আকবর আর স্থির থাকতে পারলেন না-যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফলের জন্য এই লড়াইটির গুরুত্ব অপরিসীম এবং তার এখন উচিত স্বশরীরে মোগলদের নেতৃত্ব দেয়া। তিনি এক টানে খাপ থেকে আলমগীর বের করে আনলেন এবং সংঘর্ষের এলাকার দিকে তার ঘোড়া ছুটালেন। বিশ্বস্ত দেহরক্ষীরা তাকে অনুসরণ করলো। পাহাড়ে পৌঁছাতে তার সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় লাগলো, যদিও একটি জলাশয় লাফিয়ে পার হওয়ার সময় তার ঘোড়াটি কাদায় পিছলা খেলো।
তিনি যখন তার ঘোড়াটিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে লড়াই এর এলাকায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করতে লাগলেন, তখন তিনি শাহ দাউদের বন্দুকধারীদের নিশানার আওতায় পৌঁছে গেলেন। শাহ দাউদের লোকেরা তার সোনা মোড়া বক্ষবর্ম দেখে তাকে চিনতে পারলো এবং তার উপর গুলি বর্ষণে মনোযোগী হয়ে উঠলো। আকবর শুনতে পেলেন বন্দুকের গুলি এবং তীর তার দুপাশ দিয়ে বাতাসে শিস কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তাঁর ঘোড়াটি এক মুহূর্তের জন্য টলমল করে উঠলো এবং তিনি অনুভব করলেন সেটার রক্ত তাঁর ডান উরু ভিজিয়ে দিচ্ছে। পাঁজর এবং পায়ের সংযোগস্থলে বন্দুকের গুলি খেয়ে ঘোড়াটি আর এগুতে পারছিলো না, সেটার মাথাটিও ক্রমশ মাটির দিকে নুয়ে পড়ছিলো। ঘোড়াটি আছড়ে পড়ার আগমুহূর্তে আকবর কাদার উপর লাফ দিলেন এবং ঝট করে এক পাশে সরে গেলেন তাকে কাছ থেকে অনুসরণ করা দেহরক্ষীটির সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য।
দেহের ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার পর তিনি চিৎকার করে তার এক রক্ষীর কাছে আরেকটি ঘোড়া চাইলেন। তৎক্ষণাৎ রক্ষীটি ঘুরে এসে তার ঘোড়ার লাগামটি আকবরের হাতে দিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আবার ঘোড়ায় চড়ে বসলেন এবং কাদার পুরু আবরণযুক্ত বুট জোড়া সেটার রেকাবে ঢুকিয়ে নিলেন।
আকবরের ঘোড়াটি আহত হওয়ার কারণে তার এবং তার দেহরক্ষীদের আক্রমণের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে। শাহ্ দাউদের কিছু অশ্বারোহী সৈন্য প্রায় তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। আকবর ঠিক সময় মতো ঘোড়া নিয়ে কিছুটা সরে গেলেন যখন বিশাল দেহী একজন বাঙ্গালী তার কাটাযুক্ত যুদ্ধকাস্তে আকবরের শিরোস্ত্রাণবিহীন মাথা লক্ষ্য করে ঘুরালো। কিন্তু লোকটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপর থেকে ছুটে আসার কারণে নিজ ঘোড়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। সবলে লাগাম টেনে ধরা সত্ত্বেও সে আকবরকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলো, তবে আকবর লোকটির মাথার পেছনে আলমগীরের কোপ বসাতে দেরি করলেন না। আকবর নিজের হাতে তীব্র ঝাঁকি অনুভব করলেন তবে এটা নিশ্চিত হলেন যে তাঁর তলোয়ারের আঘাত লক্ষ্যভেদ করেছে।
কয়েক মুহূর্ত পর আকবর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তাঁকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসা দ্বিতীয় অশ্বারোহী বাঙ্গালীটিকে লক্ষ্য করে তলোয়ার চালালেন কিন্তু সে মাথা নিচু করে আঘাতটি ব্যর্থ করে দিলো। লোকটি ঘুরে আবার আকবরের দিকে এগিয়ে এলো কিন্তু এবারে আকবর ঢালের উপরের দিকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে বাঙ্গালীটি পুরু কাদার স্তর পেরিয়ে আকবরের কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি তার কাছে গিয়ে তলোয়ারের আঘাতে তার হাতের বর্শটি ফেলে দিলেন এবং তারপর আলমগীরের ধারালো ফলা লোকটির উরু ও পেটের সংযোগ স্থলে ঢুকিয়ে দিলেন।
আসন্ন বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে আকবর হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখে জমে উঠা ঘাম মুছলেন এবং আশেপাশে তাকালেন। বাম দিকে তাঁর কাছ থেকে ষাট গজ দূরে মোহাম্মদ বেগের খাড়া থাকা সবুজ পতাকাকে ঘিরে তুমুল লড়াই চলছে। দেহরক্ষীদের তাঁকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি যুদ্ধ ক্ষেত্রের বিশৃঙ্খল ভীড় ঠেলে মোহাম্মদ বেগের দিকে অগ্রসর হলেন। বন্দুক এবং কামানের সম্মিলিত গোলা বর্ষণের চাপে মোহাম্মদ বেগের আক্রমণ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বহু ঘোড়া কাদার মধ্যে পড়ে ছিলো। আকবর খেয়াল করলেন একটি ঘোড়া নিস্তেজভাবে সেটার পিছনে পা ছুড়ছে। আরেকটি ঘোড়ার নিচে চাপা পড়া অবস্থায় তিনি মোহাম্মদ বেগের মৃত কোর্চিকে দেখতে পেলেন।
তীব্র লড়াই চলছে। কিছু সংখ্যক বাঙ্গলীকে দেখা গেলো মোহাম্মদ বেগের ঘোড়াচ্যুত সৈন্যদের বর্শায় গেথে ফেলার চেষ্টা করছে। ঐ সৈন্যরা একটি পাথরে হেলান দিয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে থাকা কাদা মাখা দেহকে রক্ষার চেষ্টা করছিলো। সেটা স্বয়ং মোহাম্মদ বেগ, তাকে চিনতে পেরে আকবর আতঙ্কিত বোধ করলেন। তিনি মরিয়া হয়ে সেদিকে অগ্রসর হলেন। যুদ্ধরত উভয় পক্ষের যোদ্ধাদের কেউই তাঁর উপস্থিতি খেয়াল করলো না। তিনি তাঁর কাছাকাছি অবস্থিত এক বাঙ্গালীর ঘোড়ার পাছায় তলোয়ারের চআপ্টা অংশ দিয়ে আঘাত করলেন। তিনি যা চেয়েছিলেন তাই ঘটলো, ঘোড়াটি পিছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে সেটার আরোহীকে ফেলে দিলো এবং আরোহীটি আকবরের ঘোড়ার খুরের আঘাতে পিষ্ট হলো।
এরপর আকবর আরেকজন বাঙ্গালীর ঘাড়ে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলেন যে একজন কোর্চিকে বর্শাবিদ্ধ করতে এগিয়ে যাচ্ছিলো। আঘাতের পর তার হাত থেকে বর্শাটি খসে পড়লো। এই সময়ের মধ্যে আকবরের দেহরক্ষীরা আরো তিনজন বাঙ্গালীকে ধরাশায়ী করলো এবং বাকিরা লড়াই করার সাহস হারিয়ে ঘুরে শহর প্রাচীরের দিকে ফিরতে চেষ্টা করলো আঠালো মাটি পেরিয়ে। তাঁদের মধ্যে একজন কেবল সফল হলো তবে প্রাচীর অতিক্রম করার পূর্বে সে তার বাহুর উপরের অংশে নিক্ষিপ্ত ছোরা বিদ্ধ হলো।
