সকালের প্রথম আলোতে আকবরের লোকেরা তীরন্দাজদের ডজন খানেক ছিন্নভিন্ন মৃত দেহ আবিষ্কার করে যেগুলি ভাটির দিকের অগভীর জলে ভাসছিলো। মৃতদেহ ভক্ষণ করতে এগিয়ে আসা একদল হাড্ডিসার বেওয়ারিশ কুকুরের দলকেও তাড়া করে সরিয়ে দিতে হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আকবর এই মর্মে শুভ সংবাদ পেলেন যে রবি সিং এর নেতৃত্বাধীন বাকি জাহাজগুলি সংঘর্ষ এড়িয়ে নিরাপদে দূর্গের ভাটি এলাকায় পৌঁছেছে অপেক্ষাকৃত কম হতাহত যাত্রী নিয়ে এবং সেখানে সৈন্য ও সরঞ্জাম পারে নামাচ্ছে। যুদ্ধসভায় গৃহীত কৌশল অনুযায়ী দূর্গটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ করার প্রস্তুতি চলছে।
আহমেদ খান, আমরা যে সৈন্যদের উজানে নামিয়ে দিয়েছি তাদের সঙ্গে ভাটিতে নামা সৈন্যদের মিলিত হতে কততক্ষণ সময় লাগবে?
হয়তো আর এক ঘন্টা জাহাপনা। দূর্গ থেকে তাদের বাধা দানের কোনো চেষ্টার খবর পাওয়া যায়নি।
ভালো। আর কামানবাহী পোন্টুন গুলি কি দূর্গের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে, যেখান থেকে আমার আদেশ পেলে তারা আমাদের সৈন্যদের সাহায্য করার জন্য দূর্গের দিকে গোলা বর্ষণ করতে পারবে?
জ্বী, গোলন্দাজেরা কামানে গোলা ভরে প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া যেসব সৈন্য দূর্গের নদীমুখী প্রবেশ পথ আক্রমণ করবে তারাও দাঁড়বাওয়া নৌকায় চড়ে প্রস্তুত রয়েছে।
এক ঘন্টা পর আকবরের আদেশ পেয়ে মধ্য নদীতে অবস্থান করা কামানবাহী দশটি পন্টুন নোঙ্গর তুলে অগ্রসর হতে লাগলো। নাবিকদের বৈঠার টানে বিশাল কাঠের জাহাজগুলি দ্রুত ভাটির দিকে অগ্রসর হলো। কামানবাহী পন্টুনগুলিকে নেতৃত্বদানকারি লোকটি লম্বা গড়নের, তার মুখভর্তি দাড়ি এবং সর্বাঙ্গে লাল পোশাক পরিহিত। দূর্গটি গোলাবর্ষণের আওতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে তার অধীনস্ত দুটি কামান ছোঁড়ার আদেশ দিলো।
ক্যানভাসের আচ্ছাদনের নিচে থাকা সত্ত্বেও কামানগুলির কাছে বৃষ্টির ছাট আসছিলো। সাবধানে হাতের সাহায্যে অগ্নিসংযোগকারী লাঠি ঢেকে দুই গোলন্দাজ কামানের স্পর্শরন্ধ্রে আগুন ছোঁয়ালো। আর্দ্রতার আগ্রাসন সত্ত্বেও দুটি কামানই প্রচণ্ড শব্দে গোলাবর্ষণ করলো এবং বিস্ফোরণের ধাক্কায় পন্টুনটি ভীষণভাবে দুলে উঠলো। ফলে একজন গোলন্দাজ ছিটকে নদীতে পড়ে গেলো, তবে সঙ্গীর সহায়তায় পরক্ষণেই সে আবার জলযানে উঠে পড়তে সক্ষম হলো। তারা যখন তাদের আন্দোলিত হতে থাকা জলযানে আবার মরিয়া হয়ে কামান প্রস্তুত করতে লাগলো তখন অন্য পন্টুনে থাকা কামানের গোলা বর্ষিত হলো এবং নদীর ঐ অংশ বিস্ফোরণের সাদা ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত হতে লাগলো।
পার থেকে নদীর মধ্যে বর্ধিত হয়ে থাকা একটি উদগ্রভূমিতে আকবর দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধোঁয়ার মাঝে সৃষ্ট সাময়িক ফাঁক দিয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন দূর্গের জলদ্বার (পানি পথে দূর্গে প্রবেশের দরজা) কামানের গোলার আঘাতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর বিশাল কাগুলি দেয়াল থেকে প্রায় আলগা হয়ে গিয়েছে। প্রতিপক্ষ ক্ষতি মেরামত করার আগেই এখন আক্রমণ করতে হবে। নৌকার সৈন্যদের অগ্রসর হতে বলল, তিনি চিৎকার করে উভয় দিকের কামানের গর্জন ছাপিয়ে নিজের কণ্ঠস্বর শ্রবনযোগ্য করতে চাইলেন।
এ সময় আকবর দেখতে পেলেন তার যুদ্ধ হাতিগুলো কাদাপানি পূর্ণ ধানক্ষেত মাড়িয়ে দূর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হাতির পিঠে অবস্থিত হাওদা থেকে বন্দুকধারীরা দূর্গের গোলন্দাজদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। পদাতিক সৈন্যরা বহুকষ্টে কাদাপানির উপর দিয়ে হাতির দেহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে দূর্গের প্রাচীর বেয়ে উঠার জন্য লম্বা মই বহন করছিলো। একটি হাতি মাথায় কামানের গোলার আঘাত লেগে ধান ক্ষেতে লুটিয়ে পড়লো। মোগল পদাতিকরা সেটার আড়ালে জড়ো হতে লাগলো দূর্গের প্রাচীরে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য। বর্তমানে সব কিছু ভালো মতোই আগাচ্ছে।
হঠাৎ গঙ্গা নদীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আকবর দেখতে পেলেন মোগল সৈন্যতে পূর্ণ একটি নৌকা সৈকত থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে যেটি দূর্গের জলদ্বারে (পানি পথে দূর্গে প্রবেশের দরজা) আঘাত হানার জন্য অগ্রসর হয়েছে। আহমেদ খান হাত বাড়িয়ে আকবরকে বিরত করতে চাইলেন কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে অগভীর পানির উপর দিয়ে দৌড়ে নৌকাটির দিকে অগ্রসর হলেন, কুমিরের আক্রমণের আশঙ্কাকেও গুরুত্ব দিলেন না। সোনা মোড়া বক্ষবর্ম দেখে নৌকার সৈন্যরা আকবরকে চিনতে পারলো এবং উল্লাসে চিৎকার করতে করতে তাকে সবলে টেনে নৌকায় তুললো। দ্রুত তিনি নৌকার সম্মুখ ভাগে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং দাঁড়িদের দূর্গের জলদ্বারের কাছে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকলেন। কয়েক মুহূর্ত পরে হঠাৎ আকবরের মনে হলো কোনো দৈত্যাকৃতি হাত তাকে বুকের উপর সজোরে ধাক্কা মেরেছে। তিনি বেশ খানিটা পিছিয়ে বেকায়দাভাবে নৌকার পাটাতনের উপর পড়ে গেলেন। কি হলো? তিনি বিভ্রান্তবোধ করলেন। তিনি রক্তক্ষরণের কোনো আলামত পেলেন না কিন্তু তার শরীরের ডান পাশটা অবশ মনে হলো। আকবর হাতড়ে তাঁর বক্ষবর্মটি পরীক্ষা করতে লাগলেন। সেটা কোথাও ফুটো হয়নি তবে এক জায়গায় টোল খেয়েছে এবং শরীরের সেই স্থানে ভোঁতা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। এখন আকবর অনুমান করতে পারলেন এটা গাদাবন্দুকের গুলির আঘাত।
