ওগুলোর বেশির ভাগই আরবদের জাহাজ। তারা হজ্জ্বের তীর্থ যাত্রীদের আরব দেশে আনা নেওয়া করে এবং অন্য সময় মশলা এবং কাপড়ের বাণিজ্য করে। আমি আগে যখন এখানে এসেছিলাম তখনো ওগুলোকে দেখেছি। তবে ঐ যে তিনটি কালো রঙ্গের চৌকো আকৃতির উঁচু কিনার বিশিষ্ট জাহাজ দেখা যাচ্ছে ঐ ধরনের জলযান আমি আগে দেখিনি।
ওগুলোর একটার পেছন দিকের ফোকর দিয়ে বেরিয়ে থাকা নলটি কি কামান?
আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না জাঁহাপনা।
আহমেদ খান যখন কথা বলছিলেন তখন তিনটি জাহাজের মধ্যে যেটি তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী, সেটার নাবিকদের পাল তুলতে দেখা গেলো। পাল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হওয়ার পর আকবর সেটাতে বিশাল আকারের লাল রঙে আঁকা ক্রুশচিহ্ন দেখতে পেলেন। কিছু নাবিক জাহাজটি থেকে নামানো একটি দাঁড়বাওয়া নৌকায় চড়ছিলো এবং জাহাজটির সঙ্গে নৌকাটি দড়ির সাহায্যে যুক্ত ছিলো। শীঘ্রই ছোট নৌকাটির নাবিকদের দাঁড় বাওয়ার টানে এবং উন্মুক্ত পালে লাগা বাতাসের চাপে বড় জাহাজটি ধীরে ধীরে অকবরদের অবস্থানের দিকে ঘুরতে লাগলো।
ইত্তিমাদ খানকে পরাজিত করার পর এই সমুদ্র উপকূলে পৌঁছাতে আকবরের ছয় সপ্তাহ সময় লেগেছে। তিনি তাঁর সকল ভারী সরঞ্জাম পেছনে ফেলে ক্লান্তিহীন ভাবে ঘোড়া ছুটিয়েছেন। পথে যেখানেই ইব্রাহিম হোসেনের সৈন্যদের সম্মুখীন হয়েছেন তাঁদের পরাজিত করে ছত্রভঙ্গ করেছেন। গতকাল আকবরের সৈন্যরা উপকূল বরাবর কয়েক মাইল দূরে একটি অর্ধভগ্ন ছোট আকৃতির দূর্গ দখল করে। দূর্গটির ভিতর তারা পাঁচটি প্রাচীন নকশার কামান আবিষ্কার করে। আকবরের নির্দেশে তার লোকেরা আশেপাশের গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে মালটানা ষাঁড় ক্রয় করে। আকবর সেই কামানগুলি সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন এই ভেবে যে ক্যাম্বে আক্রমণের সময় হয়তো সেগুলি কাজে লাগতে পারে। তাই এই মুহূর্তে কামান বিশিষ্ট জাহাজটিকে তাঁদের দিকে ঘুরতে দেখে তিনি ঘাবড়ালেন না।
কামান প্রস্তুত করো, যাতে প্রয়োজনে ঐ জাহাটির দিকে গোলা বর্ষণ করা যায় এবং বন্দুকধারীদের তৈরি হতে বলো, আকবর আদেশ দিলেন। আধ ঘন্টা পর মোগলদের অবস্থানের ঠিক বিপরীত দিকে, সমুদ্র উপকূল থেকে মাত্র পৌনে একমাইল দূরে পালে কুশ অঙ্কিত কালো রঙের জাহাজটি নোঙর করলো। দেহে উজ্জল বক্ষবর্ম পরিহিত লম্বা গড়নের একটি লোক দড়ির মই বেয়ে জাহাজটি থেকে দাঁড়বাওয়া নৌকাটিতে নামলো যোটি জাহাজটিকে অবস্থান নিতে এতোক্ষণ সাহায্য করেছে। লম্বা লোকটিকে অনুসরণ করে সাদা পাগড়ি এবং বেগুনি আলখাল্লা পরিহিত আরেকটি লোক নৌকায় চড়লো। তারা দুজন যখন ছোট নৌকাটিতে বসলো তখন নাবিকরা সেটার বড় জাহাজটির সঙ্গে যুক্ত বাঁধন খুলে দাঁড় বেয়ে তীরের দিকে রওনা হলো। নৌকাটি যে মুহূর্তে অগভীর জলে পৌঁছালো লম্বা লোকটি তার সঙ্গীকে নিয়ে পানিতে লাফিয়ে নেমে পানি ভেঙে তীরের দিকে আসতে লাগলো। তারা উভয়েই মাথার উপর হাত তুলে রেখেছে বোঝানোর জন্য যে তারা নিরস্ত্র।
আকবর কৌতূহল নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। যখন তারা নিশ্চিতভাবে জানে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী তখন কি উদ্দেশ্যে তারা তার কাছে আসছে? অস্ত্র আছে কিনা দেখার জন্য ওদের দেহ তল্লাশী করে আমার কাছে নিয়ে এসো, তিনি তাঁর দেহরক্ষীদের অধিনায়ককে আদেশ দিলেন। অধিনায়কটি দৌড়ে আগন্তুকদের দিকে এগিয়ে গেলো এবং তারা তাকে তল্লাশী করার সুযোগ দিলো। তারা নিরস্ত্র এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে অধিনায়কটি তাঁদের আকবরের কাছে নিয়ে এলো। তারা কাছে আসার পর আকবর বুঝতে পারলেন বেগুনি পোষাক পরিহিত লোকটি গুজরাটি কিন্তু তার লম্বা সঙ্গীটি একজন বিদেশী। বিদেশীটির মুখভর্তি বাদামি রঙের দাড়ি এবং নাকটি অত্যন্ত খাড়া ও লম্বা। তার সমতল বক্ষবমটি কেবল বুক ঢেকে রেখেছে এবং শরীরের নিচের অংশে হাঁটু পর্যন্ত দীর্ঘ কালো এবং সোনালী ডোরা বিশিষ্ট পাৎলুনের মতো পোশাক। তার হাঁটুর নিচের অংশে মোজা রয়েছে এবং তার লবনের দাগ বিশিষ্ট কালো পাদুকাটি এমন নকশার যা আকবর আগে কখনোও দেখেননি।
তোমরা কে? আকবর জিজ্ঞেস করলেন যখন তারা তাঁকে কুর্ণিশ করছিলো।
আমি সৈয়দ মোহাম্মদ, গুজরাটের লোক, বেগুনি পোশাক পরিহিত লোকটি উত্তর দিলো, এবং ইনি হলেন ডন ইগনাসিও লোপেজ, পর্তুগালের লোক। ঐ তিনিটি বড় জাহাজের অধিনায়ক তিনি। আমি ওনার দোভাষীর কাজ করি।
তাহলে এই বাদামি দাড়ি বিশিষ্ট লোকটি একজন পোর্তুগীজ এরা ইউরোপের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে কয়েক বছর আগে গোয়ায় এসেছে নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য। আকবর সতর্কতার সঙ্গে অশান্তুকটির যোগ্যতা নিরূপণের চেষ্টা করলেন। তিনি আগেই পোর্তুগীজদের কষ্মা শুনেছেন। তারা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সরবরাহের জন্য প্রশংসা অর্জন করেছে, এছাড়া তারা জাহাজ নিয়ে যুদ্ধ করতেও বেশ পারদর্শী। কিন্তু এই প্রথম তিনি তাদের একজনের মুখোমুখী হলেন।
ও আমাকে কি বলতে চায়? আকবর জিজ্ঞেস করলেন। দোভাষীটি পোর্তুগীজটির সঙ্গে এমন এক ভাষায় কথা বললো আকবর যা আগে শুনেননি এবং উত্তর জেনে নিয়ে সে আকবরের দিকে ফিরলো৷ ডন ইগনাসিও নিজ রাজার পক্ষ থেকে আপনাকে সম্ভাষণ জানিয়েছেন। দুঃসাহসী যোদ্ধা এবং শক্তিশালী সম্রাট হিসেবে তিনি আপনার পরিচয় জানেন। তার ঐ তিনটি জাহাজ বহু শক্তিশালী কামান এবং গোলাবারুদে সজ্জিত। ইব্রাহিম হোসেন তাকে একাধিক সিন্দুক ভর্তি ধন-রত্নের বিনিময়ে তার পক্ষে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুরোধ করেছিলো। কিন্তু তিনি এই যুদ্ধের ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে চান।
