তরুণ দাউদের সাহস এবং সিদ্ধান্তকে আমাদের এ ধরনের পরীক্ষা দ্বারা যদি সহজেই প্রভাবিত করা যায়, তাহলে তাকে আরেকটু ভয় দেখানোর জন্য আমাদের নতুন কিছু চিন্তা করা উচিত। কথা বলতে বলতে আকবরের দৃষ্টি উঠানের অপরিচ্ছন্ন একটি কোণের দিকে নিবদ্ধ হলো। সেখানে তার একজন নিম্নপদস্থ সেনাকর্তা শত্রু সৈন্যদের মৃতদেহ স্তূপ আকারে জড়ো করার কাজ তদারক করছিলো। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি এলো এবং তিনি আবার বলা শুরু করলেন,ঐ মৃত লোকগুলির আত্মা তাদের দেহ ত্যাগ করে বহু দূরে চলে গেছে, তাই না আদম খান?
আমাদের ধর্ম থেকে আমরা এমন শিক্ষাই পাই জাঁহাপনা।
কিন্তু তবুও ঐ মৃতদেহগুলি তাদের স্বপক্ষের যোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে শাহ্ দাউদকে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণে প্ররোচিত করে।
কীভাবে তা সম্ভব?
পঞ্চাশটি মৃতদেহের ধর থেকে মাথা আলাদা করে মাথাগুলিকে একটি বড় রান্নার ডেকচির মধ্যে ভরুন। তারপর ডেকচির মুখ সোনালী রেশমের কাপড় দিয়ে ঢেকে শক্ত করে বাধুন। এরপর সেটিকে যুদ্ধবিরতির সাদা পতাকাবাহী নৌকায় করে পাটনা শহরের দিকে পাঠিয়ে দিন। সঙ্গে একটি চিঠিও যুক্ত করে দিবেন। তাতে লেখা থাকবে, আবারও আমি তাকে একক যুদ্ধের সুযোগ দিতে চাই এবং সে যদি এবারও আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তার আরো সৈন্য এভাবে অকারণে মাথা হারাবে এবং এই মৃত্যুর জন্য সেই দায়ি থাকবে।
এ ধরনের কিছু করলে আমাদেরকে কি অসভ্য বর্বর মনে হবে না, আমাদের শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রায়শই করে থাকে? আহমেদ খানকে কিছুটা মর্মাহত মনে হলো।
অধিক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর এটাই একমাত্র উপায়। আমরা নিজেরা জানি আমরা বর্বর নই এবং শাহ্ দাউদ ও তার দলের লোকদের মাঝে আমরা যতো বেশি ভীতি সৃষ্টি করতে পারবো ততো দ্রুত তারা আত্মসমর্পণ করবে। এখনই গলা কাটার কাজ শুরু করতে বলুন।
*
মুণ্ডু ভর্তি ডেকচি আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে জাঁহাপনা। যখন সেটি শাহ্ দাউদের কাছে পৌঁছায় তখন গরমের কারণে মাথা গুলিতে পচন ধরে গিয়েছিলো। যখন সে বাঁধন খুলে ঢাকনাটি উন্মুক্ত করিয়ে ভিতরে কি আছে দেখার জন্য উঁকি দেয়, সেই মুহূর্তে কড়াই এর মুখ দিয়ে সহস্র মাছি দ্বারা সৃষ্ট কালো মেঘের পাশাপাশি অকল্পনীয় পচা গন্ধ বেরিয়ে আসে। শাহ্ দাউদ ছিটকে সরে গিয়ে হরহর করে বমি করতে থাকে এবং সেখানে উপস্থিত সকলের একই অবস্থা হয়। এর অল্পক্ষণ পরেই সে পাটনা ত্যাগের আদেশ দেয় এবং দুই ঘন্টার মধ্যেই সৈন্যসামন্ত সহ পাটনার সিংহদ্বার অতিক্রম করে চলে যায়।
আকবরের মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দেখা গেলো। তাঁর শাহ্ দাউদ সম্পর্কিত মূল্যায়ন সঠিক হয়েছে এবং হাড়ি ভর্তি মাথা অনেক প্রাণ রক্ষা করতে নিশ্চিতভাবে সফল হয়েছে। একেই বলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আপনি এভোকিছু জানলেন কীভাবে? আকবর জিজ্ঞাসা করলেন।
কিছু সৈন্য সহ একজন সেনাপতিকে শাহ্ দাউদ পিছনে রেখে যায় এবং তাকে আদেশ দেয় যতোক্ষণ সম্ভব শহরটিকে আমাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে। সেনাপতিটি সময় নষ্ট না করে আমাদের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে যে, তার জীবনের বিনিময়ে সে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত।
নিশ্চয়ই আপনি তার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেছেন?
জ্বী।
প্রমাণ করুন আমরা আদতেই বর্বর বা অসভ্য নই। ঐ সেনাদলের সঙ্গে উত্তম আচরণ করার আদেশ দিন। এক মুহূর্ত পর আকবর যোগ করলেন, দুই তিন দিন পরে কিছু সৈন্যকে পালানোর সুযোগ করে দেবেন। পলাতক সৈন্যরা দূরবর্তী দূর্গগুলিতে অবস্থিত তাদের স্বপক্ষের লোকদের কাছে এই সংবাদ বয়ে নিয়ে যাবে যে তাদের প্রতি অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে তাদের সঙ্গীরাও আত্মসমর্পণ করতে প্রলুব্ধ হবে।
জ্বী জাঁহাপনা।
শাহ্ দাউদ এর গন্তব্য কোথায়?
সে প্রাচীর বেষ্টিত শহর গোমরার দিকে অগ্রসর হচ্ছে যেটি তার পূর্বপূরুষের অধিকৃত ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।
শহরটির অবস্থান কোনো দিকে এবং সেটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন?
শহটি উত্তর দিকে অবস্থিত জাঁহাপনা। এটি প্রাচীরে ঘেরা এবং শাহ্ দাউদ হয়তো সেখানে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়া সেখানে অবস্থানকারী তার বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা হয়তো তার তুলনায় অধিক সাহসী এবং তাদের সহায়তায় সে পুনরায় আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারে।
সেখানে পৌঁছানোর আগেই আমাদের উচিত তাকে বাধা দেয়া।
*
পাটনার আত্মসমর্পণের পর দুই সপ্তাহ পার হেয়েছে। ভারী বর্ষণ স্থগিত হলেও নিচু দিয়ে ভেসে চলা ধূসর মেঘ গুলি সকালের সূর্যের আলো ফোঁটায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। একটি নিচু পাহাড়ের উপর আকবর দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মাথার উপরের নারকেল গাছের আচ্ছাদন থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়ছে। তিনি যেখানে রয়েছেন সেখান থেকে পৌনে এক মাইল দূরে আরেকটি পাহাড়ের উপরে মাটির দেয়াল ঘেরা ছোট একটি শহরে শাহ্ দাউদ শিবির স্থাপন করেছে। আকবর যে পাহাড়টির উপর দাঁড়িয়ে আছেন সেটার উচ্চতা মধ্যম পর্যায়ের হলেও এখান থেকে আশপাশের জলাভূমি স্পষ্ট নজরে আসে। মোগলদের বিশ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল অগ্রগামী দল, যাদের মধ্যে বহু অশ্বারোহী বন্দুকধারী এবং তীরন্দাজ রয়েছে, গতকাল বিকালে এই অবস্থানে এসে পৌঁছায়। তাঁদের দেখে শাহ্ দাউদের বাহিনী অবস্থান ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেনি। পক্ষান্ত রে সারা রাত ঝড়ো আবহাওয়ায় মধ্যে তারা মশালের আলোতে সাধ্যমতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। মালগাড়ী উল্টে মাটির প্রাচীরের ফাঁক পূরণ করেছে এবং বৃষ্টিতে ক্ষয়ে যাওয়া অংশ ঠেকা দেয়ার চেষ্টা করেছে।
