ ধরনের ব্যবহার আমার পক্ষে মেনে নেয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
দুঃখিত মা, আমি বুঝতে পারিনি…আমি এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি আর যাতে না ঘটে সে জন্য চিন্তাভাবনা করবো।
না, তার দরকার নেই। তুমি খাজানসারা, রক্ষীদের অধিনায়ক এবং খোঁজাদের প্রধানকে জানাবে এখন থেকে আমার অর্থাৎ সম্রাটের মায়ের আদেশে হেরেমের সবকিছু চলবে। আমি এবং তোমার ফুফু যখন খুশি হেরেমের বাইরে যাব অথবা ভিতরে প্রবেশ করবো কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। হামিদা আকবরের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। এবং তুমি যখন কোনো যুদ্ধাভিযান বা রাজকীয় সফরে বের হবে তখন ইচ্ছা হলে আমরা তোমার সঙ্গে যাবো, অবশ্যই আমরা অবস্থান করবো যথোপযুক্ত পর্দার আড়ালে। এবং জালির আড়ালে উপস্থিত থেকে পরিষদমণ্ডলী সভার কার্যবিধি শ্রবণ করবো যা সর্বদাই আমদের গোত্রের রীতি ছিলো…এবং পরে আমাদের যদি কোনো পরামর্শ থাকে তা তোমাকে জানাবো।
হামিদা থামলেন এবং আকবরকে পর্যবেক্ষণ করলেন। তুমি তোমার ক্ষমতা এবং জাঁক-জমকের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছ- সমগ্র জগৎ তোমাকে কোনো দৃষ্টিতে দেখছে সে বিষয়েই তোমার চিন্তা কেন্দ্রীভূত। তোমার জীবনে সাফল্য খুব সহজেই এসেছে আকবর- তোমার বাবা বা পিতামহের তুলনায় অনেক বেশি অনায়াসে। এর চমাকারিত্বের কারণে তোমার কাছের মানুষদের অনুভূতির প্রতি অন্ধ হওয়া থেকে নিজেকে বিরত করো। যদি তা না পারো, তাহলে একজন মানুষ হিসেবে এবং সম্রাট হিসেবে তুমি ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তুমি অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমাকে বিচার করছে। আমি তোমাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি মা, এবং ফুফু তোমাকেও। আমি জানি, তোমাদের সাহায্য ছাড়া আমি কখনোই সম্রাট হতে পারতাম না এবং সেইজন্য আমি কৃতজ্ঞও।
তাহলে তোমার আচরণ দ্বারা তা প্রমাণ করো, শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয় বরং অন্য যারা তোমার কাছের মানুষ তাদের জন্যেও, যেমন তোমার পুত্ররা। যুদ্ধের কারণে বহু মাস ধরে তুমি ওদের কাছ থেকে দূরে ছিলে। এখন যেহেতু তুমি ফিরে এসেছো তাই ওদেরকে তোমার আরো বেশি সময় দেয়া উচিত। তাদেরকে আরো নিবিঢ় ভাবে বোঝার চেষ্টা করো, অধিকাংশ সময় তাদের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে না রেখে।
