একটু থেমে অকবর একজন কোর্চিকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, মোহাম্মদ বেগের কি হয়েছে?
তিনি যখন আমাদের সবুজ পতাকার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলেন বাঙ্গালীরা তাকে আমাদের একজন সেনাপতি হিসেবে চিনে ফেলে। একটি কামানের গোলা তার কাঁধে আঘাত করে। ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার সময় তিনি মাথায় আঘাত পান এবং পরে একজন বাঙ্গালী তার উরুতে বর্শা দিয়ে আঘাত করে।
তাকে যতদ্রুত সম্ভব হেকিমের কাছে নিয়ে যাও। তিনি যথেষ্ট শক্ত না হলে এতোক্ষণ পর্যন্ত বাঁচতেন না।
এবারে আকবর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শহরের প্রতিরোধ প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁর কিছু সৈন্য ইতোমধ্যে দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে ঢুকে গেছে এবং এখন তারা গুচ্ছ গুচ্ছ মাটির কুটিরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আকবরের তিন জন বন্দুকধারী একটি কুয়ার আড়ালে নিচু হয়ে বসে সেটার দেয়ালের উপর বন্দুক রেখে গুলি বর্ষণ করছিলো এগিয়ে যাওয়া সঙ্গীদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য।
এ সময় অকবর দেখলেন শাহ্ দাউদ এর হলুদ পতাকা বিশিষ্ট কুটির গুলির পিছনে পাহাড়ে সবুজ মোগল পাতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্পষ্ট বুঝা গেলো তার লোকেরা শহরের বিভিন্ন অংশের প্রাচীর অতিক্রম করে ঢুকে পড়েছে এবং লড়াই করে শত্রুদের পর্যদস্ত করতে পেরেছে। কয়েক মুহূর্ত পর তিনজন লোক কয়েকটি কুটির থেকে বেরিয়ে এলো। তাদের একজন আত্মসমর্পণের ভঙ্গীতে হাত তুলে আকবরের লোকেদের দিকে এগিয়ে এলো। বাকি দুজন প্রথমে তাদের হাতে থাকা হলুদ পতাকা কাদায় ছুঁড়ে ফেললো এবং তারপর মাথার উপর হাত তুললো। তার বিজয় হয়েছে, ভবতে ভাবতে আকবর তার মাথার উপর শূন্যে ঘুষি চালালেন। কি ঘটেছে। উপলব্ধি করে তার সৈন্যরাও বিজয় এবং বেঁচে যাওয়ার মিলিত আনন্দে উল্লাস প্রকাশ করতে লাগলো।
ওকে বল শাহ দাউদকে ধরে আমার কাছে নিয়ে আসতে, আকবর চিৎকার করে আদেশ দিলেন। যে বাঙ্গলীটির উপর আদেশটি বর্তালো তার চেহারা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো কিন্তু সে বিলম্ব না করে পেছন দিকের একটি কুটিরের মধ্যে অদৃশ্য হলো। কয়েক মিনিট কাউকে দেখা গেলো না এবং যেই আকবর বলপূর্বক তাদের ধরে আনার আদেশ দিতে যাবেন সেই মুহূর্তে একজন শীর্ণ চেহারা বিশিষ্ট দীর্ঘদেহী লোক কুটিরের দ্বারে আবির্ভূত হলো এবং মাথা নিচু করে আকবরের দিকে এগিয়ে এলো। আকবরের কাছ থেকে পনেরো ফুট দূরে থাকতে সে অধোমুখে মাটির উপর পতিত হলো। স্পষ্টই বোঝা গেলো তার বয়স শাহ্ দাউদের মতো উনিশ বছর নয় বরং এর দ্বিগুণ।
তুমি কে? শাহ্ দাউদ কোথায়? সে যদি ভিতরে লুকিয়ে থাকে, এক্ষুণি তাকে আমার সামনে হাজির হতে বলল।
আমার নাম ওস্তাদ আলী, আমি শাহ্ দাউদের মামা। তার উত্থানের সমগ্র সময়টায় আমি তার প্রধান উপদেষ্টা ছিলাম। সে যা কিছু করেছে তার সকল দায়ভার আমার। আমি যখন গতরাতে বুঝতে পারলাম কঠিন লড়াই সত্ত্বেও আমরা জিততে পারবো না তখন আমি শাহ্ দাউদকে ছদ্মবেশে এখান থেকে সরিয়ে দেই। তার সমস্ত ধন-রত্ন ঐ কুটির গুলির মধ্যে রয়েছে। এই ধন-সম্পদ এবং বাংলাকে আমি তার পক্ষ থেকে আপনার কাছে সমর্পণ করছি।
*
একটি উঁচু অগ্রভাগ বিশিষ্ট কাঠের ডাউ (আরব নাবিকদের ব্যবহৃত এক মাস্তুল বিশিষ্ট জাহাজ) এর পাটাতনে দাঁড়িয়ে আকবর বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে সমুদ্র দর্শনের পর পুনরায় তা দেখার আকাঙ্ক্ষা তার মনে রয়ে যায়। তাই এবারে তিনি পূর্বের সমুদ্র দর্শন করে তার সেই ইচ্ছা পূরণ করছেন। এ সময় হঠাৎ উষ্ণ দমকা হাওয়া ডাউটির তিনকোণা পালে আঘাত করলে সেটি দুলে উঠলো এবং আকবর তাঁর পা দুটি আরেকটু ফাঁক করে দাঁড়ালেন। তখন মধ্যাহ্নের পর কিছু সময় পেরিয়েছে এবং সাগরের জল এতো উজ্জ্বল রূপালী বর্ণের দেখাচ্ছিলো যে সেদিকে তাকিয়ে থাকাই কষ্টকর মনে হচ্ছিলো। আকবর ঠোঁটে সাগরের লোনা স্বাদ পাচ্ছিলেন।
তাঁর সেনাবাহিনী বাংলার সকল প্রধান শহর বন্দর করতলগত করেছে। কিন্তু শাহ দাউদকে এখনো পাকড়াও করা সম্ভব হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বন্দী করা যাবে। সমগ্র বাংলা এখন মোগল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ। আজ সকালেই তিনি অবুল ফজলের কাছ থেকে আরো সুসংবাদ পেয়েছেন। সে জানিয়েছে পশ্চিমের রাজ্যগুলিতে শান্তি বজায় রয়েছে এবং শিক্রির নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। সাগরের ঢেউ দেখতে দেখতে তিনি হাসলেন। আকবরের মনে হচ্ছিল তাঁর শাসন আমলের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছে। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে তাঁর পিতা, পিতামহ এবং নিজের আকাক্ষার চেয়েও অধিক বিস্তৃত করতে পেরেছেন। তবে তিনি তার এই সাম্রাজ্য বিস্তার অব্যাহত রাখবেন, কেবল তাঁর অনুসারীদের যুদ্ধের উত্তেজনা ও লুষ্ঠিত সম্পদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই নয়, বরং এই বিস্তৃত সাম্রাজ্যের উপর তাঁর শাসন ক্ষমতা সুদৃঢ় করার জন্যেও। একদিন যে সাম্রাজ্য তিনি তাঁর বংশধরদের দান করে যাবেন তা অবশ্যই অজেয় হতে হবে। এই পরিকল্পনা সফল করার জন্য তাকে নতুন, পুরাতন, হিন্দু, মুসলিম সকল প্রজার সম্মান অর্জন করতে হবে। প্রজারা যাতে তাকে একজন শক্তিশালী দখলকারী বা বহিরাগত শত্রু মনে না করে তা নিশ্চিত করতে হবে। এমনটা ভাবা যতো সহজ, বাস্তবায়ন করা ততোটা সহজ নয়। কিন্তু তিনি এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এবার লড়াই শুরু করবেন।
