হয়তো এক মাস লাগবে, কিন্তু এক্ষেত্রে মূলত, বর্ষা পরিস্থিতির উপর সবকিছু নির্ভর করছে। এখনো পর্যন্ত আমাদের ভাগ্য ভালোই রয়েছে স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে ক্ষতিকর দুর্ঘটনা ছিলো সেটাই, যখন দুটি প্রশস্ততল নৌকা পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তিনটি কামান যমুনা গর্ভে হারিয়ে যায়। তবে এখন যেহেতু গঙ্গা নদী ক্রমশ চওড়া হচ্ছে তাই আমরা আমাদের গতিপথে অধিক সংখ্যক অগভীর এবং কর্দমাক্ত তীর পাবো। ফলে তীরে নামার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। শাহ দাউদ আমাদেরকে দেরি করিয়ে দেয়ার জন্য ঐসব জায়গায় গুপ্ত আক্রমণের পরিকল্পনাও করতে পারে। আমি জানতে পেরেছি সে কতিপয় নদীদস্যুকে আমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য উৎকোচ প্রদানের চেষ্টা করেছে।
কিন্তু নদীদস্যুরা বিচক্ষণতার সঙ্গে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই না?
জ্বী জাহাপনা। তাঁদের কেউ কেউ বিষয়টি সরাসরি আমাদেরকে জানিয়েছেও। তাছাড়া আমাদেরকে নদীদূর্গ গুলির প্রতিও সতর্ক থাকতে হবে যেগুলি পাটনার প্রবেশপথ রক্ষায় নিয়োজিত। আমাদের তথ্য সংগ্রহকারীরা জানিয়েছে সেগুলি পর্যাপ্ত লোকবল এবং রসদ সমৃদ্ধ।
নদী পথে চলতে চলতে আমি এ বিষয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি যে কীভাবে তরুণ শাহ দাউদ এর মনোবল নষ্ট করা যায় এবং তার প্রতি তার সৈন্যদের আস্থা দুর্বল করা যায়। এখন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার উপযুক্ত সময়।
আপনি কি বোঝাতে চাইছেন জাঁহাপনা? কীভাবে তা সম্ভব? আহমেদ খানকে ভীষণ অবাক মনে হলো।
আমার সেনাবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে আমি তাকে একটি চিঠি লিখতে পারি এবং প্রস্তাব দিতে পারি সে যাতে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আমার দাবি যাচাই করে। তাকে আরো জানাতে পারি যে- সৈন্য সংখ্যা, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য রসদ সমৃদ্ধ হয়ে আমি যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছি তা কাজে লাগানো থেকে আমি বিরত হবো যদি সে কেবল একটি যুদ্ধের মাধ্যমে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে রাজি হয়।
কিন্তু সে রাজি হলে কি করবেন?
আমি নিশ্চিত সে রাজি হবে না, কিন্তু রাজি হলেও সমস্যা নেই। যে কোনো লোকের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আমার কোনো দ্বিধা নেই, আর সে তো একজন অনভিজ্ঞ তরুণ হিসেবে সুপরিচিত। একটি যুদ্ধে সবকিছু সমাধান হয়ে গেলে অনেক মানুষের প্রাণ বেঁচে যাবে, সেইসঙ্গে সময় এবং জটিলতাও।
সে ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া কি হবে বলে আপনি মনে করেন?
সে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে, কিন্তু সে যদি সত্যিকার সাহসী না হয় অথবা ভালো অভিনেতা, তাহলে তার আশেপাশের লোকজন তাকে বিচলিত হতে দেখবে। তার সৈন্যরা যখন আমার প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সেটা আপনাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে-তখন তারা আমাদের আত্মবিশ্বাস প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হবে। একক যুদ্ধের প্রস্তাব দাউদ প্রত্যাখ্যান করার পর তারা তাকে কাপুরুষ বলে গণ্য করবে এবং তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই বুদ্ধিতে কাজ হতে পারে জাঁহাপনা, আহমেদ খান বললেন, তবে তাকে সন্দিহান মনে হলো।
কাজ হবেই। আমার নিজের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে আমার পিতামহ বাবরের এই বক্তব্যটি সঠিক ছিলো। সেটা হলো যতো যুদ্ধ সৈন্যরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুখোমুখী লড়াই করে জয়ী হয় ঠিক সম সংখ্যক যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বিজিত হয়। তবে যাই হোক, শাহ দাউদকে প্রস্তাব পাঠাতে আমাদের তেমন কোনো ক্ষয় স্বীকার করতে হবে না।
সেই মুহূর্তে মাথার উপর বজ্রপাতের গর্জন শোনা গেলো এবং পুনরায় বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। সেই ঘন বর্ষার মাঝে আকবরের নৌবহর যাত্রার প্রস্তুতি নিতে লাগলো।
*
আকবর ও আহমেদ খান গঙ্গা নদীর কর্দমাক্ত পারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের দৃষ্টি পাটনার প্রবেশ মুখের পাশে অবস্থিত দূর্গের দিকে। দূর্গটির দেয়াল প্রায় পঞ্চাশ ফুট উঁচু। দেয়ালের নিচের অংশ পাথরে তৈরি এবং উপরের দিকে ইটের গাথুনি। দূর্গ প্রাচীরের ফোকরে ব্রোঞ্জ নির্মিত কামানের নল দেখা যাচ্ছিলো। নদী এবং নদী তীরের ধান ক্ষেত কামানগুলির নিশানার আওতায় রয়েছে। নদী তীরের অধিকাংশ ভূমি জুড়ে ফলে থাকা ধানগাছ গুলি উজ্জ্বল সবুজ বর্ণের। দূর্গের প্রাচীরে আঘাত হানার জন্য মোগল সৈন্যদের এই ধান ক্ষেত পেরিয়ে দ্রুত বেগে অগ্রসর হতে হবে।
আকবরের অনুমান অনুযায়ী একক যুদ্ধের প্রস্তাবের কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি শাহ্ দাউদ। তাঁর রণতরী সমূহ বর্ষা জনিত অসুবিধা অতিক্রম করে গঙ্গা নদীর বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে দুই দিন আগে। গত রাতে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ সভা শেষে আকবর আদেশ দেন তাঁর নৌবহরের একাংশ যাতে রবি সিং এর নেতৃত্বে রাতের আধার আড়ালকে ব্যবহার করে দূর্গ পেরিয়ে অগ্রসর হয় এবং কিছুটা ভাটিতে পৌঁছে একটি শক্তিশালী বাহিনী তীরে নামিয়ে দেয়। যাতে তারা সেদিক থেকে দূর্গ আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। আকবর বুঝতে পারছিলেন যে ভাগ্য তাকে সহায়তা করছে। কারণ ঐ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সময় বর্ষার কালো মেঘ চাঁদকে ঢেকে রেখেছিলো এবং অবিরাম বৃষ্টি ঝরছিলো। ফলে দূর্গের প্রায় সামনে দিয়ে জাহাজ গুলি পেরিয়ে যাচ্ছিলো অস্তিত্ব গোপন রেখে। কিন্তু শেষ দিকে দূর্গের এক প্রহরী বিপদ সংকেত দিলে সেখান থেকে কামানের গোলা বর্ষণ শুরু হয়। পাঁচটি হাতি বহনকারী একটি প্রশস্ততল পোর্টুন (মালবাহী বড় আকারের নৌকা) কামানের গোলার আঘাতে ডুবতে শুরু করে, ভাটিগামী প্রচণ্ড স্রোতের তোড়ে কিছু তীরন্দাজ বহনকারী নৌকা অর্ধনিমজ্জিত পোনটুনটির সঙ্গে ধাক্কা খেলে জলসীমার নিম্নভাগে ফুটো হয়ে যায়। ফলে সেটিও ডুবতে শুরু করে এবং দূর্গ থেকে সেটার যাত্রীদের লক্ষ্যকরে কামান ও বন্দুকের গোলা বর্ষণ শুরু হয়। বহু তীরন্দাজ আহত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। যারা বেচে ছিলো তারা তাদের বক্ষবর্ম এবং অস্ত্র ত্যাগ করে সাঁতড়ে পারে উঠার চেষ্টা করে বা অন্য নৌকা গুলিতে উঠার চেষ্টা করতে থাকে। হঠাৎ কালো জলে কিছু সর্পিল আকৃতিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়- একটু পরে বুঝা যায় সেগুলি রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে আসা কুমির। পানিতে থাকা লোকগুলি একে একে অদৃশ্য হতে শুরু করে এবং কুমিরের ধারাল দাঁতের আগ্রাসনে হাতিগুলি রক্তাক্ত মাংস পিণ্ডে পরিণত হয়।
