তাকে ঘিরে থাকা সৈন্যদের হাত নেড়ে সরিয়ে তিনি উঠে বসলেন নৌকার অবস্থান জানার জন্য। দেখলেন নৌকাটি দূর্গের জলদ্বার থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে। ভাগ্যের সহায়তায় বা খুব ভালো নিশানার বদৌলতে তার ভাসমান কামান থেকে ছোঁড়া গোলার আঘাতে দশ ফুট উঁচু কাঠের দরজাটির সম্মুখের লোহার জাফরিটি(গ্রিল) ভেঙ্গে গেছে এবং কাঠের দরজাটিও উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অন্য আরেকটি মোগল নৌকা থেকে সৈন্যরা লাফিয়ে তীরে নেমে আকাবাকা গতিতে দ্বারটির দিকে ছুটছিলো যাতে দূর্গ প্রাচীরের উপর থেকে তাঁদের দিকে ছোঁড়া তীর বা গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়। কিন্তু তবুও আকবর দেখলেন তাঁদের অনেকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে গেলো এবং বাকিরা পালাতে লাগলো। কেউ কেউ তাদের আহত সঙ্গীদের টেনে দরজা থেকে দশ গজ দূরে অবস্থিত জেটির পাশের ছোট পাথরের কুটিরের আড়ালে কিছুটা নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলো। আকবর তাঁর নৌকাটি তীর স্পর্শ করার আগেই এক ফুট পানির মধ্যে লাফিয়ে নামলেন, পানি ছিটিয়ে তীরের দিকে দৌড়ে যাওয়ার সময় তিনি চিৎকার করলেন, জলদ্বারের দিকে আমাকে অনুসরণ করো সবাই। যতো দ্রুত দৌড়াবে বিপদ তত কমে যাবে। যতোটা সম্ভব সামনের দিকে ঝুঁকে তলোয়ার বাগিয়ে ধরে তিনি এগিয়ে গেলেন। তৎক্ষণাৎ তিরিশ জনের মতো সৈন্য তাঁকে অনুসরণ করলো, বন্দুকের গুলি এবং তীর তাঁদের আশপাশের বাতাস কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। আকবরকে অগ্রসর হতে দেখে পাথরের কুটিরটির আড়ালে আশ্রয় নেয়া সৈন্যরাও এগিয়ে এলো।
সবুজ পাগড়ি পরিহিত আকবরের এক সেনাকর্তা প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত দরজাটি পার হলো। কিন্তু সে চিৎকার করে নিজের লোকদের অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেয়ার পর পরই কপালে বন্দুকের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লো। তবে তার লোকেরা তার শেষ আদেশ পালন করলো এবং আকবর যখন সেখানে পৌঁছালেন তার আগেই প্রায় এক ডজন সৈন্য সেখানে পৌঁছে গেলো। তারা যতোটা সম্ভব দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এগুতে লাগলো যাতে প্রতিপক্ষের গুলি এবং তীর থেকে রক্ষা পেতে পারে। আরো অনেকগুলি নৌকা থেকে নামা সৈন্যরাও তখন এগিয়ে আসছে।
আকবর উপরে দূর্গপ্রাচীরের দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারলেন দূর্গরক্ষাকারী সৈন্যরা স্থলভাগ দিয়ে এগিয়ে আসা মোগলদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ফলে জলদ্বার দিয়ে অগ্রসর হওয়া সৈন্যদের দিকে তাদের মনোযোগ কমে গেছে। চল্লিশ গজ দূরে অবস্থিত একটি পাথরের ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়ি পথের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে আকবর চিৎকার করে বললেন, চলো আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি এবং দূর্গরক্ষাকারীদের পেছন থেকে আক্রমণ করি, এবং নিজে দেয়াল ঘেষে দৌড়ে এগিয়ে গেলেন। একটি তীর আকবরের বক্ষবর্মে আঘাত করে ছিটকে পড়লো কিন্তু আরেকটি তার ঠিক পেছনে অবস্থিত সৈন্যটির গলায় বিধলো। আকবর থামলেন না, জোরে শ্বাস টানতে টানতে খাড়া সিঁড়ি পথের গোড়ায় পৌঁছে গেলেন এবং সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন।
হঠাৎ দূর্গ প্রাচীরের উপর থেকে বর্শাবিদ্ধ এক সৈনিক আকবরের ঠিক সামনে সিঁড়ির উপর সশব্দে আছড়ে পড়লো। তিনি দেহটিকে পাশ কাটিয়ে উঠে গেলেন এবং সেটা গড়িয়ে নিচে চলে গেলো। বাকি ধাপ গুলি লাফ দিয়ে দিয়ে পার হয়ে তিনি দূর্গপ্রাচীরের উপরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে একজন ছোটখাট গড়নের সৈন্য প্রাচীরের গায়ে আকবরের সৈন্যদের স্থাপন করা মই ঠেলে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছিলো। আকবরের তলোয়ার তার গলায় আঘাত করলো। সে পড়ে যেতেই দ্বিতীয় আরেক জনকে আকবর আঘাত করলেন যে কার্ণিশের উপর ঝুঁকে মই বেয়ে উঠতে থাকা মোগলদের দিকে গুলি করছিলো। আঘাতটি তার হাঁটুর পেছনের মাংসপেশী কেটে দিলো এবং সে প্রচীরের উপর দিয়ে হুমড়ি খেয়ে নিচে পড়ে গেলো। তৃতীয় একজন আকবরের মুখোমুখী হলো এবং তিনি তার আনাড়ি হাতের তলোয়ারের আক্রমণ সহজেই নিজ তলোয়ার দ্বারা প্রতিহত করলেন, তারপর আরেক হাতে থাকা লম্বা ফলাযুক্ত ছোরা লোকটির পাঁজরের মধ্যদিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন। ছোরাটা টেনে বের করতেই লোকটি পড়ে গেলো এবং তার মুখ এবং ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হতে লাগলো।
আশেপাশে তাকিয়ে আকবর দেখতে পেলেন তার সৈন্যদের অনেকেই এই মুহূর্তে মই বেয়ে অথবা পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে সেখানে উপস্থিত হয়েছে। এবং দূর্গরক্ষাকারীদের তুলনায় তারা সংখ্যায় বেড়ে গেছে। দূর্গের সৈন্যরা কিছুক্ষণ সাহসের সঙ্গে লড়াই করলো, কিন্তু তারপর আহত এবং কোণঠাসা হয়ে নিজেদের তলোয়ার ফেলে আত্মসমর্পণ করতে লাগলো।
দূর্গটি এখন আমাদের, আকবর বিজয় উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন। খেয়াল রেখ দূর্গের কেউ যাতে পালাতে না পারে।
তার আরেকটি বিজয় অর্জিত হলো।
*
সেইদিন সন্ধ্যায় আকবর পাটনায় প্রবেশ পথের সদ্য অধিকার করা দূর্গের উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অগণিত মশা তার চারপাশে বিরক্তিকর ভন ভন শব্দে পাক খাচ্ছে। মানুষ অথবা জানোয়ার কেউই তাঁদের সূচাল হুলের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আহমেদ খানের দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে কি?
একজন উচ্চ পদস্থ সেনাকর্তা আমাদের জানিয়েছে আপনার একক যুদ্ধের প্রস্তাবে শাহ্ দাউদ এর মাঝে অস্বস্তি প্রকাশ পেয়েছে। সে আরো বলে, দাউদ চিঠিটি দুই তিন বার পাঠ করে, প্রতিবার পাঠের সময় তার চেহারা ফ্যাকাশে থেকে ফ্যাকাশেতর হতে থাকে, তারপর সে তার কপালে জমে উঠা ঘাম মুছতে মুছতে চিঠিটি দলামোচড়া করে আগুনে নিক্ষেপ করে। চিঠিটি পাওয়ার দুই দিন পরে সে এ বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করে। সে বলে যে, সাধারণ চোর ডাকাতরা তাদের ঝগড়া মেটানোর জন্য এমন কৌশল অবলম্বন করে, রাজাদের বিরোধ মেটানোর উপায় এটা নয়। যাইহোক সেনাকর্তাটি আমাদের আরো জানিয়েছে যে, দাউদ তার দেহরক্ষীর সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে আপনি তার উপর গুপ্ত আক্রমণ করতে পারেন এই আশঙ্কায়।
