এ কথা শুনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের বিনিময়ে সে কি আমার কাছে কোনো উপকার আশা করে?
দোভাষীটি আবার বিদেশী ভাষায় তার প্রভুর সঙ্গে আলাপ করলো, তারপর বললো, আপনি ক্যাম্বে বন্দর জয় করার পর তিনি এখানে বাণিজ্য করার অনুমতি চান।
যখন এই বন্দর আমার হবে তখন আবার ওকে বলবে আমার কাছে প্রস্তাব পেশ করতে এবং সে তখন ইতিবাচক উত্তর পাবে। এখন তোমরা তাড়াতাড়ি ফিরে যাও। ইব্রাহিম হোসেনের উপর আক্রমণের জন্য আমি আর দেরি করতে চাই না।
ডন ইগনাসিও এবং তার দোভাষী আকবরকে ঝুঁকে কুর্ণিশ করলো, তারপর যে পথে এসেছিলো সেই পথেই নৌকায় ফিরে গিয়ে নিজেদের জাহাজের দিকে অগ্রসর হলো। তাদেরকে আকবরের অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু এই মুহূর্তটি কৌতূহল মেটানোর উপযুক্ত সময় নয়, তিনি যুদ্ধের ময়দানে রয়েছেন। তিনি আহমেদ খানের দিকে ফিরলেন। আক্রমণের আদেশ দিন। আমরা সৈকতের ধারে অবস্থিত নারকেল গাছ গুলি বরাবর অগ্রসর হবো যেখানে বালু অপেক্ষাকৃত দৃঢ়। ইব্রাহিম হোসেন এবং তার লোকেরা এখন শঙ্কিত হয়ে আছে কারণ পোর্তুগীজটির কাছে তাদের সাহায্যের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, এছাড়া ধারাবাহিক ভাবে আমরা তাদের সকল প্রতিরোধ মোকাবেলা করে এসেছি এবং বর্তমানে তাদের তুলনায় আমাদের সৈন্য সংখ্যা বেশি।
আধ ঘন্টা পরে, আকবর সৈকতের উপর দিয়ে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তার কালো স্ট্যালিয়নটির খুরের আঘাতে বালু ছিটকে পড়ছিলো। তার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে তার দেহরক্ষীরা, এদের মধ্যে চারজন সবুজ মোগল পতাকা বহন করছে, আরো দুইজন শিঙ্গা বাজাচ্ছে। তারা যখন ইব্রাহিম হোসেনের অগ্রবর্তী প্রতিরোধ প্রাচীরের কাছাকাছি পৌঁছালো বোঝা গেলো সেগুলি তাড়াহুড়া করে বালু খুঁড়ে অস্থায়ী ভাবে বানানো হয়েছে। এর পেছনে অবস্থিত দূর্গের ইটের প্রাচীর অত্যন্ত নিচু এবং ভাঙাচোরা। কিন্তু স্পষ্ট বুঝা গেলো ইব্রাহিম খানের কামান রয়েছে। কারণ আকবর দেখতে পেলেন দূর্গের ভিতরে অবস্থিত একটি দোতলা ভবন থেকে কমলা বর্ণের আগুনের হল্কা এবং ধোঁয়া ছুটছে। সেই মুহূর্তে কামানের প্রথম গোলার আঘাতে তার একজন শিঙ্গাবাদকের মস্তক বিচ্ছিন্ন হলো।
আরো কিছু অশ্বারোহী ঘোড়া থেকে ভূপাতিত হলো, তারা বন্দুকের গুলি বা তীর বিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ইব্রাহিম হোসেনের লোকেরা কামান পুনরায় ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত করতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছিলো। ইতোমধ্যে আকবর ঘোড়া সহ লাফিয়ে প্রথম প্রতিরোধ এবং তার পেছনের খাদ পেরিয়ে গেছেন। তবে খাদ পেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তার মধ্যে অবস্থিত এক তীরন্দাজকে লক্ষ করে তলোয়ার চালিয়েছেন। আঘাতটি তার মুখের একপাশ কেটে দিয়েছে।
আকবর এ সময় আরেকবার কামান দাগার শব্দ শুনলেন এবং তার উপর বালুকণার বৃষ্টি হলো। গোলাটি তাঁর সামনে অবস্থিত প্রতিরোধের উপর আঘাত হেনেছে। গুজরাটি গোলন্দাজ কামানের নল নিচু করে অগ্রসরমান মোগল সেনাদের দিকে গোলা বর্ষন করতে চেয়েছিলো কিন্তু সেই গোলার আঘাতে তাদেরই তৈরি করা প্রতিরোধ প্রাচীর ভেঙে গেছে। ঘোড়ার লাগাম সবলে টেনে ধরে আকবর নতুন সৃষ্ট ফাটলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেন। সেখানে বালুর উপর দুজন গুজরাটি যোদ্ধার ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে ছিলো।
আকবর পাশে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর সহযোদ্ধারা একই পদ্ধতিতে প্রতিরোধ পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে। তার থেকে কিছুটা সামনে এক দল মোগল যোদ্ধা ঘোড়া থেকে নেমে দূর্গের ভাঙা প্রাচীর বেয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। তিনি তাঁদের দিকে অগ্রসর হলেন। ইতোমধ্যে কয়েক জন দূর্গের ভিতর ঢুকে পড়েছে। আকবর লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন এবং তাঁর সৈন্যদের অনুসরণ করলেন। বাম হাতের মুষ্টিতে দেয়ালে গাঁথা একটি ধাতব শলাকা আকড়ে ধরে নিজের শরীরকে টেনে তুললেন। তিনি তাঁর সৈন্যদের পিছু পিছু শত্রুদের শক্ত ঘাঁটি দোতলা ভবনটির দিকে অগ্রসর হলেন। এখান থেকে দেখে তিনি বুঝতে পারলেন দূর্গের প্রাচীরের ভিতর ওটাই একমাত্র ভবন।
আবার কামানের গোলা বর্ষিত হলো। তার একজন সৈন্য পড়ে গেলো কিন্তু পরমুহূর্তেই ধড়মড় করে আবার উঠে দাঁড়ালো, বুঝা গেলো গোলার আঘাতে নয়, সে হোঁচট খেয়ে পড়েছে। সম্ভবত একটি কামান ভবনের ভিতর এখনো সক্রিয় আছে। পলায়নকারী গোলন্দাজদের খুলে রেখে যাওয়া দরজা দিয়ে আকবর এবং তার সৈন্যরা ঢুকে পড়লো। ভেতরের অন্ধকার চোখে সয়ে আসতেই তারা একটি পাথরে তৈরি খাড়া সিঁড়িপথ দেখতে পেলো এবং সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলো। সিঁড়ি পেরিয়ে এসে তারা দেখলো সেখানে এক গুজরাটি সেনাকর্তা একাই কামানের একটি ভারী গোলা কামানে ব্রার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। পেছন থেকে আকবরের এক সৈন্য প্রায় এক ফুট লম্বা ফলা বিশিষ্ট একটি ছোরা তাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো। পিঠে ছোরাবিদ্ধ হয়ে সেনাকর্তাটি কামানের কাঠ নির্মিত গাত্তি উপর পড়ে গেলো।
জলদি করো, আকবর তার দুইজন দেহরক্ষীকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে উঠলেন, তুমি ছাদে গিয়ে আমাদের পতাকা উড়িয়ে দাও, এর ফলে বুঝা যাবে আমরা দূর্গটি দখল করতে পেরেছি। আর তুমি, মোহাম্মদ বেগকে খুঁজে বের করো। তাঁকে বলো তিনি যাতে বাকি সৈন্যদের আদেশ দেন যতো দ্রুত সম্ভব এই দূর্গটির চারদিক ঘিরে ফেলার জন্য যাতে গুজরাটিরা পালিয়ে উত্তরে ক্যাম্বে শহরে ফিরে যেতে না পারে।
