আকবর তাৎক্ষণিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেহেতু পাটনা যেতে হলে তাঁকে তাঁর সাম্রাজ্যেন প্রধান দুটি নদীপথ যমুনা ও গঙ্গা দিয়ে অগ্রসর হতে হবে তাই এর উভয় পারের প্রজাদের মধ্যে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সৃষ্টির জন্য বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে এমন আকর্ষণীয় একটি নৌবহর নিয়ে অগ্রসর হতে হবে যা ঐসব অঞ্চলের মানুষ আগে কখনোও দেখেনি। যেদিন মুনিম খানের চিঠির উত্তর দিয়েছেন সেই দিনই তিনি তার প্রকৌশলী এবং জাহাজ নির্মাতাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁদের প্রশস্ততল বিশিষ্ট নৌকা ও জাহাজ নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন যেগুলিতে করে যুদ্ধতি এবং বিশাল আকৃতির কামন ও গোলা বহন করা সম্ভব হবে। তার সৈন্যদের বহন করার মতো যথেষ্ট সংখ্যক নদীগামী জলযানও সংগ্রহ ও পুনর্নির্মাণ করতে বলেছেন।
*
জাহাপনা, আজ আমাদের পক্ষে যাত্রা করা সম্ভব হবে না, আহমেদ খান বললেন। প্রচণ্ড বর্ষণের কারণে বন্যার পানি এতো তীব্র বেগে ভাটির দিকে প্রবাহিত হচ্ছে যে জাহাজের অধিনায়করা আশঙ্কা করছেন এই মুহূর্তে রওনা হলে জাহাজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং দিন শেষে যাত্রা বিরতির সময় সেগুলিকে নোঙর ফেলে একস্থানে স্থির রাখাও সম্ভব হবে না। এছাড়া যে অশ্বারোহী বাহিনী নদী তীর দিয়ে আমাদের সঙ্গে অগ্রসর হবে তারাও গভীর কাদা এবং ডোবা নালা অতিক্রম করতে অসুবিধার সম্মুখীন হবে।
আকবর এক মুহূর্ত ভাবলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আহমেদ খান অনেক বেশি সাবধানী হয়ে উঠছেন। না, আজই রওনা হওয়ার ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আমাদের যদি ধীরেও অগ্রসর হতে হয় তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমরা যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করবো এবং প্রয়োজনে একটার বেশি জাহাজ ছাড়বো না। কিন্তু যাত্রা আমরা আজই শুরু করবো। যখন কেউ নদী পথে যাত্রা করার সাহস করবে না তখন যদি আমরা অগ্রসর হই সেটা আমাদের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা প্রকাশ হবে, যা সম্পর্কে আমি আমার প্রজাদের অবগত করতে চাই। বিশেষ করে শাহ্ দাউদকে। আমি যতোটা ভাবছি সে যদি তার তুলনায় অধিক নির্বোধ না হয়, তহলে সে অবশ্যই আমার গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য গুপ্তচর নিযুক্ত করেছে।
এক ঘন্টা পরের ঘটনা। বৃষ্টি পড়া সাময়িক ভাবে বন্ধ আছে এবং সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টিস্নাত আবছা সূর্য দেখা যাচ্ছে। আকবর তার পতাকাবাহী জাহাজের অগ্রভাগে খোদাই করা বাঘের মস্তকের ঠিক উপরে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধুমাত্র নেংটি পরিহিত দাড়িরা (বইঠা বাওয়ার লোক) সামনে পিছনে নুয়ে বইঠা বাইছে আর দরদর করে ঘামছে। তারা বহু কষ্টে স্রোতের বিপরীতে জাহাজটিকে মাঝ নদীতে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যান্য বিশাল আকৃতির নৌকা গুলিকে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের নৌকার সাহায্যে টানা হচ্ছে। দুই একবার প্রশস্ততল নৌকাগুলি পরস্পরের সঙ্গে বাড়ি খাওয়া ছাড়া বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। আকবর ঈশ্বরের কাছে এই মর্মে প্রার্থনা করলেন যাতে তার অভিযানে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে। তাছাড়া এই অভিযানের সাফল্যের জন্য তার নিজের সতর্কতা ও পরিকল্পনারও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
*
দিগন্তে বিস্তৃত কালো মেঘে উজ্জ্বল পাতের মতো বিদুৎ ঝলসে উঠছে। তার মাঝে ভৃত্যরা সারিবদ্ধভাবে জাহাজ থেকে তীরে ফেলা কাঠ নির্মিত ঢালু সিঁড়ি বেয়ে কিছুক্ষণ আগে শিকার করা পশুর মৃতদেহ বয়ে আনছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আটটি বাঘ-তার মধ্যে একটির মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য সাত ফুটের কম নয়-বাঁশের সাথে বেঁধে চারজনের এক একটি দল সেগুলো কাঁধে বয়ে আনছে। তাদের পিছনে অন্যরা বয়ে আনছে নাড়িভুড়ি অপসারিত হরিণের দেহ, সেগুলি চামড়া ছিলে টুকরো করলেই সান্ধ্য ভোজের জন্য রান্না করা যাবে। লাইনের শেষের ভৃত্যদের কাঁধে ঝুলছে স্থির হয়ে থাকা হাঁসের গুচ্ছ।
আকবর ইতোমধ্যে তাঁর বৃষ্টিতে ভেজা কাদামাখা পোষাক ছেড়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে নতুন পোষাক পরিধান করছেন। লাল শাস বিশিষ্ট তরমুজের রসে চুমুক দিতে দিতে তিনি যাত্রার চুড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। রওনা হওয়ার পর থেকে অধিকাংশ অপরাহ্নেই আকবর শিকার করার উৎসাহ প্রদর্শন করেছেন। জাহাজের নাবিকরা তাঁর এই ইচ্ছার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। আকবর যুক্তি দেখান যে, শিকার করার ফলে অশ্বারোহীরা অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছে এবং বন্দকধারীরাও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারছে। সেই সঙ্গে তাঁর নিজের শখও পূরণ হচ্ছে। এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে সপ্তাহে অন্তত একবার। তখন তিনি মোহাম্মদ বেগ, রবি সিং এবং অন্যান্য সেনাপতিদের আদেশ করেছেন- যেকোনো শুকনো নদীপারে পদাতিক সৈন্যদের কুচকাওয়াজ করানোর জন্য। দশ দিন আগে তিনি যমুনা এবং গঙ্গা নদীর সঙ্গম স্থলের পাশে অবস্থিত পবিত্র নগরী এলাহাবাদে নেমেছিলেন। তারপর সেখানকার প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঐ নগরীতে একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। পরে সন্ধ্যায় তাঁর সফর সঙ্গী হিসেবে আগত কাশগড়ের জাদুকরেরা শহর প্রাচীরের উপর এক বর্ণাঢ্য আতশবাজি প্রদর্শনীর আয়োজন করে।
আকবর তাঁর পাশে থাকা আহমেদ খানের দিকে ফিরলেন। পাটনা পৌঁছাতে আমাদের আর কয় সপ্তাহ সময় লাগবে বলতে পারেন?
