যতোক্ষণ পর্যন্ত না ভোরের উজ্জ্বল সূর্য নিচের পাথুরে মরুভূমিতে উত্তাপ বিকিরণ আরম্ভ করে তিনি সাম্রাজ্য, যুদ্ধজয়, প্রজাবৎসল্য ইত্যাদি সবকিছু ভুলে হেরেমে প্রবেশ করতে পারেন। ফতেহপুর শিক্রিতে নির্মিত সকল ভবনের মধ্যে তাঁর মা, ফুফু, স্ত্রী এবং রক্ষিতাদের জন্য নির্মিত পাঁচমহলই তাকে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট করেছে।
হেরেমের প্রধান প্রবেশ পথটি ধনুকাকৃতির এবং বালুপাথর দ্বারা নির্মিত। এর পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে অভিজাত রাজপুত রক্ষীরা। এর অভ্যন্তরে মহিলাদের পরিচর্যায় নিয়োজিত করা হয়েছে খোঁজাদের- আকবর ব্যতীত এই অণ্ডকোষ কর্তিত পুরুষগুলিই কেবল এখানে প্রবেশ করতে পারে। এদের সহযোগী হিসেবে সেখানে আরো নিয়োজিত রয়েছে তুরস্ক এবং আবিসিনিয়ার কিছু নারী, দৈহিক শক্তির বিবেচনায় তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। আকবর হেরেমের নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছন্দ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশাবলী খাজানসারাকে প্রদান করেছেন। হেরেমের যাবতীয় কর্মকাণ্ড এই খাজানসারার তীক্ষ্ম নজরদারী ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
খাজানসারা আকবরকে জানিয়েছে তিনি যখন অভিযানে ছিলেন তখনো অনেক শাসক তার নেকদৃষ্টি লাভের আশায় মেয়ে পাঠিয়েছে তাঁর রক্ষিতার স্থান পূরণ করার জন্য-বলিষ্ঠ দেহ ও চওড়া চোয়ালের অধিকারী, বাদামি বর্ণের চোখ বিশিষ্ট নারী এসেছে সুদূর তিব্বত থেকে। এছাড়াও রয়েছে অল্প সবুজাভ চোখ বিশিষ্ট আফগানী নারী যদের গায়ের রঙ মধুতুল্য, ইন্দ্রিয়পরিতৃপ্তিকর দীর্ঘাঙ্গী আরব নারী যাদের মোহনীয় চোখ কাজল টানা এবং দেহে প্রলুব্ধকর মেহেদির জটিল নকশা আঁকা….।
হেরেমের সুরক্ষিত দ্বারের আড়ালের জগতে অপেক্ষারত ইন্দ্রিয় সুখের চিন্তায় আকবরের দেহের রক্তপ্রবাহ দ্রুততর হলো। তার এই নতুন হেরেম তাঁর ব্যক্তিগত স্বর্গ-গোলাপ জলের ঝর্না এবং রেশমের পর্দায় সুসজ্জিত বিলাসবহুল অবকাশ কেন্দ্র-যেখানে তিনি একজন সম্রাট হিসেবে তাঁর সকল দুর্ভাবনা ঝেড়ে ফেলে একজন সাধারণ মানুষের নিখাদ আনন্দকে আলিঙ্গন করতে পারেন।
আজ রাতে তিনি কাকে তার সঙ্গিনী করবেন? মশাল জ্বালা ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গে প্রবেশ করে আকবর ভাবলেন, এটি তাঁর হেরেমে প্রবেশের ব্যক্তিগত পথ। তাঁর চিন্তা অল্প সময়ের জন্য তাঁর স্ত্রীদের উপর কেন্দ্রীভূত হলো। পারসিক নারীটি নয়, নয় জয়সলমিরের রাজকন্যাও…অন্তত আজ রাতের জন্য। আর হীরাবাঈ এর ব্যাপারে তিনি তাঁর কথা রখেছেন, তিনি সেলিমের জম্মের পর থেকে তাকে আর শয্যাসঙ্গিনী করেন নি। তবে অভিযান থেকে ফিরে তিনি তার সঙ্গে একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন- এমনকি তাকে একটি হীরার বালাও উপহার দিয়েছেন যেটি একসময় শাহ্ দাউদের কোনো এক স্ত্রীর কব্জিতে শোভা পেয়েছে। হীরাবাঈ এর আচরণ ছিলো ঠাণ্ডা, অভিব্যক্তিহীন মুখে সে এই চমৎকার উপহারটি তার এক রাজপুত পরিচারিকার কাছে হস্তান্তর করে। তার এই আচরণ আকবরের কাছে অপরিচিত নয়, তবুও হীরাবাঈ এর অক্ষয় ঘৃণা এখনো তাকে আঘাত করতে সক্ষম বলে তিনি তখন উপলব্ধি করেছিলেন।
আকবর তার মনকে অধিক আনন্দময় চিন্তার দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। তিনি খাজানসারাকে বলতে পারেন নবাগত সবচেয়ে আকর্ষণীয় মেয়েগুলিকে তার সম্মুখে হাজির করতে। তারা তাদের গহনা অপসারণ করার পর (গহনার জন্য খেলায় বিঘ্ন ঘটতে পারে তাই) তিনি তাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে পারেন। যে মেয়েটি তাঁকে ফাঁকি দিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় লুকিয়ে থাকতে পারবে তাকেই তিনি শয্যাসঙ্গিনী করবেন। অথবা হেরেমের উঠানে পাথরনির্মিত কালো ও সাদা বর্গক্ষেত্রাকার বিশাল ছকে তাঁদের ঘুটি হিসেবে সাজিয়ে তিনি জীবন্ত দাবা খেলতে পারেন। স্বচ্ছ পোশাক পরিহিত মেয়ে গুলি যখন অনেক সময় ধরে ছকের উপর চাল অনুযায়ী চলাফেরা করবে তখন তাদের কাউকে পছন্দ করার মতো প্রচুর সময় তিনি পাবেন। তাদের মধ্যে যে কেউ তার দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজেকে ধন্য মনে করবে…
ছয় সপ্তাহ পর আকবর তাঁর মায়ের কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষটির বালুপাথরের নকশা বিশিষ্ট দেয়ালের কাছে মুক্তার কাজ করা হালকা গোলাপি বর্ণের রেশমের পর্দা দুলছে। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের উঠানে অবস্থিত নার্গিস গাছের আদলে তৈরি ঝর্না থেকে স্বচ্ছ পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই মোহনীয় আবাস কক্ষ নিয়ে মা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট, আকবর ভাবলেন। ইদানিং কদাচিৎ তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভেবে কিছুটা অপরাধবোধও মনে কাজ করছে।
কি হয়েছে মা? তুমি আমাকে দেখা করতে বলেছো কেনো?
হামিদা তার পাশে বসা গুলবদনের দিকে এক পলক চাইলেন। আকবর আমরা দুজনে তোমাকে কিছু বলতে চাই। তোমার এই উঁচু দেয়াল বিশিষ্ট বহু সৈন্য পরিবেষ্ঠিত হেরেমের মধ্যে অমাদের নিজেদেরকে বন্দীর মতো মনে হয়।
আকবর অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। এসব তো তোমাদের নিরাপত্তার জন্যই।
নিশ্চয়ই আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু আমরা বন্দীর মতো অবরুদ্ধ থাকতে চাই না।
কিন্তু রাজপরিবারের নারীদের সর্বদাই তো হেরেমের নিভৃতে বসবাসের রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে।
সেটা এমন বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়। তুমি কি আমাদের মর্যাদা ভুলে গেছো? আমরা কেবল রাজপরিবারের নারী নই, আমরা মোগল। নারীও। অতীতে আমরা আমাদের স্বামী, ভাই বা পুত্রদের সঙ্গ দিয়েছি তাদের যুদ্ধাভিযানের সময়। আমরা খচ্চর বা উটের পিঠে চড়ে শত শত মাইল পারি দিয়েছি, অস্থায়ী তাবু এবং মাটির দেয়াল ঘেরা শিবিরে রাত্রিযাপন করেছি। পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে আহার করেছি, তাঁদের পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছি-তাদের উপদেষ্টা, প্রতিনিধি এবং মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি।
