*
ঐদিন সন্ধ্যায় আকবর ক্যাষে বন্দর রক্ষাকারী বাঁধের উপর নির্মিত ছোট একটি পাহারাচৌকির উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই মুহূর্তে তিনি যুদ্ধের উত্তেজনার সঙ্গে মিশ্রিত বিজয়োল্লাস অনুভব করছেন। গুজরাট এখন নিশ্চিতভাবে তার বর্ধিষ্ণু সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। বন্দরের প্রধান ভবনগুলির ছাদে মোগল পতাকা শোভা পাচ্ছে। ইব্রাহিম হোসেন কাঁধে কুঠার বিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় আত্মসমর্পণ করেছে এবং বন্দীত্ব বরণ করে সে এখন নিয়তির অপেক্ষায় রয়েছে।
সম্মুখে অবস্থিত সাগরটি কি অপূর্ব এর ধূসর তরঙ্গের উপর বেলা শেষের সূর্যটি বেগুনি মেঘের আগ্রাসনে পশ্চিম দিগন্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আকবর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি স্বশরীরে সমুদ্রের সান্নিধ্য গ্রহণ করবেন, সমুদ্রের নিকটবর্তী হওয়ার অভিজ্ঞতা এর আগে তার হয়নি।
একঘন্টা পর দেখা গেলো আকবর একটি পঞ্চাশ ফুট দীর্ঘ আরবী জাহাজের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আছেন। সেটি ক্রমশ উঁচু হতে থাকা ঢেউ এর ধাক্কায় উঠা নামা করছিলো। জাহাজের অধিনায়ক আকবরকে আগেই সতর্ক করেছেন যে দিগন্তে আবির্ভূত কালো মেঘ সামুদ্রিক ঝড়ের পূর্বসংকেত। কিন্তু আকবর জেদ ধরেন তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও জাহাজ থেকে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করবেন। আকবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ কোৰ্চিটি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে নিজের পোশাকের উপর বমিও করে দিয়েছে। আরেকজন মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রার্থনা কছে।
হঠাৎ বিশাল আকারের একটি ঢেউ জাহাজের কিনার অতিক্রম করে আকবর এবং তার পাশে দাঁড়ানো আহমেদ খানকে উষ্ণ ফেনিল জলে গোসল করিয়ে দিলো। আহমেদ খানকে বেশ বিচলিত মনে হলো যখন তিনি আকবরের দিকে ফিরলেন। জাহাপনা চলুন আমরা আরেকটু নিরাপদ অবস্থানে যাই, সেটাই এই মুহূর্তে বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে। আকবরের দীর্ঘ ভেজা চুল বাতাসে পেছন দিকে উড়ছিলো। তিনি তাঁর পা দুটি ঈষৎ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে জাহাজের এই অপরিচিত দোলার সঙ্গে একাত্ব হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি আহমেদ খানের প্রস্তাবের উত্তরে মাখা নাড়লেন। সমুদ্রের এই স্পন্দন আমাকেও কিছুটা ভীত করছে। কিন্তু জাহাজের অধিনায়ক আমাকে জানিয়েছে বড়টির প্রচগুতা কিছুক্ষণের মধ্যেই কমে যাবে। সমুদ্রের ঝঙা উপেক্ষা করে আমি আমার নিজের সাহস পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। এই মুহূর্তে ঝড়ের তান্ডব এবং এর ফলে সৃষ্ট অসুবিধার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও আমি শিখছি…আছড়ে পড়া প্রলয়ঙ্করী ঢেউ এবং সমুদ্রের অসীম শক্তি আমাকে বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে অতিঅহঙ্কারী বা সীমাহীন আত্মবিশ্বাসী হওয়া আমরা উচিত হবে না। যদিও আমি অন্য অনেক রাজার তুলনায় অধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছি, মহান বিজয় অর্জন করেছি, কোষাগার উপচে পড়া ধন-রত্ন আহরণ করেছি এক কোটি কোটি মানুষের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছি-তবুও আমি একজন সাধারণ মানুষ, নগন্য এবং প্রকৃতির অনন্ত অস্তিত্বের তুলনায় নিতান্তই রূণশীল একটি প্রাণী।
.
১২. এক ডেকচি ভর্তি মস্তক
চমৎকার নকশা করেছ। বাঘটিকে দেখে মনে হচ্ছে সেটা যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপ দেবে, আকবর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কারিগরটিকে বললেন। তারা দুজন শিক্রির বালুপাথর খোদাই করা আকর্ষণীয় ভবনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন না যা আকবর গুজরাট বিজয়ের পর ফিরে এসে পরিদর্শন করেছেন। তারা আগ্রার যমুনা তীরবর্তী কাঠের জেটিতে দাঁড়িয়ে একটি নতুন তৈরি করা জাহাজের সম্মুখের চেহারা দেখছিলেন। সম্মুখে বাঘ বিশিষ্ট এই জাহাজটি বংলায় যুদ্ধাভিযানে আমার প্রতীক হিসেবে চমৎকার ভূমিকা পালন করবে।
আকবর শিক্রিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার দায়িত্বে নিয়োজিত তাঁর প্রধান সেনাপতি মুনিম খানের কাছ থেকে সংবাদ আসে। প্রথম সংবাদটি থেকে জানা যায়, বাংলার তরুণ শাসনকর্তা শাহ দাউদ, যে কিছুদিন আগে পিতার মৃত্যুর পর ঐ এলাকার জায়গিরদার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে সে বিদ্রোহ করেছে। এছাড়াও সে রাজকীয় কোষাগার সমূহ এবং প্রধান মোগল অস্ত্রাগার লুট করেছে। তবে বার্তাটিতে মুনিম খান উল্লেখ করেন যে তিনি নিজেই দাউদকে এই ধৃষ্টতার জন্য শাস্তি দেবেন। দ্বিতীয় বার্তাটি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত, উল্লেখ করা হয়েছে, শাহ দাউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান যেমন অনুমান করা হয়েছিলো তার তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে এবং মুনিম খানের আরো সৈন্য সহায়তা প্রয়োজন। এই বার্তা দুটি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তৃতীয় আরেকটি বার্তা আসে। এতে স্বয়ং আকবরকে সেখানে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে এই জন্য যে, সেখানে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ মুনিম খান দাউদের পাটনা দূর্গ অবরোধ করেছেন ঠিকই কিন্তু পর্যাপ্ত সৈন্যের অভাবে তার এই অবরোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সদ্য পশ্চিম উপকূলে সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে পূর্বদিকে বাংলা এবং এর উপকূলবর্তী অঞ্চল নিজের করতলগত করার সুযোগ আকবরকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। তিনি তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই মুনিম খানের তৃতীয় বার্তাটির তাৎক্ষণিক উত্তর প্রদান করেছেন। উত্তরে আকবর মুনিম খানকে জানিয়েছেন তিনি যাতে নিজের বাহিনীর সদস্যদের অহেতুক বিপদের সম্মুখীন না করেন। পাশাপাশি আকবর সেখানে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত রসদ এবং যুদ্ধসরঞ্জাম যথাসম্ভব সংরক্ষণের চেষ্টা করেন। এছাড়াও আকবর অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মুনিম খানকে জানিয়েছেন, নিশ্চিত বিজয়ের জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য সংগৃহীত হওয়ার আগে তিনি যাত্রা শুরু করবেন না। তাছাড়া তার সৈন্যদের নিয়ে জলপথে পাটনা আসার জন্য পর্যাপ্ত জলযান যোগাড় করতেও কিছুটা সময় লাগবে। এর অর্থ পাটনা পৌঁছাতে তার কমপক্ষে তিন মাস বা তার কিছু বেশি সময় লাগবে।
