আকবর উপলব্ধি করেছেন বর্তমান সময়ের আগে তিনি ধর্ম নিয়ে তেমন চিন্তা করেন নি, এমনকি তার নিজের ধর্ম ইসলামের বিষয়েও নয়। তিনি তার ধর্মের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা অবশ্য পালন করেছেন কারণ সেটা সকলে তার কাছে আশা করে। কিন্তু হিন্দু ধর্মগ্রন্থের জ্ঞানগর্ভ বাণী সমূহ তিনি যতোই শ্রবণ করছিলেন ততোই নিশ্চিত হচ্ছিলেন যে বহু চিরন্তন সত্য রয়েছে, কিছু সাধারণ নীতি রয়েছে যা সকল ধর্মেই অনুসরণ করা হয় এবং এই সব ধারণা খোলা মনের মানুষদের উঘাটনের অপেক্ষায় এখনো গুপ্ত রয়েছে। যেমনটা সুফি সাধক শেখ সেলিম চিশতি তাঁর অমায়িক অতীন্দ্রিয় ইসলামিক ধর্মচিন্তার আলোকে আকবরকে জানিয়েছেন, ঈশ্বর আমাদের সকলের…।
আকবর উঠে দাঁড়ালেন এবং তার পেছনে দাঁড়ানো চারজন শিঙ্গা বাদক শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে তীব্র আর্তনাদ তুলে জানান দিলো তাঁর বক্তব্য সমাপ্ত হয়েছে। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে খিলান আকৃতির দরজাপথে নিজের ব্যক্তিগত কক্ষের দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত বোধ করছেন। বাংলার যুদ্ধ শেষে ফেরার পর তাকে এতো বিষয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে যে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেননি। হামিদা, গুলবদন এবং অবশ্যই হীরাবাঈ ব্যতীত তাঁর অন্যান্য স্ত্রীরা উদগ্রীব হয়ে ছিলেন তাঁর যুদ্ধ অভিযানের কাহিনী শোনার জন্য এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজপ্রাসাদে যা কিছু ঘটেছে সেসব বিষয় তাঁকে জানানোর জন্য। কিন্তু পুরো সময়টা তার মন কেন্দ্রীভূত ছিলো তাঁর নতুন রাজধানীর চিন্তায়। তিনি তার নিজ প্রাসাদ পরিদর্শন সমাপ্ত করেছেন কিন্তু অধীর হয়ে ছিলেন শহরের বাকি অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য। অবশেষে এখন তিনি সেই ফুসরত পেলেন।
আধঘন্টা পর তিনি তাঁর প্রধান স্থপতিকে নিয়ে শহর প্রাচীরের পাশে হাঁটছিলেন। তুমি আমাকে প্রদান করা তোমার অঙ্গীকার রক্ষা করেছো তুহিন দাশ। লাল বালুপাথরের নিরাপত্তা পাঁচিল এবং কেল্লা দেখতে দেখতে আকবর মন্তব্য করলেন।
শ্রমিকরা পালাক্রমে কাজ করেছে জাহাপনা। এমন কোনো দিন, রাত বা ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়নি যখন তাঁদের কাজ অব্যাহত ছিলো না।
তারা আধার নামার পর কাজ করেছে কীভাবে?
রাতে অগ্নিকুণ্ড এবং মশাল জ্বালা হয়েছিলো। পাথর সংগ্রহের জায়গায় আকার অনুযায়ী পাথর কাটার যে পরামর্শ আপনি দিয়েছিলেন সেই বুদ্ধিও কাজের গতি দ্রুত করেছে। আসুন জাহাপনা, এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর আমরা সেনাভবন এবং রাজকীয় টাকশাল দেখতে পাবো।
হিন্দু নকশা শিল্পীরা চমৎকার কাজ দেখিয়েছে। আকবর টাকশালের বালুপাথরের ছাদে নিখুঁতভাবে খোদাই করা তারার আকৃতি এবং ষড়ভুজ গুলি দেখতে দেখতে বললেন। সত্যিই তিনি যে দিকে তাকাচ্ছিলেন সেদিকেই নির্মাণশিল্পীদের কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খতা এবং উৎকর্ষ প্রত্যক্ষ করে অবাক না হয়ে পারছিলেন না। স্তম্ভ এবং দেয়ালে খোদাই করা ফুল পাতা এবং বৃক্ষের প্রতিকৃতি একদম প্রাকৃতিক আকার, অবয়ব এবং সতেজতা লাভ করেছে।
এটি দেখুন জাঁহাপনা। তুহিন দাশ দুধসাদা রঙের মার্বেলে তৈরি জালির (পর্দার মতো আড়াল সৃষ্টি করতে পারে এমন কাঠামো) দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করলেন। কারিগরেরা বালুপাথর খোদাই করায় যতোটা দক্ষ অনুরূপ দক্ষ মার্বেল পাথরের কাজে। তুহিন দাশ ঠিকই বলেছে, আকবর ভাবলেন। জালিটিকে এতো সূক্ষ্ম এবং ভঙ্গুর মনে হলো যেনো সেটা বরফে জমে যাওয়া মাকড়সার জাল।
সদ্য নির্মিত হওয়ায় শহরটিতে কিছুটা অপরিচ্ছন্নতা এবং রুক্ষতা বিরাজ করছিলো এতে কোনো সন্দেহ নেই। সীমানায় রোপণ করা বৃক্ষ এবং ফুলগাছ দৃষ্টিনন্দন কোমল আবহ সৃষ্টি করবে। বাগান গুলিতে রোপণ করা চারাগাছের কি অবস্থা?
উত্তম জাহাপনা। ঐ দিকে আপনার দেওয়ান-ই-খাশ এর বাইরের বাগানে মালিরা এখনো কাজ করছে।
আকবর তুহিন দাশকে অনুসরণ করে টাকশালের বাইরে এলেন। আবারো তিনি তার প্রধান স্থপতির কাজের সুনিপুণ ধারাবাহিকতা দেখতে পেলেন। একদল নারী পুরুষ লাল মাটির উপর উবু হয়ে বসে সারিবদ্ধভাবে তরুণ পাইন গাছের চারার ফাঁকে ফাঁকে ঘন সবুজ বর্ণের সাইপ্রেস গাছের চারা রোপণ করছে। অন্য আরেকটি জমিতে আম গাছ, মিষ্টি গন্ধযুক্ত চম্পা এবং উজ্জ্বল সিঁদুর বর্ণের মোরগচূড়া ফুলগাছ সুন্দর বেড়ে উঠছে।
দয়া করে দেওয়ান-ই-খাশ এ প্রবেশ করুন জাহাপনা। আমি আশা করছি আপনি সন্তুষ্ট হবেন। অঙ্কনে যেমন ছিলো হুবহু তেমনিভাবে এটি তৈরি করা হয়েছে।
সত্যিই তাই, অভিজাত নকশা এবং গড়নে সুসজ্জিত ভবনে প্রবেশ করে আকবর দেখতে পেলেন। অনেক উঁচু ছাদ বিশিষ্ট একক কক্ষটির মাঝখানে ক্রমশ উপর দিকে প্রসারিত স্তম্ভটি আশ্চর্যজনক সুন্দর খোদাই কর্ম বিশিষ্ট, কাগজে যার অঙ্কন দেখে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এর উপর অবস্থিত বৃত্তাকার মঞ্চের সঙ্গে চারটি ঝুলন্ত সেতু মিলিত হয়েছে। এই মঞ্চের উপর তিনি আসন গ্রহণ করবেন। দেখেছেন জাহাপনা, ওখানে বসার পর মনে হবে আপনি যেনো পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছেন…যেনো সর্বোচ্চ মানবীয় ক্ষমতা ঐ স্থানকে ঘিরে উৎসারিত হচ্ছে। এর আকৃতি আমাদের হিন্দু মান্দালার মতো-স্তম্ভটি পৃথিবীর মেরুরেখার প্রতিনিধিত্ব করছে।
সেই দিন বেলা শেষে নীলা শোভিত রূপার পাত্রে রাখা ঠাণ্ডা পানির ঝাঁপটা দিয়ে মুখ চোখ ধোয়ার সময় আকবর গভীর সন্তুষ্টি অনুভব করলেন। তাঁর যুদ্ধাভিযান সফল হয়েছে এবং তাঁর রাজধানী ততোটাই চমৎকার হয়েছে যা তিনি আশা করেছিলেন। আগামী কিছু ঘন্টার জন্য
