এমন কে আছে যে আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে? মাত্র গতকাল আমি বংলা থেকে একটি বার্তা পেয়েছি। তা থেকে জানা গেছে। শাহ্ দাউদ, যে কিনা বোকার মতো মোগল ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো, তাকে পাকড়াও করে হত্যা করা হয়েছে। এই মুহূর্তে তার ছিন্ন মস্তক ফতেহপুর শিক্রির পথে রয়েছে এবং তার দেহটি বাংলার প্রধান শহরের বাজারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। শাহ্ দাউদ তার প্রতারণার জন্য যে পরিমাণ মৃত্যু এবং দুর্ভোগ বয়ে এনেছে তার মূল্য নিজের জীবন দিয়ে পরিশোধ করছে। সে যদি আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতো তাহলে আমার পক্ষ থেকে তার ভয়ের কিছু ছিলো না। কিন্তু সে অধ্যায় এখন অতীত। এখন আমাদের দায়িত্ব আমাদের সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। আমরা ইতিহাস থেকে শিখেছি যে নতুন ভূখণ্ড জয় করার তুলনায় একে নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক বেশি কঠিন। আমার পিতামহ বাবরের আগমনের পূর্বে নয়টি রাজবংশ হিন্দুস্তান শাসন করেছে। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। তাদের আলস্য এবং অতিমাত্রায় আত্মগর্বের কারণে ঐ সব শাসকেরা যা কিছু অর্জন করেছিলো তা মুঠির ফাঁক দিয়ে পড়ে যাওয়া বলুর মতো নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা যেসব ভুলের কারণে ধ্বংস হয়েছে সেসব ভুল আমরা করবো না। আপনাদের সহায়তায় আমি মোগল সাম্রাজ্যকে সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে এক বিস্ময়কর সাম্রাজ্যে পরিণত করবো। এই সাম্রাজ্য সমৃদ্ধিশালী হবে কেবল এই জন্য নয় যে আমাদের সেনাবাহিনী সবচেয়ে নির্ভীক ও শক্তিশালী, বরং যারা এর সীমানার মধ্যে বাস করবে তারা এই সাম্রাজ্যের একজন প্রজা হওয়ায় জন্য গর্বও বোধ করবে।
আমি কেবল সেই সব প্রজাদের কথা বলছি না যারা মুসলমান, বরং ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই এই সাম্রাজ্যের সুযোগ সুবিধা সমান ভাবে ভোগ করবে। অনেক হিন্দু শাসক-যেমন রাজা রবি সিং যাকে আমি সামনে দেখতে পাচ্ছি- ইদানিংকার যুদ্ধ গুলিতে আমার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। তিনি এবং তার অনুসারীরা মোগলদের স্বার্থে রক্ত ঝরিয়েছেন। সেটা এই জন্য যে তারা এবং আমার প্রতি বিশ্বস্ত যে কোনো ধর্মের অনুসারী ব্যক্তি আমার রাজ সভায় এবং সেনাবাহিনীতে আনুকূল্য ও সমৃদ্ধি লাভ করবেন। এবং এটা সকলের অধিকার এবং প্রাপ্য সম্মান যে প্রত্যেকে কোনো প্রকার হয়রানি বা উৎপীড়নের শিকার না হয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন কারার স্বাধীনতা পাবে।
আকবর একটু থামলেন এবং সহজাত প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে দুজন কালো আলখাল্লা পরিহিত মুসলিম যাজকের দিকে তাকালেন। তারা অনুপ তালাও এর একপাশে হাঁটাপথের আচ্ছাদনের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন মজবুত গড়নের বর্ষিয়ান লোক, তরমুজের মতো গোলাকার ভুড়ির উপর দুহাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছেন। আকবর তাকে ভালোভাবে চিনেন-শেখ আহমেদ, একজন গোঁড়া সুন্নি এবং ওলামাদের প্রধান, যারা আকবরের উচ্চপদস্থ ধর্মীয় উপদেষ্টা। এই শেখ তাঁদের মধ্যে অন্যতম যারা আকবরের হিন্দু নারী বিয়ে করার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছে। দ্বিতীয় যাজকটি হলেন আবুল ফজলের বাবা শেখ মোবারক, যার শীর্ণ বসন্তের দাগ বিশিষ্ট মুখটিকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছিলো।
দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ কণ্ঠে আকবর আবার বক্তব্য শুরু করলেন। মোগল সাম্রাজ্য কেবল তখনই প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন করবে যখন এর সকল প্রজার জীবনে সমান উন্নতি ঘটবে। আমি যা বললোম তার প্রত্যক্ষ বাস্তায়নের নমুনা স্বরূপ আমি ঘোষণা করছি যে আজ থেকে অমুসলিমদের উপর আরোপ করা সকল সাম্প্রদায়িক কর রহিত করা হলো। কারণ কোনো ব্যক্তির উপর ইসলাম ধর্ম অনুসরণ না করার জন্য অতিরিক্ত কর আরোপ করা আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না। তাছাড়া আমি মোগল আমলের পূর্ব থেকে প্রচলিত হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের উপর আরোপ করা কর প্রথাও বিলোপ করছি।
শেখ আহমেদ প্রকাশ্যে মাথা নাড়ছিলো। অনুবিধা নেই মাথা নাড়াক। শীঘ্রই তিনি এমন আরো অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করবেন যাতে তার সম্মতি থাকবে না। শিক্রিতে আসার অবকাশযাত্রার সময় যে সব শহর এবং গ্রাম আকবর অতিক্রম করেছেন সেগুলির নেতা বা প্রধানদের ডেকে পাঠিয়ে তিনি আলাপ করেছেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার জন্য। এর আগে তিনি জানতেন না হিন্দু প্রজাদের উপর ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে অতিরিক্ত কর আরোপের প্রথা চালু রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি যতোই চিন্তা করেছেন ততোই উপলব্ধি করেছেন যে এ ধরনের কর শুধু অন্যায়ই নয় বরং এর ফলে সাম্প্রদায়িক বিভেদও সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্রাজ্যের ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য তিনি একাধিক হিন্দু স্ত্রী গ্রহণ করেছেন এবং তাদের নিজ নিজ ধর্মচর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। নিশ্চিতভাবেই এটা তার একটি বিচক্ষণ এবং ন্যায্য পদক্ষেপ-সকলের মধ্যে সহনশীলতা এবং সমতার বোধ সৃষ্টি করার জন্য।
তিনি হিন্দু ধর্মের প্রতি ক্রমশ অধিক উৎসুক হয়ে উঠছিলেন। অতীতে তিনি যখন এই ধর্মটি নিয়ে ভেবেছেন তখন তাঁর কাছে একে অদ্ভূত, দুর্বোধ্য এমনকি ছেলেমানুষী সুলভ বিশ্বাস বলে মনে হতো যা মূর্তিপূজা এবং কতিপয় কাল্পনিক কাহিনী নিয়ে গঠিত। কিন্তু রবি সিং তাঁকে দুটি চমৎকারভাবে বাধাই করা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ উপহার দিয়েছে-একটি উপনিসদ এবং অপরটি রামায়ণ-ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করা। শোভাযাত্রা নিয়ে রাজধানীতে আসার পথে প্রতি রাতে তিনি তার পরিচারকদের সেগুলি পড়ে শোনাতে বলেন। আধোঅন্ধকারে সেই সব পুস্তকের সমৃদ্ধ ভাষা এবং ধ্বনিময় বাণী শ্রবণ করতে করতে তার মনে হত-যে মানুষ খাঁটি হৃদয়ের অধিকারী তার ধর্ম বা বর্ণ যাই হোকনা কেনো সে ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে পারে এবং অনাবিল শান্তির অধিকারী হতে পারে।
