আকবর ভাবছেন তার প্রতিপক্ষ অল্প সময়ের মধ্যে যথেষ্ট ভালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করলেন। কারণ শাহ্ দাউদ তাঁর মতোই দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য সাথে করে কেবল হালকা ছোট আকারের কামান গুলি নিয়ে এসেছে। তাছাড়া দাউদের সৈন্য সংখ্যা তার সৈন্যদের প্রায় কাছাকাছি হলেও তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ গাদাবন্দুক রয়েছে এবং তাদের অবরোধ উপস্থিত উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হলেও যথেষ্ট দৃঢ় মনে হচ্ছে। আকবরের তথ্য সংগ্রহকারীরা জানিয়েছে তাদের শত্রুপক্ষ শহরবাসীদের বিছানা, তৈজসপত্র এবং ঘরের দরজাও অবরোধ তৈরির কাজে ব্যবহার করেছে। তাদের এতো ঐকান্তিক পরিশ্রম সত্ত্বেও আকবর উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে, একটি সমন্বিত আক্রমণই শহরটিকে দখল করার শ্রেষ্ঠ উপায়। আর শাহ্ দাউদকে পরাজিত করার মাধ্যমেই বাংলার বিদ্রোহের অবসান ঘটবে এবং এই উর্বর সমৃদ্ধ ভূমি তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হবে। আহমেদ খান যথারীতি আকবরের পাশেই ছিলেন। আকবর তার দিকে ফিরলেন। আমাদের অশ্বারোহীদের কি শহর ঘেরাও করা শেষ হয়েছে?
জ্বী। এক ঘন্টা আগেই সে কাজ সমাপ্ত হয়েছে।
তাহলে এখন কেবল শিঙ্গাবাদক এবং দুলিদের আদেশ দিলেই তারা আমাদের সৈন্যদের চারদিক থেকে সমন্বিত আক্রমণের জন্য সশব্দ সংকেত দিতে পারে।
জ্বী জাঁহাপনা, তবে আপনার পিতার একজন সহযোদ্ধা হিসেবে এবং আপনার বর্ষিয়ান প্রধান সেনাপতি হিসেবে আপনার কাছে আমি একটি বিনীত অনুরোধ করতে চাই। নদী দূর্গে আক্রমণের সময় যেরকম ঝুঁকি আপনি নিয়েছিলেন দয়া করে এবার আর তেমনটা করবেন না। আমার মনে আছে আপনার পিতা হুমায়ূন আপনাকে রাজবংশের স্বার্থে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে আদেশ দিয়েছিলেন এবং একইভাবে বৈরাম খান আপনাকে উপদেশ দিয়েছিলেন হিমুর বিরুদ্ধে লড়াই এর সময়। আপনার পুত্ররা এখনো শিশু। আপনার কিছু হলে তাঁদের জীবন বিপন্ন হবে এবং সাম্রাজ্যেরও অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
আমি জানি আপনি বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে কথাগুলি বলেছেন এবং আপনি যা বললেন তা নিঃসন্দেহে উত্তম উপদেশ। কিন্তু আমি আমার সহজাত প্রতিক্রিয়ার কারণে ঝুঁকি নেই, হয়তো এর আরেকটি কারণ এই যে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যুদ্ধ ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করা আমার ভাগ্যে লেখা নেই- অন্তত এতো তাড়াতাড়ি নয় যখন আমি আমার সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ বিস্তৃত করতে পারিনি। আমার নিজের বিশ্বাস এবং জ্ঞানী সাধুগণ, যাদের সঙ্গে আমি এ বিষয়ে আলোচনা করেছি তারাও মতো দিয়েছেন যে, আমার জন্য যা মারাত্মক বিপদ বলে গণ্য হতে পারে তার অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রে নয়।
কিন্তু আপনার পিতা উপলব্ধি করেছিলেন, কোনো মানুষের কর্মই তার চূড়ান্ত নিয়তি নির্ধারণ করে, তারা পরিকল্পনা বা নিয়তি সম্পর্কিত ভাবনা নয়…যদিও আপনার আত্মবিশ্বাস এবং সাহস অদ্যাবধি অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে আপনাকে সাফল্য এনে দিয়েছে যেখানে অন্যরা হয়তো ব্যর্থ হতো, আপনার উচিত নয় সর্বদা এমন অনুভূতির উপর নির্ভর করা।
আকবর সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। যুদ্ধের সময় তাকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কখনো কখনো একজন নেতা হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করা এবং বেপরোয়া আচরণের মধ্যকার পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়, সেটা আমি জানি। এই বাস্তবতা যতোটা সম্ভব আমি স্মরণ রাখার চেষ্টা করবো। ইতোমধ্যে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজকের প্রথম আক্রমণটি মোহাম্মদ বেগের নেতৃত্বে ছেড়ে দেবো। আমি এবং আমার দেহরক্ষীরা সঞ্চিত শক্তি হিসেবে অবস্থান করবো যাতে প্রয়োজনের সময় আপনাদের আক্রমণে সহায়তা করতে পারি।
তাহলে আমি কি এখন মোহাম্মদ বেগকে আক্রমণ শুরু করতে আদেশ দেবো?
হ্যাঁ।
আকবর এবং আহমেদ খান দর্শকের ভূমিকা নিলেন যখন শিঙ্গার সূচনা সংকেত পেয়ে মোগল অশ্বারোহীরা চারদিক থেকে জলাবদ্ধ মাঠ পেরিয়ে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত শহরটির দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। গভীর জল এড়িয়ে, চকচকে কালো পিচ্ছিল কাদা পেরিয়ে যেতে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো। মোহাম্মদ বেগ এবং তার দেহরক্ষী একদম সম্মুখবর্তী দলে সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলো। তাদের কয়েক জন সবুজ মোগল পতাকা বহন করছিলো। তারা যখন গাদাবন্দুকের নিশানার আওতার মধ্যে পৌঁছালো, তখন থেমে থেমে দাউদের সৈন্যদের বন্দুক ছোঁড়ার ধোঁয়া দেখা যেতে লাগলো। এখানে সেখানে কয়েকটি ঘোড়া গুলি বিদ্ধ হলো এবং আরোহী সহ কাদাপনিতে আছড়ে পড়লো। মাঝে মাঝে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া সৈন্যরা পিছন থেকে এগিয়ে আসা অশ্বারোহীদের ঘোড়ার খুরের নিচে চাপা পড়ছিলো। পিঠে আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলি ভারমুক্ত হওয়ায় দৌড়ে অনেক সামনে চলে যাচ্ছিলো। এরকম একটি ঘোড়া সর্বপ্রথম, সবচেয়ে সম্মুখবর্তী একটি প্রতিরোধ লাফিয়ে পেরিয়ে গেলো।
সৈন্যদের অগ্রগতি ভালোভাবেই সম্পন্ন হচ্ছে, আকবর ভাবলেন। কিন্তু হঠাৎ মোহাম্মদ বেগ তার লোকদের নিয়ে যেদিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন সেদিকের মাটির প্রতিরোধের উপর থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্মিলিত গুলিবর্ষণের শব্দ পাওয়া গেলো। তারপর মাটির দেয়ালের একটি ফাঁক অবরোধ করে রাখা মালগাড়ি ঠেলে সরানো হলো এবং সেখান দিয়ে একদল অশ্বারোহী পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রতিআক্রমণ করার জন্য এগিয়ে এলো। তাদের দেহ ঘোড়ার ঘাড়ের উপর নুয়ে আছে, হাতে বর্শা। মোহাম্মদ বেগের অগ্রসরমান সৈন্যরা এই আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা পিছিয়ে এলো। তাদের অনেকে তাল সামলাতে না পেরে ঘোড়াসহ কাদার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো। এ সময় দেয়ালে আরো ফাঁক সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে আরো অশ্বারোহী যুদ্ধে অংশ নিতে এগিয়ে এলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরো বেশি সংখ্যক মোহাম্মদ বেগের লোক হতাহত হলো এবং একটি মাত্র মোগল পতাকা খাড়া থাকলো।
